Published : 07 Nov 2025, 02:19 PM
অপরিহার্য উপাদান হিসেবে সংবাদপত্রের পাতায় প্রতিদিনিই ছবি প্রকাশিত হয়। দিন শেষে অনেক সময় এই ছবিগুলোর আবেদনও শেষ হয়ে যায়। তবে কিছু ছবি ব্যতিক্রম। সেই ছবিগুলো হয়ে ওঠে ইতিহাসের অংশ। দীর্ঘদিন এই ছবিগুলো নিয়ে আলোচনা হয়, চলে নানামুখী বিশ্লেষণ। যেমন এখনও তিয়েনআনমেন স্কয়ারের ট্যাঙ্ক ম্যান (Tank Man), টুইনটাওয়ারে হামলার দ্য ফলিং ম্যান (The Falling Man) অথবা কূটনৈতিক অঙ্গনের সাড়া জাগানো ছবি দ্য ফ্রাটারনাল কিস (The Fraternal Kiss) ইত্যাদির আবেদন কমেনি একটুও। এছাড়া যুদ্ধ সংঘাত নিয়েও অনেক ছবি আছে এখন ইতিহাসের অংশ। সেই একটি ছবির মাধ্যমেই পুরো একটি ঘটনা সম্পর্কে মানুষ জানতে পারে প্রয়োজনীয় ইতিহাস।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও অনেক ঐতিহাসিক ছবি আছে। একজন ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু পাঠক হিসেবে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের প্রতি আমার আগ্রহ আছে। এই সময়ের দুটি ছবির আমার কাছে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়। যার ঐতিহাসিক মূল্যও রয়েছে বলে আমার ধারণা। আসুন, সেই দুটি ছবি সম্পর্কে আলোচনায় যাওয়ার আগে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর নিয়ে দুটো কথা জেনে নেওয়া যাক।
১৯৭৫ সালের নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধোঁয়াশাপূর্ণ এক অধ্যায়। ইতিহাসের এই ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে পরস্পর বিরোধী দাবি আর দোষারোপের শেষ নেই। ৫০ বছর পরও রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মতো করে দিনটিকে পালন বা উদযাপন করে আসছে। কেউ করছে অসমাপ্ত বিপ্লবের আক্ষেপ, কারও কাছে দিনটি সংহতির, আবার কারও কাছে দিনটি মুক্তিযোদ্ধা হত্যার শোকাবহ দিন। এই সময় নিয়ে মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব.) বীর বিক্রম তার ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য’ বইয়ে লিখেছেন, “মুজিব হত্যার পর বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী ছিল দ্বিধাগ্রস্ত এবং দেশ প্রতিদিনই অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এক দিকে ক্ষমতায় এসেই আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা সর্বজনাব নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী, এ.এইচ.এম. কামরুজ্জামান ও আব্দুস সামাদ আজাদকে আটক করেন এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখেন। বাতাসে নানা গুজব উড়ছিল ও সাধারণ নাগরিক ভয়-ভীতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। সেনানিবাসেও অস্থিরতা বিরাজ করছিল এবং ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে, যে কোনো সময় সংঘর্ষ বেধে যেতে পারে।”

মইনুল হোসেন চৌধুরীর আশঙ্কাই ঠিক ছিল। সেই সংঘাতের শুরু হয়েছিল ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ আর যার আপাত সমাপ্তি ঘটেছিল ৭ নভেম্বর ১৯৭৫। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানকারীরা রক্তপাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলেও ৭ নভেম্বর কিন্তু অনেক রক্ত ঝরেছে। এর আগে ৩ নভেম্বর কারা অভ্যন্তরে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জাতীয় চারনেতাকে।
১৯৭৫ সালের ধোঁয়াশাপূর্ণ অধ্যায়ে ৫ নভেম্বর প্রকাশিত হয়েছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি। বলে রাখা ভাল ৩ নভেম্বর রাতে খালেদ মোশাররফ ও শাফায়াত জামিলরা অভ্যুত্থান ঘটালেও তারা কিন্তু কোন সরকার গঠন করতে পারেননি। বলা যায়, ৩-৭ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ছিল সরকারবিহীন। যদিও রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিচারপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ৬ নভেম্বর শপথ নিয়েছিলেন। কিন্তু সে সময় অনেক কিছুতেই তার কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। দেশে তখন কোন বৈধ, দৃশ্যমান কর্তৃপক্ষও ছিল না। এই সময়ই ৫ নভেম্বর ১৯৭৫ সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশিত হয়েছিল একটি আগ্রহ উদ্দীপক সংবাদ ছবি। এই ছবিতে দেখা যায় ঢাকা শহরের একদল মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি নিয়ে একটি মৌন মিছিল করছেন। যে মিছিলটির গন্তব্য ছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর শেখ মুজিবুর রহমান সংক্রান্ত সংবাদ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে এক প্রকার নিষিদ্ধি ছিল। ৪ নভেম্বর ওই মৌন মিছিলের পর সে সময় ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রায় সব সংবাদপত্রে এই ছবি প্রকাশিত হয়েছিল।
দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত ৫ নভেম্বরের সংবাদের শিরোনাম ছাত্রদের মৌন মিছিল: বঙ্গবন্ধুর রূহের মাগফেরাত কামনা। যার বর্ণনায় বলা হয়, মঙ্গলবার বেলা সাড়ে দশটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে ছাত্রদের একটি মৌন মিছিল বের করা হয় এবং ১১টা ১৫ মিনিটে মিছিলকারীরা ধানমণ্ডির বত্রিশ নাম্বার সড়কে উপস্থিত হয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা ও রূহের মাগফেরাত কামনা করেন। মিছিলটির পুরোভাগে বঙ্গবন্ধুর বিশাল একটি প্রতিকৃতি ছিল। মিছিলে বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী ও মহিলারা যোগ দেন। বটতলা থেকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন অভিমুখী এই মিছিল নীলক্ষেত সড়ক ও নিউ মার্কেট হয়ে সুশৃঙ্খলভাবে পথ অতিক্রম করে। বত্রিশ নম্বর বাসভবনে পৌঁছে ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ গেটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চারটি প্রতিকৃতি লাগিয়ে দেন এবং এর ওপর পুষ্পমাল্য ও ফুল ছিটিয়ে দেন। তারা বঙ্গবন্ধুর রূহের মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করেন। পরে মিছিলটি আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ফিরে এসে শেষ হয়। বিকেলে শহীদ মিনারে এক ছাত্র জমায়েত হয়। জমায়েত শেষে মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি পুরান হাইকোর্ট ও প্রেসক্লাব হয়ে বায়তুল মোকাররমে গিয়ে শেষ হয়। (৫ নভেম্বর, ১৯৭৫, দৈনিক বাংলা)
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন এই মিছিলে ঢাকা শহরের অনেক সুধীজনের যোগ দেওয়ার কথা ছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত অনেকেই যোগ দেননি। তবে এই মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন খালেদ মোশাররফের ভাই রাশেদ মোশাররফ। তিনি তখন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন। এছাড়া এই শোক মিছিলের একটি অংশে খালেদ মোশাররফের মা যোগ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। এই মিছিলকে অনেকেই আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফেরত আসার ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত এমন কিছু ঘটেনি।

১৯৭৫ সালের ওই জটিল ও উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে আরেকটি আলোচিত ছবি প্রকাশিত হয়েছিল ৬ নভেম্বর। এই ছবিতে দেখা যায়, খালেদ মোশাররফকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি ও সেনাধাপ্রধানের ব্যাজ পরাচ্ছেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন এই ছবিটি সব সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি। ছবিটি ৬ নভেম্বর প্রকাশ করে ‘দ্য বাংলাদেশ টাইমস্’। যদিও খালেদ মোশাররফের পদোন্নতি ও সেনাপ্রধান হওয়ার সংবাদ আগেই প্রকাশিত হয়েছিল।
৫ নেভম্বের ১৯৭৫ দৈনিক ইত্তেফাক এ প্রকাশিত হয়েছিল সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ পদে মে. জে. খালেদ মোশাররফ শিরোনামের একটি সংবাদ। সংক্ষিপ্ত এই সংবাদে বলা হয়, ...মঙ্গলবার প্রেসিডেন্টের বিশেষ এক ঘোষণায় বলা হয় ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম পিএসসি কে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর পূর্বাহ্ন হইতে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করিয়া চিফ অব আর্মি স্টাফ নিয়োগ করা হয়েছে। একই দিনে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর-উত্তম পিএসসি পদত্যাগ করায় তিনি তার স্থলাভিষিক্ত হইয়াছেন। (৫ নভেম্বর, ১৯৭৫, দৈনিক ইত্তেফাক)
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, খালেদ মোশাররফের এই ছবি অনেকের কাছে ইতিবাচক বার্তা বহন করেনি। কারণ সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করে তিনি এই পদে আসীন হয়েছিলেন। তাই এই ছবির প্রতিক্রিয়াও হয়েছিল বেশ কঠিন। যে প্রেক্ষাপটে নানা ঘটনার সীমকরণে ছবি প্রকাশের ওই রাতেই অর্থাৎ ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ রাতেই বঙ্গভবন ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন খালেদ মোশাররফ।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিভিন্ন দলের বিভিন্ন ধরনের বয়ান, ব্যাখ্যা ও দাবি রয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতায় যখন যে দল থাকে তখন তাদের বয়ান শক্তিশালী হয়ে গণপরিসরে বিচরণ করে। তৈরি করার চেষ্টা করে জনমত। কিন্তু আমার ধারণা শক্তিশালী এইসব বয়ানের বাইরেও এইসব রক্তাক্ত ঘটনার অনেক উপাদান থাকে। যে উপাদানগুলো ক্ষুদ্র হলেও অনেক সময় বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে পারে।