Published : 09 Jul 2026, 09:25 AM
উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপ খেলতে না পারার হতাশা সঙ্গী। তবে, দূর থেকে ঠিকই সতীর্থদের সমর্থন দিচ্ছেন জাকারিয়া আবুখলাল। ফ্রান্সের বিপক্ষে মরক্কোর কোয়ার্টার-ফাইনাল সামনে রেখে, ২৬ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড মেলে ধরলেন স্মৃতির ঝাঁপি। বোনু-হাকিমিদের নিয়ে উচ্চাশা জানালেন। মরক্কো দলের এতদূর উঠে আসা যে কোনো অঘটন নয়, বরং তারা এই পর্যায়ে খেলার যোগ্য দল-কথাগুলো তিনি বললেন গর্বের সুরে; দৃঢ় কণ্ঠে।
বস্টনে ১০ জুলাই ২ টায় (এএম) কোয়ার্টার-ফাইনালে ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে মরক্কো। চার বছর আগে, কাতার বিশ্বকাপে সেমি-ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই দল। সেই ম্যাচে ২-০ গোলে হেরে যাত্রা থেমেছিল ‘এটলাস লায়ন্স’দের।
ওই আসরে আরব-আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে ওঠার ইতিহাস গড়েছিল মরক্কো। সেই দলের অংশ ছিলেন আবুখলাল। ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচটি তিনি খেলেছিলেন বদলি হিসেবে।
এবারের বিশ্বকাপে আবুখলাল দলের সঙ্গী হতে পারেননি। তবে, ওই দলের অনেকে খেলছেন উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে। তরিনো এফসিতে খেলা এই ফরোয়ার্ড চোখ রাখছেন সতীর্থদের ওপর। আগ্রহভরে, অনেক স্বপ্ন নিয়ে।
আল বাইয়াত স্টেডিয়ামের ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচের সেই স্মৃতি আজও অমলিন আবুখলালের। পঞ্চম মিনিটে থিঁও এরনঁদেজের গোলে পিছিয়ে পড়েছিল মরক্কো। শুরুর ধাক্কা সয়ে লড়াই জারি রেখেছিল দলটি। ৭৯তম মিনিটে কোলো মুয়ানি ব্যবধান দ্বিগুণ করলে আশা শেষ হয়ে যায় তাদের।
“আমার সেই ম্যাচের লড়াইয়ের তীব্রতা ও অনুভূতিগুলো এখনও মনে আছে…পিছিয়ে পড়লেও বিশ্বাস রেখেছিলাম এবং লড়াই করেছিলাম। ফ্রান্সকে আটকে রাখা কঠিন ছিল, কেননা, প্রতিটি ছোটখাট ভুলেরও সুযোগ নেয় তারা।
“তাদের গতি, অভিজ্ঞতা এবং এমন খেলোয়াড় আছে, যারা মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। কখনও কখনও আপনি অনুভব করতে পারেন, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে, কিন্তু একটা পাল্টা আক্রমণে সবকিছু পাল্টে দিতে পারে।”
হৃদয়ভাঙা ওই হার সত্ত্বেও, ঘরে ফেরা দলকে মরক্কানরা বীরদের মতো বরণ করে নিয়েছিল। ফিফার সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতায় আবুখলাল জানালেন, কাতার বিশ্বকাপে সেমি-ফাইনালে ওঠা, খেলোয়াড়দের মনে আত্মবিশ্বাসের বীজ বুনে দিয়েছিল। সমর্থকরাও সেই থেকে দলের পাশে থাকতে শুরু করে।
“এর অর্থ অনেক। কেবল খেলোয়াড়দের জন্য নয়, পুরো দেশের এবং বিশ্বের সব প্রান্তে থাকা মরক্কানদের জন্য ওই সাফল্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়, মরক্কান ফুটবল নিয়ে মানুষের বিশ্বাস বদলে দিয়েছিল।
“এর আগে মানুষ হয়ত আশা করত, মরক্কো বড় দেশগুলোর বিপক্ষে লড়াই করতে পারে। কিন্তু এখন সবাই জানে, মরক্কো এই পর্যায়ে খেলার যোগ্য।”
মানসিকতার ওই পরিবর্তন খেলোয়াড়দের মধ্যেও ঘটে। তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে চলতি আসবে। দূর থেকে সেটা নজর এড়ায়নি আবুখলালের। দলের স্থিরতায় তিনি মুগ্ধ।
“তাদের পরিপক্কতা (আমাকে সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে)। তাদের শান্ত, আত্মবিশ্বাসী ও ঐক্যবদ্ধ দেখাচ্ছে। এই পর্যায়ে আসায় তারা অবাক, এমনটা নয়। প্রতিপক্ষ যেই হোক, আপন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তারা খেলতে চায় এবং এটা আমরা ব্রাজিল ও নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচে দেখেছি।”
