Published : 23 Aug 2025, 12:39 PM
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর সঙ্গে একটি বিশেষ উদ্যোগের অংশ হিসেবে সম্প্রতি সিলেট ও মৌলভীবাজারের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছে। এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় অনেক বিষয়ের পাশাপাশি একটি বিষয় বিশেষভাবে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে—তা হলো পাথর।
সাদা পাথর এলাকার বেশিরভাগ পাথর লুট হয়ে যাওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে পাথর এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় গাড়িচালক, পর্যটক, কিংবা চায়ের দোকানের আড্ডায়—সর্বত্র এখন পাথর নিয়ে আলোচনা। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সাদা পাথর পর্যটন এলাকা থেকে লুট বা চুরি হয়ে আসছে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে সিলেট ও মৌলভীবাজার এলাকায় প্রায় ১৫ লক্ষ মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬৫% ছিল অনুমোদনহীন (স্থানীয় পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র)। তবে এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, এই লেখার উদ্দেশ্য অর্থনীতি বা রাজনীতি নয়, বরং আরও গভীর ও জরুরি একটি বিষয়—জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ।
অনেকেই জানেন না, একটি পাথর কেবল নীরব বস্তু নয়; এটি নিজস্ব বাস্তুতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাথর পানি ধরে রাখে, মাটির গঠন স্থিতিশীল রাখে এবং বহু প্রজাতির জীবের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও বাসস্থান হিসেবে কাজ করে। পাথরভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র মাটির কার্বন শোষণ ও সঞ্চয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে সহায়ক। উদাহরণস্বরূপ, সরীসৃপ প্রাণী যেমন টিকটিকি (Hemidactylus frenatus), রক আগামা (Laudakia tuberculata), র্যাট স্নেক (Ptyas mucosa), এমনকি বিরল স্যান্ড বোয়া (Eryx johnii) পাথরের আশেপাশে আশ্রয় নেয়। উভচর প্রাণী যেমন কমন ইন্ডিয়ান টোড (Duttaphrynus melanostictus), প্যাডি ফিল্ড ফ্রগ (Fejervarya spp.), ইন্ডিয়ান বুলফ্রগ (Hoplobatrachus tigerinus) পাথরের আর্দ্র ও ছায়াময় পরিবেশে বাস করে। এরা ত্বকের মাধ্যমে শ্বাস নেয়, তাই পাথরের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ তাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য।
আইইউসিএন বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ২০টি উভচর ও সরীসৃপ প্রজাতি পাথর-নির্ভর বাস্তুতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল, যাদের মধ্যে অন্তত ৫টি প্রজাতি বর্তমানে সংকটাপন্ন তালিকাভুক্ত। দুঃখজনকভাবে, আমরা এখনো অনেকেই পাথরকে শুধু “সাদা পাথর” হিসেবে দেখি—এর নিচে লুকানো জীবনের গল্প ও গুরুত্ব আমরা উপলব্ধি করি না। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রায়শই এ বিষয়ে উদাসীন থাকে, যা কেবল হতাশাজনক নয়, বরং দায়িত্বহীনতার প্রমাণ।
একটি বাস্তুতন্ত্রের মৃত্যু
জাফলংসহ দেশের বেশ কিছু এলাকায় যে সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছে, তা আজ ভেঙে পড়ছে। এই বাস্তুতন্ত্র শুধু স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের আশ্রয় নয়, পানির উৎস ও টেকসই পর্যটনের ভিত্তিও। প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহিত পাথর ও খনিজ উপাদান জলপ্রবাহ, মাটির স্থিতি এবং জীবজগতের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক। কিন্তু সীমাহীন ও অনিয়ন্ত্রিত পাথর উত্তোলন এই ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করছে। পাথর উত্তোলনে ব্যবহৃত যান্ত্রিক যন্ত্রপাতি ও পরিবহন প্রক্রিয়া প্রচুর কার্বন নিঃসরণ ঘটায়, যা জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে এবং স্থানীয় ঐতিহ্য ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে জাফলং ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ৩০% প্রাকৃতিক পাথরভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র হারিয়ে গেছে (উৎস: জিও-বাংলা এনভায়রনমেন্টাল রিপোর্ট, ২০২৪)।
উপযুক্ত গবেষণার অভাবে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির সঠিক পরিমাণ জানা বা অতীতের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অতিরিক্ত ও যান্ত্রিক পাথর উত্তোলন প্রকৃতির স্বাভাবিক পুনর্গঠনের গতিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পাহাড় কেটে পাথর আহরণ এই ‘ভূস্বর্গীয়’ অঞ্চলকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জাফলংয়ে কিছু সময়ের জন্য ‘প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করে পাথর উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু তা টেকসই হয়নি। বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে প্রয়োজনীয় পাথরের পরিমাণ নেই; অথবা বলা যায়, পাথর আমাদের সম্পদ নয়। তাই যতটুকু পাথর আমরা পাচ্ছি, তা লুট বা চুরি না করে সংরক্ষণের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। প্রয়োজনে আমদানির পথ বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত হতে পারে।
কেন এই ধ্বংসযজ্ঞ?
