Published : 14 Aug 2025, 11:52 AM
চালের দাম বাড়ানো এখন যেন কিছু কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সহজ আয়ের কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার ফলে আমাদের নিত্যদিনের খাদ্য ভাতের দাম বাড়ছে।
কেজি প্রতি চালে মাত্র ১ টাকা দাম বাড়ালেই প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকা অতিরিক্ত লাভ তুলতে পারে এই কর্পোরেটরা—এমনই হিসেব দিয়েছেন ভোক্তা অধিকার বিষয়ক সংগঠন ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। যদিও এই হিসেব অনুমাননির্ভর, তবু বাজারের বাস্তবতা এটিকে অস্বীকার করে না।
আমরা এমন এক বাজারে বাস করছি, যেখানে সরকারের মজুদ পর্যাপ্ত, উৎপাদন ও আমদানি স্বাভাবিক, আর আন্তর্জাতিক বাজারে গত আট বছরের মধ্যে চালের দাম সবচেয়ে কম। তবুও দেশে চালের দাম বাড়ছে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই। এর মানে স্পষ্ট—কিছু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যে হাত দিচ্ছে। আর এই প্রক্রিয়ায় লাভের পাহাড় গড়ছে কর্পোরেট ও বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী।
এ প্রশ্নটাই বড়—যখন খাদ্য নিরাপত্তা ও ভোক্তা সুরক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তখন এমন বাজার কারসাজি ঠেকাতে আমরা আসলে কতটা সক্ষম বা কতটা ইচ্ছুক?
টিসিবির হিসেবই প্রমাণ করছে, বাজারে চালের দাম কেমন করে ক্রমাগত বেড়েছে। গত বছরের অগাস্টের শুরুতে চিকন চালের দাম ছিল কেজিতে ৭৮ টাকা; এক বছরে তা বেড়ে হয়েছে ৮৫ টাকা। মাঝারি মানের চাল, যা সবচেয়ে বেশি মানুষের খাদ্য, তার দাম ৫৮ টাকা থেকে লাফিয়ে উঠে ৭৫ টাকা। আর গড় দাম ৫৪ টাকা থেকে ৬০ টাকায় পৌঁছেছে।
এই অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধি শুধু ভোক্তার পকেট ফাঁকা করেনি, বরং মূল্যস্ফীতির চাকা আবারও ঘুরিয়ে দিয়েছে উল্টো দিকে। জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৫৫ শতাংশে—যা জুনের তুলনায় বেশি। খাদ্যমূল্যস্ফীতিও বেড়ে হয়েছে ৭.৫৬ শতাংশ, যেখানে আগের মাসে ছিল ৭.৩৯ শতাংশ। অথচ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় আমাদের মূল্যস্ফীতি এখনও অনেক বেশি।
বাংলাদেশের খাদ্যতালিকায় ভাতের আধিপত্য এতটাই বেশি যে, চালের দাম বাড়লেই সরাসরি তা মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেয়। এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও। ১২ অগাস্ট নতুন কৃষি ঋণ নীতিমালা ঘোষণার সময় তিনি স্বীকার করেছেন—আমাদের আমদানি নীতিমালাও খাদ্যমূল্যস্ফীতি বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কথাতেই ধরা পড়ে, নীতিমালার দুর্বলতার কারণে যখন বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানির দরকার হয়, তখনই তা সম্ভব হয় না। অথচ গেল অর্থবছরে (২০২৪–২৫) সরকার রেকর্ড পরিমাণ চাল আমদানি করেছে—গত সাত বছরের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। এ সময়ে আমদানি হয়েছে ১৪.৩৬ লাখ টন চাল, যেখানে আগের অর্থবছরে (২০২৩–২৪) এক কণাও আমদানি করতে হয়নি।
বৈশ্বিক বাজারের ছবিও আমাদের জন্য সুবিধাজনক ছিল। বাংলাদেশের প্রধান আমদানির উৎস থাইল্যান্ডে ভাঙা সাদা চাল—যাকে আমরা আতপ চাল বলি—এর দাম টনপ্রতি নেমে এসেছে ৩৭৫ ডলারে, যা ২০১৭ সালের পর সর্বনিম্ন। থাইল্যান্ডের এই দামই আন্তর্জাতিক বাজারে চালের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমাদের নীতিগত দুর্বলতা ও বাজার কারসাজি মিলিয়ে সাধারণ মানুষকে উচ্চমূল্যই গুনতে হচ্ছে।
