Published : 08 Apr 2026, 09:34 AM
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো কৃষি। আর এই কৃষির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে সার, যার মধ্যে ইউরিয়া প্রধান। জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সারের যে মজুত রয়েছে তা আগামী জুন-জুলাই মাস পর্যন্ত চলবে। মন্ত্রীর এই আশ্বাসে সাময়িক স্বস্তি মিললেও দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মেঘ কাটছে না। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই অস্থির সময়ে সার আমদানির জন্য কাতার বা সৌদি আরবের ওপর অতিনির্ভরতা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সেখানে নয়; বড় প্রশ্নটি হলো যে, ইউরিয়া সার উৎপাদনের পর্যাপ্ত সক্ষমতা আমাদের দেশের ভেতরেই আছে, সেখানে আমরা কেন দিনে দিনে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছি? কেন আমাদের নীতিনির্ধারকরা দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থার স্থবিরতা কাটাতে দীর্ঘমেয়াদী ও সাহসী কোনো পরিকল্পনা হাজির করতে পারছেন না?
বাংলাদেশের কৃষি ভর্তুকি নিয়ে নীতিনির্ধারণী মহলে প্রায়ই একটি সরলীকৃত সমীকরণ দেখা যায়—কৃষককে সুরক্ষা দিতে হলে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। কিন্তু বাস্তবতার গভীরে তাকালে দেখা যায়, ভর্তুকি বাড়ছে, সরকারি ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু সমস্যার মূলে হাত পড়ছে না। ইউরিয়া সারের ক্ষেত্রে এই নীতিগত সীমাবদ্ধতা এখন সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)-এর অধীনে থাকা সার কারখানাগুলোর সক্ষমতা এবং বর্তমান উৎপাদন চিত্রের দিকে তাকালে এক চরম বৈপরীত্য চোখে পড়ে। দেশে ইউরিয়া উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন কারখানার সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৩০ লাখ টনের কাছাকাছি। তাত্ত্বিকভাবে বলতে গেলে, আমাদের দেশীয় চাহিদার প্রায় সিংহভাগই নিজস্ব উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বার্ষিক উৎপাদন ৫ থেকে ৮ লাখ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ আমরা আমাদের মোট সক্ষমতার এক-চতুর্থাংশও ব্যবহার করতে পারছি না। এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে চড়া দামে বিদেশ থেকে আমদানি করে। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কাছে আমাদের কৃষি খাত জিম্মি হয়ে পড়ছে।
এই অচলাবস্থার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকটের কথা বলা হয়। এটি সত্য যে ইউরিয়া উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল হলো গ্যাস। তবে এখানে সমস্যাটি কেবল ঘাটতির নয়, বরং অগ্রাধিকার নির্ধারণের। একটি কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে, যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা রাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়ার কথা, সেখানে সার কারখানাগুলো গ্যাস বরাদ্দের ক্ষেত্রে কেন সবসময় তালিকার শেষে থাকবে—এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন বা অন্যান্য শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহে যতটা তৎপরতা দেখা যায়, সার কারখানার ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন খুবই সীমিত। অনেক সময় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চাহিদা মেটাতে গিয়ে সার কারখানার গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়, ফলে কারখানাগুলো বছরের বড় একটি সময় বন্ধ থাকে। রাষ্ট্র একদিকে কৃষকদের জন্য ভর্তুকি দিয়ে সার সুলভ করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সেই সার উৎপাদনের জ্বালানি নিশ্চিত করতে পারছে না—এটি নিছক অদূরদর্শিতা নয়, বরং জাতীয় সম্পদের অপচয়। কারণ কারখানা বন্ধ থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং জনবলের বেতন-ভাতা রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়।
গ্যাস সংকটের পাশাপাশি আরেকটি বড় বাধা হলো আমাদের কারখানাগুলোর প্রযুক্তিগত অদক্ষতা। বাংলাদেশের অধিকাংশ ইউরিয়া সার কারখানা ২০ থেকে ৩০ বছর আগে স্থাপিত এবং সেই সময়ের প্রযুক্তি বর্তমান মানদণ্ডের তুলনায় অনেক বেশি জ্বালানি অপচয়কারী। এই অদক্ষতার এক প্রকট উদাহরণ হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানা (এএফসিসিএল)। ৪৩ বছরের পুরোনো এই কারখানাটি এখন তার আয়ুষ্কাল পেরিয়ে চরম জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটি আর গ্যাস সংকটের কারণে বছরের অর্ধেক সময় কারখানাটি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। পুরোনো প্রযুক্তির কারণে এখানে উৎপাদন খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি অল্প পরিমাণ ইউরিয়া উৎপাদনেও বিপুল পরিমাণ গ্যাস অপচয় হচ্ছে, যা সামগ্রিক জাতীয় উৎপাদনকে ব্যাহত করছে। আধুনিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, এক টন ইউরিয়া উৎপাদনে ২২ থেকে ২৫ এমসিএফ গ্যাসের প্রয়োজন হয়, সেখানে আমাদের পুরোনো কারখানাগুলোতে ৩৫ থেকে ৪০ এমসিএফ বা তারও বেশি গ্যাস ব্যয় হয়। অর্থাৎ একই গ্যাসে আমরা কম উৎপাদন করছি। এর ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং পরিবেশগত ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। বছরের পর বছর এই জরাজীর্ণ অবকাঠামো দিয়ে কারখানা চালানো হলেও সেগুলোকে আধুনিকায়নের কোনো সমন্বিত রোডম্যাপ দৃশ্যমান নয়। ফলে আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থা বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।