জাফলংয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক পর্যটক ফেরার পথে ব্যাগভর্তি পাথর নিয়ে যান। প্রশ্ন ওঠে, ‘কে দেখছে?’ প্রকৃতপক্ষে সেখানে কোনো নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি নেই। ২০২২ সালে স্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপে দেখা গেছে, সিলেটে বেড়াতে আসা প্রতি ১০ জন পর্যটকের মধ্যে ৭ জন স্মারক হিসেবে পাথর সংগ্রহ করেন, যা পরিবেশের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একটি পাথর জীববৈচিত্র্যের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। বছরের পর বছর ধরে একটি পাথর যেখানে ছিল, সেখান থেকে তা সরিয়ে ফেলা মানে—আশ্রয় হরণ, মাটির ক্ষয়রোধের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া নষ্ট করা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিপর্যস্ত করা, ঔষধি গাছের পরিবেশ ধ্বংস করা, এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সহায়ক জীবদের আবাস ধ্বংস করা। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর গবেষণা অনুযায়ী, স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে এবং দুর্যোগ প্রতিরোধে অপরিহার্য।
শুধু বললেই হবে না, ‘পাথর চুরি ও লুট হচ্ছে।’ এটি প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যারা পাথর তুলে নিচ্ছেন, তারা অজ্ঞতা ও লোভে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করছেন, পরিবেশের শত্রু হয়ে উঠছেন, এমনকি দেশের সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি, পাশাপাশি শিক্ষার মাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
সমাধানের পথ
যেসব এলাকায় পাথরের বৈচিত্র্য রয়েছে, সেখানে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও পর্যটকদের নিয়ে সমন্বিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, ইন্দোনেশিয়ার বালিতে ২০২১ সালে শুরু হওয়া ‘ইকো-ট্যুরিজম অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম’-এর ফলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ৪০% উন্নতি হয়েছে এবং পর্যটকদের পরিবেশবান্ধব আচরণ দ্বিগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগ সময়োপযোগী হবে। এটি আন্তর্জাতিক মান বৃদ্ধি করবে, পর্যটক আকর্ষণে ভূমিকা রাখবে এবং দায়িত্বশীল পর্যটন গড়ে তুলবে।
প্রভা অরোরা, ইউনেস্কো ও ইউএনইপি-স্বীকৃত ‘ফাউন্ডেশন ফর এনভায়রনমেন্টাল এডুকেশন’-এর একমাত্র ন্যাশনাল অপারেটর হিসেবে, ব্লু ফ্ল্যাগ ও গ্রীন কী-এর মতো প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিবেশগত মান, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে টেকসই পর্যটনকে উৎসাহিত করতে পারে। এশিয়ান ইকোট্যুরিজম নেটওয়ার্ক (এইএন)-এর বোর্ড মেম্বার হিসেবে প্রভা অরোরা পরিবেশবান্ধব, সমাজভিত্তিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল ইকোট্যুরিজমকে উৎসাহিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষিত থাকবে।
সিলেট ও মৌলভীবাজারে এ ধরনের প্রোগ্রাম শুরু হলে জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে, পর্যটন টেকসই ও পরিবেশবান্ধব হবে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সহায়ক হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি পরিবেশবান্ধব হবে।
পাথর যেখানে প্রাণের আধার, সেখানে নির্বিচারে উত্তোলন ও লুট কেবল প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নয়, মানবিকতাকেও ধ্বংস করে। এই অন্ধ লালসার বিরুদ্ধে পরিবেশগত, সামাজিক, প্রশাসনিক ও নীতিগত প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং তা ধরে রাখা জরুরি।