আত্মবিশ্বাসী মরক্কো এখন ফ্রান্স পরীক্ষার সামনে। যে দলটির আক্রমণভাগ ক্ষিপ্র, ধারাল এবং সময়ের সেরাদের একটি। সাত গোল করা এমবাপে যে আক্রমণভাগের প্রাণভোমরা। আবুখলাল অবশ্য মনে করছেন, ফ্রান্স সব দিক থেকেই শক্তিশালী।
“অবশ্যই, এমবাপে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের একজন। তাকে নিয়ে আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। তবে, ফ্রান্স দল কেবল একজন এমবাপে নিয়ে নয়। সব বিভাগেই মানসম্পন্ন খেলোয়াড় আছে তাদের।
“মরক্কোকে ঐক্যবদ্ধভাবে রক্ষণ সামলাতে হবে, জমাট থাকতে হবে এবং পাল্টা আক্রমণের সময় ফ্রান্সকে খুব বেশি জায়গা দেওয়া যাবে না। তবে, বল পায়ে সাহসীও হতে হবে। ফ্রান্সের বিপক্ষে, আপনি শুধু টিকে থাকতে পারবেন না। এমন মুহূর্তও তৈরি করতে হবে, যখন আপনি তাদেরকে রক্ষণ সামলাতে বাধ্য করবেন।”
প্রতিপক্ষের রক্ষণে এমন চাপ দিয়ে, বেলজিয়ামকে ২-০ গোলে হারিয়ে, কাতার বিশ্বকাপে প্রথম জয় তুলে নিয়েছিল মরক্কো। আবুখলাল করেছিলেন ব্যবধান দ্বিগুণ করা গোলটি। ওই দলে যেমন অভিজ্ঞ সাফল্যের জন্য ‘ক্ষুধার্ত’ মেধাবী ফুটবলার ছিল, কিছু অদলবদল হলেও বর্তমান দলে তার কমতি দেখছেন না আবুখলাল।
কাতার বিশ্বকাপে অধিনায়কত্ব করা রোমাঁ সাইস গত বছর আফ্রিকা নেশন্স কাপের পর অবসর নেন। কিন্তু ওই দলের গোলকিপার ইয়াসিন বোনু, ডিফেন্ডার নুসায়ের মাজরাউই, আশরাফ হাকিমি আছেন। হাকিমি এখন অধিনায়ক। ড্রেসিংরুমে এই অভিজ্ঞরা ইতিবাচক প্রভাব রাখছেন বলে মনে করেন আবুখলাল। গত বিশ্বকাপ থেকে উঠে আসা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্রাহিম দিয়াস ও ইসমায়েল সাইবারিকে দেখে মুগ্ধ তিনি।
“ব্রাহিম দলে অনেক সৃজনশীলতা নিয়ে এসেছে। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে সে বল ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, চাপের মুখে বল ধরে রাখতে পারে এবং প্রতিপক্ষকে বিপদে ফেলার মতো পাস দিতে পারে।
“যখন সে (সাইবারি) মাঝমাঠে নেমে আসে, তখন তাকে অনুসরণ করা কঠিন হয়ে যায়। ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচটি যদি সে খেলতে না পারে (চোটের কারণে), তাহলে অবশ্যই তা দলের জন্য বড় ধাক্কা হবে। কারণ, সে খুবই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। কিন্তু মরক্কোর দলগত শক্তিই আসল, যেখানে কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে।”
ঘরে বসে বিশ্বকাপ খেলার কষ্টটুকু মেনে নিচ্ছেন আবুখলাল। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন ফ্রান্সের বিপক্ষের ম্যাচটির জন্য। জিতলেই টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনাল খেলবে মরক্কো।
“সেমি-ফাইনালে উঠতে পারলে বিশাল প্রাপ্তি হবে। তবে, এর চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, ২০২২ সালে যে পথচলা শুরু করেছিল মরক্কো, এটা দেখাবে তারা সেই পথেই এগিয়ে চলেছে। এই দল ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে, তারা দুর্দান্ত কিছু গড়েছে এবং এখন তারা সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে।
“এটা (ফ্রান্সকে হারাতে পারলে) প্রমাণ করবে- মরক্কো শুধু একটা আসরে দুর্দান্ত খেলতে সক্ষম নয়, বরং তারা বারবার সেরাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে জানে।”