Published : 01 Jan 2026, 05:12 PM
বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে শুরু করে সামাজিক পরিবেশ—সব জায়গায় একধরনের প্রবল বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। কখনও কখনও সেটি গত ১৮ ডিসেম্বরের মতো সহিংস ও ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করছে। এক কথায় বলা যায়, সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। আর তার শিকার হচ্ছে জনগণ ও জনগণের প্রতিষ্ঠানসমূহ। ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই যেন এক বিশাল নিয়ন্ত্রণহীনতা বিরাজমান।
৫ অগাস্ট ক্ষমতার পালাবদলের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন বিশৃঙ্খলার এক অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই অরাজক পরিস্থিতির দায় কার? পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের, নাকি রাষ্ট্রের? এই প্রশ্নের সরল কোনো উত্তর নেই। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সর্বোচ্চ দায়িত্ব যেহেতু রাষ্ট্রের, তাই এ দায় প্রথমত রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। কারণ ব্যক্তি হিসেবে মানুষ সাধারণত ক্ষমতাহীন; তাই জনগণ রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের সমষ্টিগত শক্তি দিয়ে সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। ব্যক্তির পক্ষে রাষ্ট্রের মতো সমষ্টিগত সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে তাদের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র জনগণের ওপর এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এ নিয়ন্ত্রণ সে প্রতিষ্ঠা করে বিবিধ আইন ও বিধি-নিষেধ প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে। রাষ্ট্র ও জনগণের এই সমঝোতা অনেক পুরোনো। ইতিহাসের নানা পর্যায়ে বিবর্তিত হয়ে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এটি সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
রাষ্ট্র বনাম জনগণের ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যায় থমাস হবসের ‘লেভিয়াথন’ গ্রন্থে। তিনি জনগণকে প্রাকৃতিকভাবে ‘বিশৃঙ্খল, নির্দয় ও অসৎ’ বলে উল্লেখ করেছেন। আর এই আপাত বিশৃঙ্খল মানুষকে নিয়ন্ত্রণের জন্য রাষ্ট্রের আইন-কানুন প্রতিষ্ঠার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। এ আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রনায়ক (প্রিন্স) জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা স্থাপন করবেন। তার যুক্তি, ‘জনগণ তাদের নিজেদের নিরাপত্তার বিনিময়ে সর্বময় শক্তিশালী রাষ্ট্রের কাছে নিজেদের স্বাধীনতাকে ন্যস্ত করে’। এ সম্মতির ভিত্তিতেই রাষ্ট্র জনগণকে শাসনের অধিকার লাভ করে।
পরবর্তীকালে জন লক রাষ্ট্রের এই সর্বময় নিয়ন্ত্রণের ধারণাকে সমালোচনা করেন এবং বলেন, জনগণের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ সীমিত হতে হবে। এ নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই জনগণের ‘প্রাকৃতিক অধিকার’ কেড়ে নিতে পারবে না। তিনি প্রাকৃতিক অধিকার হিসেবে তিনটি বিষয় উল্লেখ করেন—‘জীবন’, ‘সম্পত্তি’ ও ‘স্বাধীনতা’। এ তিনটি অধিকারের জন্য জনগণকে রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না। পরবর্তীতে কার্ল মার্কসও পুঁজির দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের নিয়ন্ত্রণকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র মূলত পুঁজি ও বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার জন্যই এ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে সময়োপযোগী ব্যাখ্যাটি দিয়েছেন মিশেল ফুকো। তিনি ‘ডিসিপ্লিনারি পাওয়ার’ ধারণার মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন কীভাবে রাষ্ট্র শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এমনকি জনগণের মনোজগত থেকে পরিচয় পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র। এছাড়াও তিনি ‘প্যানোপটিকন’ ও ‘বায়োপলিটিক্স’ ধারণার মাধ্যমে রাষ্ট্রের এই নিয়ন্ত্রণের খারাপ দিকটিও তুলে ধরেছেন। তিনি জেরেমি বেন্থামের ‘প্যানোপ্টিকন’ ধারণা সমাজের ক্ষমতার ধারণাকে ব্যাখ্যা করতে ব্যবহার করেছেন। রাষ্ট্র কীভাবে কারাগারের মতো নজরদারি করে জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে সেটিই ব্যাখ্যা করেছেন এই ধারণার মাধ্যমে। আর ‘বায়োপলিটিক্স’ ধারণার তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে আধুনিক রাষ্ট্র জনগণের তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে সমষ্টিগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।
