Published : 12 May 2026, 04:30 PM
অনেক বছর আগে এক শীতের সকালে পুরান ঢাকায় একটি আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ সাংবাদিকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তার হাতে ছিল একটি নোটবুক। তিন মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। তবুও প্রতিদিন আদালতে আসেন। “আমরা যদি রিপোর্ট করা বন্ধ করি,” তিনি আমাকে বলেছিলেন, “মানুষ খবর জানতে পারবে না।” এই নিঃশব্দ, অবিচল প্রতিশ্রুতিই বাংলাদেশের সাংবাদিকতার মেরুদণ্ড।
আজ সেই প্রতিশ্রুতিকেই শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। সাংবাদিক দম্পতি ফারজানা রুপা ও শাকিল আহমেদ ২০২৪ সালের ২১ অগাস্ট থেকে কারাগারে আটক আছেন। এখন পর্যন্ত ৬২০ দিনেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, কোনো আনুষ্ঠানিক চার্জশিট নেই। মোজাম্মেল হক বাবু ও শ্যামল দত্ত ৫৯৪ দিনেরও বেশি সময় ধরে বন্দি। প্রবীণ সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, যার বয়স ৭৫ বছর, হাঁটতে পারেন না, তিনিও ৫৯৩ দিনের বেশি সময় ধরে বিচার ছাড়া আটক। সম্প্রতি একদিন শুনানির সময় তিনি বসার জন্য একটি চেয়ার চেয়েছিলেন। ম্যাজিস্ট্রেট অনুমতি দেননি। পুলিশ হুইলচেয়ারও দেয়নি। এ ধরনের আচরণ মানবিক মর্যাদার প্রকাশ্য লঙ্ঘন।
এই পাঁচ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। হত্যাসহ একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবার ন্যায়বিচার চায়। তাদের কষ্ট অনেক গভীর। কিন্তু আইনের শাসনে অভিযোগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। ফারজানা রুপার বিরুদ্ধে নয়টি মামলা, শাকিল আহমেদের বিরুদ্ধে আটটি। একটি মামলাতেও এখনো চার্জশিট দাখিল হয়নি। জামিনের আবেদন ৩০ বারেরও বেশি নাকচ হয়েছে বলে তাদের আইনজীবীরা জানিয়েছেন। জাতিসংঘের আরবিট্রারি ডিটেনশন ওয়ার্কিং গ্রুপ শাহরিয়ার কবিরের মামলা পর্যালোচনা করে বলেছে, তার আটক ‘আইনগতভাবে ভিত্তিহীন’ এবং ‘স্বেচ্ছাচারী’।
বাংলাদেশের সংবিধান এ বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতা রাখেনি। ৩৯ অনুচ্ছেদে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এগুলো কেবল আলঙ্কারিক কথা নয়; নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের আইনি প্রতিশ্রুতি। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিতেও বাংলাদেশ স্বাক্ষরকারী, যেখানে বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত ও ন্যায্য বিচারের অধিকার নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চার্জশিট ছাড়া সাংবাদিকদের আটক রাখা এই দুই প্রতিশ্রুতির সরাসরি লঙ্ঘন।
কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস এবং কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা এই আটকের নিন্দা করেছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের ২০২৫ সালের সূচকে বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৯তম স্থানে রয়েছে। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যে, ১৩০ জনেরও বেশি সাংবাদিককে ‘ভিত্তিহীন মামলায়’ জড়ানো হয়েছে। এই পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অসহিষ্ণুতার বার্তা পৌঁছায়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সাম্প্রতিককালে ফিলিপাইনের বিখ্যাত অনুসন্ধানী সাংবাদিক মারিয়া রেসার গ্রেপ্তার এবং তুরস্কে সাংবাদিকদের ব্যাপক আটক ওই দেশ দুটির গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিপরীতে, যে দেশগুলো সমালোচনার মুখেও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা করেছে, তারা আন্তর্জাতিক আস্থা ও বিনিয়োগ টেনে এনেছে। বাংলাদেশ এই মুহূর্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই মামলাগুলো কেবল পাঁচজন ব্যক্তির বিষয় নয়। এটি সারা দেশের সাংবাদিক, সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী এবং সাধারণ নাগরিকদের একটি বার্তা দেয়। বার্তাটি হলো: সাংবাদিকতা করতে গেলে কারাগারে যেতে হতে পারে। ভয় যখন অনুসন্ধানের জায়গা নেয়, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তি কেঁপে ওঠে।
আটক এই সাংবাদিকদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। সমালোচনা থাকতে পারে তাদের রিপোর্টিং নিয়েও। কিন্তু যদি রাষ্ট্রের কাছে সত্যিকারের প্রমাণ থাকে, তাহলে সেগুলো আদালতে উপস্থাপন করুন। চার্জশিট দাখিল করুন। স্বচ্ছ বিচার করুন। এটাই আইনের শাসন। যা এখন হচ্ছে—মাসের পর মাস বিচার ছাড়া আটক রাখা—সেটা শাস্তি। আর বিচার ছাড়া শাস্তি যে রাষ্ট্র দেয়, সে রাষ্ট্র ন্যায়ের রাষ্ট্র নয়।
বর্তমান সরকার এই পরিস্থিতির উত্তরাধিকার পেয়েছে, কিন্তু এই মামলাগুলোর চলমান পরিচালনায় তাদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। যত দিন যাচ্ছে, এই আটকগুলো কেবল সাংবাদিকতার সংকট নয়, বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থার সংকট হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিতি পাচ্ছে।
সমাধান সহজ, যদিও ইচ্ছাশক্তি প্রয়োজন। যদি বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ না থাকে, তবে এই সাংবাদিকদের এখনই মুক্তি দিন। যদি থাকে, তবে দ্রুত ও ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করুন। আটকদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও আইনি প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দিন। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ শুধু বক্তৃতায় নয়, কার্যক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করুন।
বাংলাদেশ অনেক বড় সংকট পেরিয়ে এসেছে। জুলাইয়ের রক্তের প্রতিশ্রুতি ছিল একটি মুক্ত, ন্যায্য সমাজের। সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিচারবিহীন আটক মেলে না। সেই তরুণ সাংবাদিক বলেছিলেন, রিপোর্টিং থেমে গেলে মানুষ জানতে পারবে না। আজ বিপদ আরও বড়। সাংবাদিকরা কথা বলার আগেই থেমে যাচ্ছেন, কারণ তারা জানেন কথা বললে কারাগার অপেক্ষা করছে।
বাংলাদেশের মানুষ এর চেয়ে ভালো কিছু আশা করে। দেশের সাংবাদিকরাও এর চেয়ে ভালো কিছু দাবি করেন। এখনো সময় আছে সংশোধনের।
ড. মো. আবু নাসের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, বেকার্সফিল্ডের কমিউনিকেশনস বিভাগের চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন