Published : 01 Sep 2025, 03:40 PM
বাংলাদেশকে দেশ হিসেবে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এই দেশ যে ডেল্টায় অবস্থিত, ওই ভৌগোলিক বাস্তবতায় আমরা প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হই। তবু এই ভূখণ্ড ঐতিহাসিক কাল থেকেই তার স্বাতন্ত্র্য ও সত্তা নিয়ে টিকে আছে। বারবার আঘাত সয়েও মানুষের অদম্য শক্তি, সংস্কৃতি, সহাবস্থান এবং পারস্পরিক আস্থার জোরে এই দেশ নিজেকে পুনর্গঠন করেছে।
কিন্তু রাষ্ট্র? রাষ্ট্র তো শুরু থেকেই ব্যর্থতার প্রতীক। স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে গেলেও ন্যায়বিচার নেই, নিরাপত্তা নেই, নাগরিক অধিকার নেই। সড়ক থেকে শুরু করে আদালত সব জায়গায় দুর্নীতি আর দমননীতির অচল যন্ত্র। রাষ্ট্র জনগণের পাশে দাঁড়ায়নি কখনো, বরং বারবার তাদের রক্ত আর ঘামের ওপর ভর করে লুটপাটকে বৈধ করেছে।
তবু দেশ টিকে আছে শুধু জনগণের কারণে। দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন ন্যায্যতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ, তখন মানুষ নিজের দায়বদ্ধতা ও পারস্পরিক সহায়তার ওপর নির্ভর করেছে। শ্রমিক, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রিকশাচালক, নারী মজুর—যাদের জন্য রাষ্ট্র কোনো সুরক্ষা দেয়নি, তারাই প্রতিদিনের শ্রম আর পারস্পরিক আস্থার ভরসায় সমাজকে চালিয়ে নিয়েছে। তাদের ঘামে, প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানোর শক্তিতে দেশ টিকে আছে। রাষ্ট্র ভেঙে পড়লেও মানুষ নিজেরাই তৈরি করেছে এক নীরব শৃঙ্খলা, এক সামাজিক আধিপত্য, যেখানে সহাবস্থান হয়ে উঠেছে টিকে থাকার প্রধান ভরসা।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ওই ব্যর্থ রাষ্ট্রকে নতুন করে গড়ার এক অমিত সম্ভাবনা নিয়ে এসেছিল। জনতার প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। তারা রক্ত দিয়েছে, প্রাণ দিয়েছে, পরিবর্তনের জন্য সবকিছু বাজি রেখেছিল। মানুষ ভেবেছিল এবার সত্যিই একটা নতুন রাষ্ট্র হবে তাদের জন্য। কিন্তু খুব দ্রুতই দেখা গেল, রাজনৈতিক পক্ষগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য উগ্রবাদী গোষ্ঠী নিয়ে মাঠে নেমেছে সেই স্বপ্ন ভাঙতে। তারা নারীর ওপর আক্রমণ করেছে, মাজার ভেঙেছে, ধর্মীয় আর জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর হামলা চালিয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং দলের ওপর আক্রমণ করেছে, আইন নিজের হাতে হাতে তুলে নিয়েছে, আবার কখনও ‘তৌহিদী জনতা’র নামে মব নামিয়েছে। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এক হিসেবি প্রচেষ্টা যার উদ্দেশ্য জুলাইয়ের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করা, জনগণের রক্ত দিয়ে গড়ে তোলা স্বপ্নকে গুঁড়িয়ে দেওয়া। এবার তারা দেশ হওয়ার মৌলিক শর্ত পারস্পরিক আস্থা, সহাবস্থান, বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা—এসবকেই ভাঙতে চাইছে।
আজ আমরা এক ভয়াবহ পরিণতি প্রত্যক্ষ করছি। সমাজে আস্থার সংকট বেড়েছে, সন্দেহ ঢুকে গেছে প্রতিটি সম্পর্কে। রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত হয়ে পড়ছে, নারীর চলাফেরা ও মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে, অন্যান্য জাতিস্বত্তার মধ্যে ভীতি জন্ম নিচ্ছে। যারা উদ্ভাবন, বৈচিত্র্য আর সৃজনশীলতার বাহক, তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে কিনা ওই আশঙ্কায় রয়েছেন। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে সেই সাধারণ মানুষদের ওপর, যারা শ্রম আর সহযোগিতার ভরসায় এই দেশটাকে চালিয়ে নিয়েছিল। তাদের টিকে থাকার কাঠামো ভেঙে গেলে দেশও টিকবে না। রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে মানুষ মিলে দেশকে বাঁচায়, কিন্তু সমাজের আস্থা ভেঙে গেলে আর কোনো ভরসাই থাকে না।
এই সময়েই ছাত্র সংসদ নির্বাচন এক ভিন্ন অর্থ নিয়ে হাজির হয়েছে। রাষ্ট্র ব্যর্থ, রাজনৈতিক দলগুলো দিশেহারা, উগ্রবাদ মাথা তুলছে—ঠিক এই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে নতুন এক শক্তি উঠে এসেছে। প্রতিরোধ পর্ষদ (ফোর্স অব রেজিস্টেন্স), যেটি ইমি, মেঘ ও জুবেলের নেতৃত্বে ডাকসু নির্বাচন করছে। এরা কেবল একটি ছাত্ররাজনৈতিক প্যানেল নয়, বরং প্রতিরোধের আরেক নাম। তাদের তালিকায় আছে সবচেয়ে বেশি নারী, মোট প্রার্থীর ৪১ শতাংশ, যা অন্য কোনো প্যানেলে নেই। আবার ২৭ জনের মধ্যে তিনজন আদিবাসী, প্রায় ১১ শতাংশ। এই প্রতিনিধিত্ব প্রমাণ করে তারা সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তির রাজনীতিতে বিশ্বাসী, যেখানে নারী, সংখ্যালঘু, আদিবাসী সবাই সমানভাবে জায়গা পায়।