অ্যান্থনি গ্রামসিও রাষ্ট্র কাঠামোতে ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে তার ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তিনি বলেন, ক্ষমতা শুধু ভয়ভীতি বা সহিংসতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। নানারকম নজরদারি, মূল্যবোধ, জ্ঞানের মাধ্যমেও নিয়ন্ত্রিত হয়।
ভাবনার বিষয় হলো, রাষ্ট্রের এই নিয়ন্ত্রণ ধারণাটি সমস্যাপূর্ণ। কারণ, রাষ্ট্রের এই নিয়ন্ত্রণের অন্যতম লক্ষ্য যেহেতু জনগণ, তাই জনগণ ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য অনেক সময় রক্ষা হয় না। আর যেসব দেশে গণতান্ত্রিক কাঠামগুলো দুর্বল সেখানে এই নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের কথা বলা যেতে পারে। আজ থেকে পাঁচ দশক আগে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিতে এই জনগণ বনাম রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ধারণাটির মীমাংসা হয়নি। অর্থাৎ রাষ্ট্র বনাম জনগণের মধ্যে এই ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে, বরাবর রাষ্ট্রই জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করে গেছে। জনগণের পক্ষে ওই ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এর অন্যতম কারণ হলো নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় ত্রুটি।
অর্থাৎ আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্র যেখানে আইন ও নিয়ম-কানুন প্রচলন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, বাংলাদেশে সেটি হয়েছে দলীয় আনুগত্য ও মতাদর্শিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। ফলে, কোনো ক্ষমতাসীন দল যখন ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে, পরবর্তী সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন ক্ষমতাসীন দল সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে তার দলের কর্মীদের মাধ্যমে এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করেছে। যার ফলে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার দুটি ক্ষতি হয়েছে।
প্রথম যে বড় ক্ষতিটি হয়েছে তা হলো জনগণ মনে করতে শুরু করেছে রাজনীতিই হলো সামাজিক স্থিতিশীলতা ও উন্নতি অর্জনের একমাত্র হাতিয়ার। ফলে, ক্ষমতার পরিবর্তন হলে মানুষ ক্ষমতাসীনদের দলে ভিড়ে তাদের নিজস্ব সামাজিক স্থিতিশীলতা ও প্রতিপত্তি অর্জনের প্রচেষ্টা চালিয়েছে। দ্বিতীয় ক্ষতিটি হয়েছে, জনগণ রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। ফলশ্রুতিতে তারা মনে করতে শুরু করেছে যে, আইন-কানুন নয় বরং রাজনৈতিক আনুগত্যই সকল সমস্যার সমাধান।
দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময়ে এই প্রক্রিয়া চলার কারণে এই আস্থাহীনতা খোদ রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রবেশ করেছে। ফলে, জনগণের প্রতি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় তারাও সরকারের সম্পূরক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। জনগণের প্রতিষ্ঠান হলেও জনগণের সরকারের মতো ওই প্রতিষ্ঠানগুলোও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে। ফলে, আমরা দেখেছি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পালাবদল হলেও ওই ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হয়নি। সময়ের পরিবর্তনে রাষ্ট্রই শুধু জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। জনগণ বনাম রাষ্ট্রের ভারসাম্য থেকে গেছে অধরা।
এখন স্বভাবতই প্রশ্ন করা যায়, এই চলমান সমস্যার সমাধান কোথায়? আমরা যদি পশ্চিমা আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার দিকে তাকাই তাহলে সেখানে একটি প্রায়োগিক সমাধান দেখতে পাই। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো মূলত দুভাবে এই সমস্যার উল্লেখযোগ্য সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে। প্রথমত, জনগণকে আইনের শাসন মেনে চলার জন্য তাদের শিক্ষাজীবনের সকল পর্যায়ে সেটির প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে। যা তাদেরকে দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল জাতি হিসেবে গড়ে তুলেছে। দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক অবকাঠামো তৈরি এবং সেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। যে কাঠামোই ব্যক্তি বা মতাদর্শ নয় বরং প্রতিষ্ঠান বা দেশই প্রথম। যে কাঠামোর মূল হাতিয়ার হলো আইন ও নিয়ম-কানুন। এই পদ্ধতি হলো এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে সফল পদ্ধতি। আমরা যদি সেটি করতে পারি তাহলে এই ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।