বর্তমানে প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন বা আমদানিতে সরকারের খরচ পড়ছে ক্ষেত্রবিশেষে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, অথচ সরকার বিপুল ভর্তুকি দিয়ে তা কৃষকের কাছে মাত্র ২৭ হাজার টাকায় পৌঁছে দিচ্ছে। এই যে প্রতি টনে ১৩ থেকে ২৩ হাজার টাকার ঘাটতি, তা মেটানো হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি কারখানাগুলো আধুনিক প্রযুক্তিতে পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হতো, তবে কি উৎপাদন খরচ এত বেশি থাকত? বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ভর্তুকির একটি বড় অংশ কৃষকের কাছে সরাসরি সুবিধা হিসেবে না গিয়ে উৎপাদন ব্যবস্থার অদক্ষতা, গ্যাস অপচয় এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে নষ্ট হচ্ছে। অর্থাৎ আমরা মূল সমস্যার সমাধান না করে অদক্ষ কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে ব্যয় বাড়িয়ে চলেছি।
উৎপাদন ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজার ব্যবস্থায়। সরবরাহে সামান্য ঘাটতি দেখা দিলেই এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেয়। দেশীয় উৎপাদন শক্তিশালী হলে এই মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। কিন্তু উৎপাদন সীমাবদ্ধতার কারণে বাজার নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা রাষ্ট্র হারাচ্ছে।
বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতাও এই সংকটকে জটিল করে তুলছে। রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়, যার প্রভাব বাংলাদেশকেও বহন করতে হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তা—উভয় ঝুঁকিই বিদ্যমান। ফলে আমদানিনির্ভরতা কেবল অর্থনৈতিক চাপই নয়, কৌশলগত দুর্বলতাও তৈরি করছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে তৈরি পোশাক খাত ও রেমিট্যান্সের মতো বহিঃনির্ভর উৎসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যেগুলো বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামা, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শ্রমবাজারের পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে অর্থনীতির এই কাঠামো স্বভাবতই ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্থির। এমন প্রেক্ষাপটে কৃষিখাতই হতে পারে দেশের জন্য সবচেয়ে স্থিতিশীল ও টেকসই ভিত্তি। কারণ এটি সরাসরি অভ্যন্তরীণ চাহিদা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু এই খাতকে কার্যকরভাবে শক্তিশালী করতে হলে কেবল উৎপাদন বাড়ানোর কথা বললেই চলবে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি নির্ভরযোগ্য ও স্বনির্ভর উপকরণ সরবরাহ ব্যবস্থা। সারের মতো মৌলিক কৃষি উপকরণে আমদানিনির্ভরতা বজায় রেখে টেকসই কৃষি-শিল্প ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বরং এতে কৃষি খাত প্রতিনিয়ত বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তার কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হলে কৃষিকে শুধু অগ্রাধিকার দিলেই হবে না, বরং এর ভিত্তিমূল, বিশেষ করে সারের মতো কৌশলগত উপকরণ, দেশীয় সক্ষমতার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার পিএলসি প্রকল্পটি একটি ইতিবাচক উদাহরণ। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই কারখানায় দৈনিক ২৮০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এটি পুরোনো প্রযুক্তির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম গ্যাসে বেশি উৎপাদনে সক্ষম। এ ধরনের প্রযুক্তি অন্যান্য কারখানায় সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে কয়েকটি মৌলিক ক্ষেত্রে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রথমত, জাতীয় জ্বালানি নীতিতে সার কারখানাগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, কারণ এটি সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। দ্বিতীয়ত, পুরোনো ও অকার্যকর কারখানাগুলোর জন্য সময়সীমাবদ্ধ আধুনিকায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং যেগুলো অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়, সেগুলোকে পর্যায়ক্রমে প্রতিস্থাপন করতে হবে। তৃতীয়ত, ভর্তুকি ব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যাস করে তা উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধির প্রণোদনা হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সময়। আমরা কি প্রতিবছর বিপুল ভর্তুকি দিয়ে আমদানিনির্ভর একটি অদক্ষ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখব, নাকি সুপরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর ও শক্তিশালী ইউরিয়া শিল্প গড়ে তুলব? বৈশ্বিক অস্থিরতা আমাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও নিজস্ব সম্পদের কার্যকর ব্যবহার আমাদের হাতেই রয়েছে। কৃষিকে টেকসই ও আধুনিক করতে হলে ইউরিয়া খাতের এই অচলাবস্থা দূর করা এখন সময়ের দাবি। এটি কেবল একটি খাতের সংস্কার নয়, আমাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ লড়াই।