একই সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘোষণা হয়েছে সম্প্রীতির ঐক্য নামের আরেকটি পূর্ণাঙ্গ প্যানেল। ২৫ সদস্যের এই প্যানেলে নারী ৪৪ শতাংশ, পুরুষ ৫৬ শতাংশ। সমতল ও পাহাড় মিলিয়ে আদিবাসী শিক্ষার্থী ৭ জন, যা ২৮ শতাংশ। ধর্মীয় বৈচিত্র্যের দিক থেকেও এটি অনন্য: মুসলিম ৫৬ শতাংশ, হিন্দু ২৪ শতাংশ, বৌদ্ধ ১২ শতাংশ, খ্রিস্টান ৮ শতাংশ। সংখ্যার হিসেবে এই প্যানেল একেবারেই সর্বাধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক, যা বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সামাজিক চরিত্রকে প্রতিফলিত করে।
ডাকসু নির্বাচনে নারী ও সংখ্যালঘুর প্রতিনিধিত্ব দিয়ে এক সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে প্রতিরোধ পর্ষদ। জাকসুর সম্প্রীতির ঐক্য সেটিকে আরও বিস্তৃত করেছে ধর্মীয় ও জাতিগত বৈচিত্র্যের মাধ্যমে। এই দুই শক্তির উত্থান প্রমাণ করে, দেশের তরুণ প্রজন্ম বিকল্প রাজনীতির পথ খুঁজছে, যেখানে লিঙ্গ, ধর্ম বা জাতিগত পরিচয় কোনো বাধা নয়, বরং শক্তি। এই দুটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনে কিছু ক্ষেত্রে নারী ও জাতিগত সংখ্যালঘু প্রার্থীর সংখ্যা বাড়লেও আর কোনো রাজনৈতিক বা স্বতন্ত্র প্যানেল এতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারেনি।
ডাকসু নির্বাচনের বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীদের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সবাই কোনো না কোনোভাবে নিজেদের প্যানেলকে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ দেখাতে চেয়েছে। সে জন্য প্রায় সবাই নিজেদের প্যানেলে আদিবাসী শিক্ষার্থী এবং নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। ছাত্রদলের প্যানেলে একজন করে আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থী রয়েছেন। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীও আছেন প্যানেলে। পাশাপাশি দুজন ছাত্রীকেও প্রার্থী করেছে তারা। আবার ইসলামী ছাত্রশিবির তাদের প্যানেলে একজন আদিবাসীকে সদস্য পদে প্রার্থী করেছে। রয়েছেন একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী প্রার্থীও। এ ছাড়া চারজন ছাত্রী তাদের প্যানেলে জায়গা পেয়েছেন। তবে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে যিনি প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সেই ফাতেমা তাসনিম জুমা ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধে চাকমাদের অংশগ্রহণ ইস্যুতে বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে পুরো প্যানেলকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে দিয়েছেন। এর বাইরে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের প্যানেলে প্রার্থী হয়েছেন পাঁচ ছাত্রী। নেই কোনো আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। জাকসুতেও মোটামুটি একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
সামগ্রিক দিক বিবেচনায় ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে প্রতিরোধ পর্ষদ ও সম্প্রীতির ঐক্য—এই দুটি প্যানেলই সর্বোচ্চ অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পেরেছে। এই দুই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্যানেলই আসলে দেশের প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্রের ব্যর্থতা আর জুলাইয়ের স্বপ্ন ধ্বংস করে দেওয়া উগ্রবাদের হুমকির মাঝেও তারা দেখাচ্ছে, মানুষ বিকল্প শক্তি গড়ে তুলতে পারে। তাদের বিজয় শুধু একটি নির্বাচনি ফল নয়, বরং স্পষ্ট বার্তা উগ্রবাদের বিরুদ্ধে, মব-শাসনের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ থেকে শুরু করে গোটা দেশেই তারা নতুন আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু দেশ টিকে থেকেছে মানুষের শক্তিতে। জুলাই অভ্যুত্থান ওই রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজানোর সম্ভাবনা দেখিয়েছিল, কিন্তু তা ধ্বংস করেছে উগ্রবাদ। এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা বড় রাজনৈতিক দলগুলো থেকে কোনো সমাধান আশা করা যাচ্ছে না। তাই ডাকসু ও জাকসুর এই নির্বাচন আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে রাষ্ট্র ব্যর্থ হলেও দেশকে বাঁচানো সম্ভব। আর ওই লড়াইয়ে প্রতিরোধ পর্ষদ ও সম্প্রীতির ঐক্য হয়ে উঠতে পারে এক নতুন প্রতিরোধের অঙ্গীকার।