Published : 23 Aug 2025, 09:15 PM
কয়েক মাস আগে, এই বছরেরই ২ জানুয়ারি ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার বলেছিলেন, বাংলাদেশ তাদের ‘বিচরা হুয়া’ ভাই। ‘বিচরা হুয়া’ মানে হারিয়ে যাওয়া—বাংলাদেশ তাদের হারিয়ে যাওয়া ভাই হতে যাবে কেন? ইসহাক দারের বক্তব্য ছিল—বাংলাদেশকে সম্ভাব্য সব উপায়ে সহযোগিতা করবে পাকিস্তান।
এর একদিন পর ৪ জানুয়ারি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে আমার একটি কলাম প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ছিল—বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের ‘বিচরা হুয়া’ ভাই? আমি লিখেছিলাম, বাংলাদেশ পাকিস্তানের ভাই হতে যাবে কেন? তিনি বলতে পারতেন, বাংলাদেশ তাদের গোয়ালঘর থেকে হারানো গাভী। গাভীটা একাত্তর সালে রশি ছিড়ে স্বাধীন হয়ে গেলে ওদের দুধ খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। ‘বিচরা হুয়া’ ভাই না গাভী সেই বিতর্কে আর যাব না।
ইসহাক দার ২৩ অগাস্ট বাংলাদেশে এসেছেন। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন বেশ সরগরম। পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান এসেছেন তারও আগে ২১ অগাস্ট চার দিনের সফরে।
আমাদের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, “পাকিস্তানের সাথে আমাদের সম্পর্ক ভারত ডিসাইড করবে না।” অবশ্যই করবে না, আমরা স্বাধীন দেশ—ভারত ডিসাইড করবে কেন? তবে আমরা যখন ডিসাইড করব—আমাদের কি মান-সম্মান, ইতিহাসবোধ, ক্ষত-ব্যথা, ক্রোধ, লজ্জা—এসব কিছুই কি থাকবে না?
উপদেষ্টা আরও বলেছেন, “অন্য দশটি দেশের সঙ্গে যে রকম সম্পর্ক, পাকিস্তানের সঙ্গেও সে সম্পর্ক থাকবে বাংলাদেশের।” মান্যবর উপদেষ্টার কাছে প্রশ্ন এখানেই, তিনি কি জানেন না—অন্য কোনো দেশ আমাদের দেশে গণহত্যা চালায়নি। অন্য কোনো দেশ আমাদের জিসি দেব, মুনীর চৌধুরী, আলতাফ মাহমুদ, শহীদুল্লাহ কায়সারদের মতো বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে আমাদের জাতিকে ‘বুদ্ধিচ্যুত’ করতে নীলনকশা তৈরি করেনি। অন্য কোনো দেশ আমাদের দেশের সম্পদ অপহরণ করে রেখে আমাদেরকে ভালোবাসা দেখাতে আসেনি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক এম. হুমায়ুন কবির একটি জাতীয় দৈনিকে কূটনৈতিক ভাষায় লেখা একটি নিবন্ধে লিখেছেন, “আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হলো দ্বিধান্বিত কূটনীতি ও অসমন্বিত।”
দ্বিধান্বিত তো বটেই, আমাদেরকে যারা দুটি ভালো কথা বলে, আমরা সেদিকেই দৌড়াই—কখনো চীন, কখনো আমেরিকা এবং প্রায়শই পাকিস্তান।
আমি এই বছরের মার্চ মাসে ‘ইউনূস সরকারের রিপোর্ট কার্ড’ শিরোনামে একটা কলাম লিখেছিলাম। তাতে বলা হয়েছিল, ইউনূস সরকারের সবচেয়ে কম প্রাপ্তি হলো পররাষ্ট্র বিষয়ে—‘কেমন যেন দিকহারা, গতিহীন একটা জাহাজ।’ কথাটা তখনও সত্য ছিল এবং সম্ভবত এখনো সত্য।
আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে যদি ‘মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ’ দেখাতেই হয়, তাহলে আরও অনেক দেশ আছে—মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, ওমান ও মিশর। এগুলো পছন্দ না হলে আছে মরক্কো, আজারবাইজান—এমন আরও কত দেশ। অনেক মুসলিম দেশের সঙ্গে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক আছে। পাকিস্তানের এমন কী সম্পদ ও ঐতিহ্য আছে যে তাদেরকে এত গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে হবে আমাদের এবং এত সৌহার্দ্য দেখাতে হবে? যারা বলবেন ‘কেন নয়’, তাদের জন্য আরও কিছু তথ্য দিচ্ছি।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান ( সূত্র: ডাটা.ওয়ার্ল্ডব্যাংক.অর্গ ) দেখলে বোঝা যায়, অর্থনীতির এমন কোনো সূচক নেই যেখানে পাকিস্তানের অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে ভালো—তারা প্রতিটা ক্ষেত্রেই আমাদের চেয়ে পিছিয়ে তারা। জিডিপি হলো, এক বছরে একটি দেশের উৎপাদিত পণ্যের মোট মূল্য—অর্থনীতির স্বীকৃত আন্তর্জাতিক পরিমাপ। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের পরিসংখ্যানে পাকিস্তানের সর্বমোট জিডিপি হলো ৩৭৩ বিলিয়ন ডলার, আর বাংলাদেশের ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। পাকিস্তানের মাথাপিছু জিডিপি হলো ১,৪৮৪ ডলার, বাংলাদেশের ২,৫৯৩ ডলার। জিডিপি বৃদ্ধির হার পাকিস্তানের ৩.২ শতাংশ, বাংলাদেশের ৪.২ শতাংশ। মুদ্রাস্ফীতির হার পাকিস্তানে ১২.৬ শতাংশ এবং বাংলাদেশে ১০.৫ শতাংশ । বেকারত্বও পাকিস্তানে বেশি—৫.৫ শতাংশ আর বাংলাদেশে ৪.৭ শতাংশ।
এগুলো তো হলো অর্থনৈতিক ঘাটতি। কিন্তু এর বাইরেও, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো তাদের বর্বরতার ইতিহাস।
আমাদের দুর্ভাগ্য, স্বাধীনতার পর যে কয়টি সরকার এসেছে, তারা সবাই নিজেদের ক্ষমতার স্বার্থে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যেমনভাবে পেরেছে তেমনভাবেই লিখেছে—নিজেদের অবদানকে আলোকিত করতে। সত্যিকার ইতিহাস কখনো লেখা হয়নি। তাই সেই বিকৃত ইতিহাস কেউ খোলসা করে দেখেনি। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখনো অন্ধকারে—হয়তো জানেই না একাত্তরের সেই অন্যায় ও অত্যাচারের বিভীষিকা, হত্যা ও নির্যাতনের নিষ্ঠুরতা। তবুও পাকিস্তানিরা এখন বলে, আমরা তাদের ‘বিচরা হুয়া ভাই’।
পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের অনেক পাওনা আছে। প্রথম পাওনা হলো—অবশ্যই গণহত্যা ও অনাচারের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া। এরপর আছে বাংলাদেশের সম্পদ কড়ায়-গণ্ডায় ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপার। এছাড়াও আছে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের প্রত্যাবাসনের প্রশ্ন। পাকিস্তান যে কোনো আলোচনায় এই বিষয়গুলো সবসময় এড়িয়ে যায়। যেমনভাবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচ মুচকি হেসে চুপচাপ এড়িয়ে গিয়েছিলেন, বাংলাদেশ সফরে এসে।
আমনা বালুচ গত এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব জসিম উদ্দিনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব জসিম উদ্দিনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, “স্বাধীনতাপূর্ব ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছে চার দশমিক তিন দুই বিলিয়ন বা ৪৩২ কোটি ডলার দাবি করেছে।”
বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী একদিকে পাওনা ও ক্ষমা চাওয়ার কথা বলে আসছেন—যেন শুধু বলার জন্য বলা। আরেকদিকে, এইসব আদায় হওয়ার আগে সম্পর্ক উষ্ণ করতে উনুন জ্বালিয়ে রেখেছেন। শাসকদের এই দ্বিমুখী নীতি নিয়ে বাংলাদেশের পাওনা কোনোদিনই আদায় হবে না।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের ভাষ্য, অমীমাংসিত তিন বিষয় আলোচনার টেবিলে আছে। তার দৃঢ়তা দেখে ইসহাক দারও মুচকি হাসবেন। শুধু টেবিলে রাখলেই চলবে না; তাকে আরও দৃঢ়ভাবে এগুলো নিয়ে চাপ দিতে হবে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের বাংলাদেশ সফর সম্পর্কিত একটি বাংলা দৈনিকের শিরোনাম ছিল—‘দৃষ্টি রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতায়’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা সফরের সময় ইসহাক দার বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে।
আবার 'রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা?’ পাকিস্তানের সঙ্গে 'রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা'য় যাওয়া হলো সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার। পাকিস্তানের রাজনীতির এমন কোনো ইতিবাচক দিক নেই যে বাংলাদেশ তা থেকে কিছু শিক্ষা নিতে পারে। বরং আলী রিয়াজের রাজনৈতিক সংস্কার ও ঐকমত্যর নোটগুলোর কপি তাদেরকে দেওয়া যেতে পারে। তাদেরও হয়তো এগুলো কাজে লাগতেও পারে।
সরকার কিছুদিন আগে পাকিস্তানিদের জন্য ভিসার কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল করেছে। আমাদের সরকার দেশীয় অপরাধীদেরই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। তার সঙ্গে এখন যোগ দিতে পারে আমদানি করা অপরাধীদের বিভিন্ন গোষ্ঠী। যারা আমাদের পাকিস্তান নীতি পরিচালনা করেন, তারা কি এইসব বিষয় ভেবে দেখেছেন?
খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে উভয় পক্ষই আগ্রহী। এমনকি ইসহাক দারের বাংলাদেশ সফরে তার সঙ্গে পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খানসহ কিছু ব্যবসায়ীও এসেছেন।
ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহী হওয়া ভালো কথা। আজকাল দুনিয়ায় সব দেশেরই পণ্য সংগ্রহে পরস্পরের ওপর নির্ভরতা রয়েছে—কারো দরকার চাল, কারো তুলা; কেউ বেচতে চায় মাছ বা কাঁকড়া। আমরা যখন হাটে যাই, বিক্রেতা কে তা দেখি না—দেখি পণ্যটা কেমন এবং দামে সস্তা পাওয়া যাবে কিনা। পাকিস্তানের সঙ্গেও একই নীতি গ্রহণ করতে হবে। তাদেরকেও আমাদের আমদানির সমমূল্যের কিছু পণ্য কিনতে হবে।
বাংলাদেশের সব দাবিগুলো মেটানোর আগে পাকিস্তানের সঙ্গে এর চেয়ে বেশি সম্পর্ক গড়া অপ্রয়োজনীয় এবং অবমাননাকর। আমরা আশা করব, পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক যেন ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ বা ‘মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ’ এইসব ‘স্ট্রিট ডিপ্লোম্যাসি’ দিয়ে মীমাংসিত না হয়।
যারা আমাদের দেশে জেনোসাইড বা গণহত্যা চালিয়েছে, তারা আমাদের ভাই বা বন্ধু হতে পারে না। আমাদের বন্ধুত্ব চাইলে পাকিস্তানকে করতে হবে—অবশ্যই রাষ্ট্রীয়ভাবে জেনোসাইডের দোষ স্বীকার করে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। বাংলাদেশি সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং আটকে থাকা পাকিস্তানি নাগরিকদের যথাযথ প্রত্যাবাসনও নিশ্চিত করতে হবে। এর আগে সম্পর্কের উষ্ণতা গড়ে তোলার চেষ্টা আসলে ফাটা ডিমে তা দেওয়ার মতো—“ফাটা ডিমে আর তা দিয়ে কী ফল পাবে?/ মনস্তাপেও লাগবে না ওতে জোড়া।”