বিগত সরকারের সময় বহু আগে থেকেই দাবি করা হচ্ছিল, বাংলাদেশ নাকি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু আমদানির বাস্তব চিত্র সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আসল সমস্যাটা এখানেই—দেশে ঠিক কত চাল উৎপাদিত হয়, তার নির্ভুল তথ্য আমাদের কাছে নেই। এই তথ্য পরিসংখ্যান ব্যুরোর কাছেই থাকার কথা, কিন্তু নানা কারণে তা বিশ্বাসযোগ্যভাবে পাওয়া যায় না।
আগের সরকার যেমন অর্থনীতিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর জন্য পরিসংখ্যানে হেরফের করত, কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও তেমনটাই হয়েছে। এখন সময় এসেছে এই ভাঁওতা বন্ধ করে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করার। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সরকারকে সেই পথেই হাঁটতে হবে—নইলে চালের বাজারে মানুষের ভোগান্তি শেষ হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
গত পাঁচ অর্থবছরের তথ্য বলছে, দেশে ধানের উৎপাদন ক্রমাগত বেড়েছে। ২০২০–২১ অর্থবছরে যেখানে উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৭৬ লাখ টন, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ১৯ লাখ টনে। উৎপাদন বাড়লেও সরকার সতর্কতার জন্য—যে কোনো দুর্যোগের ঝুঁকি মাথায় রেখে—প্রতি বছর কিছু চাল আমদানি করে। বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্যও আমদানির এই পথ খোলা রাখা হয়। এ বছর অগাস্ট পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১৯.৬৯ লাখ টন চাল, যা আগের বছরের তুলনায় ১০ লাখ টনেরও বেশি।
তাহলে প্রশ্ন হলো—এত উৎপাদন ও আমদানির পরও বাজারে চালের দামে অস্থিরতা কেন রয়ে গেল? এর একটা উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের বাজার কাঠামোতে। আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কমলেও বাংলাদেশের বাজারে তার প্রভাব প্রায় নেই বললেই চলে। কারণ আমাদের মোট চাহিদার তুলনায় আমদানির পরিমাণ সামান্য। আর এই সামান্য আমদানিও মূলত বাজারে বার্তা দেওয়ার জন্য—বাস্তব সরবরাহের ঘাটতি পূরণের জন্য নয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম পড়লেও আমাদের অভ্যন্তরীণ দামে তেমন পরিবর্তন আসে না।
আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন। যেমন ভোজ্যতেল—যার প্রায় শতভাগ আমদানি করতে হয়। তাই বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেই দেশীয় বাজারে তার দ্রুত প্রভাব পড়ে। কিন্তু চালের ক্ষেত্রে এ রকম হয় না, যদি না একবারে বড় আকারে আমদানি করা হয়। বাস্তবতা হলো, বিশ্ববাজারে কোনো পণ্যের দাম কমতির দিকে থাকলেও বাংলাদেশের বাজারে সেই পণ্যের দাম খুব একটা কমে না। আর এই প্রবণতাই ভোক্তাদের জন্য সবচেয়ে হতাশাজনক।
এর কারণ মোটামুটি সবারই জানা। বাজার তদারকিতে সরকারের দুর্বলতা আর সেই দুর্বলতার পেছনে সিন্ডিকেটগুলোর রাজনৈতিক ছত্রছায়া। এখন যেহেতু অরাজনৈতিক সরকার দায়িত্বে আছে, সুযোগ ছিল চালের দাম বাড়ার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন পর্যন্ত এই ধরনের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
ক্যাবসহ ছোট মিল মালিক ও বিভিন্ন পক্ষ যে কারণটি তুলে ধরছেন, তা ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। গ্রামে গেলে দেখা যায়, বিস্তর কৃষি জমি বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে চলে গেছে—কৃষকদের কাছ থেকে লিজ বা ভাড়া নিয়ে তারা জমি আবাদ করছে। বিপরীতে কৃষকরা আগাম অর্থ পাচ্ছেন। নগদ টাকা হাতে পেয়ে কৃষকও খুশি; কোন ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে না তাকে। নিজে চাষ করলে ফসল প্রাকৃতিক দুর্যোগে নষ্ট হওয়ার বা উৎপাদিত ফসলের মূল্য পাওয়া যাবে কি না—এই সব অনিশ্চয়তা থাকে। এই বাস্তবতায়, বড় কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিচ্ছেন না কৃষকরা। এবং এই সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার কৃষক কখনো ধানের দামে সিন্ডিকেট করতে পারবে না। কারণ তাদের সংখ্যাধিক্য এবং আন্তঃসংযোগের অভাব। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি স্বল্পসংখ্যক বড় প্রতিষ্ঠান ধান ও চালের বাজারে আরও বড় আকারে প্রবেশ করে, তাহলে কৃষককেই তার জমিতে উৎপাদিত চাল এমন দামে কিনতে হবে, যা কোম্পানিগুলো থেকে পাওয়া অর্থের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যাবে। এই কারণেই সরকারকে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে। সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই সমাধানের পথ বের করা জরুরি।
এই পদ্ধতিতে ধানের উৎপাদন হয়তো বাড়ছে—কারণ বড় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা প্রচলিত চাষ পদ্ধতির চেয়ে বেশি। কিন্তু যেভাবে জমিগুলো তাদের কব্জায় যাচ্ছে, তাতে সিন্ডিকেট করে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্তও তাদের হাতে চলে যাবে। গুদামে চাল রেখে তারা যেমন দাম নিয়ন্ত্রণ করছে, তেমনি ভবিষ্যতে উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে চলে গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।
এই শঙ্কা বিবেচনা করে এ বিষয়ে বিস্তারিত নীতিমালা করা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানগুলো কত জমি চাষ করতে পারবে, কত সময়ের জন্য ও কোন দামে লিজ নিতে পারবে, কৃষকদের সঙ্গে চুক্তি কেমন হবে—এসব বিষয় স্পষ্টভাবে বেঁধে দেওয়া যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে বাজারে মনগড়া সংকট ও সিন্ডিকেট প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
পাশাপাশি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য শাস্তি কার্যকর করতে হবে। অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং জরিমানাও প্রযোজ্য।
কিন্তু সমস্যাটি আইনে লুকিয়ে আছে। শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি লাভ ছাড়াই অন্য উদ্দেশ্যে মজুদ করেছিলেন, তবে তিনি মাত্র তিন মাসের কারাদণ্ড এবং জরিমানার মুখোমুখি হবেন। অর্থাৎ, আইনই মজুদদারদের সুযোগ করে দিচ্ছে। এখানে আইনের যুগোপযোগিতা নিয়ে পুনর্বিবেচনা করা দরকার।
চালের দাম বাড়লে খোলা বাজার বা টিসিবির মাধ্যমে স্বল্প মূল্যে চাল, ডাল, তেল, চিনি—এবং কখনো কখনো ছোলা, পেঁয়াজ, খেজুর বিক্রি হয়। কিন্তু এসব পণ্যের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয় সাধারণ মানুষকে, যা এক ধরনের অযথা ভোগান্তি সৃষ্টি করে। পণ্যের মান নিয়েও প্রশ্ন থেকেই যায়।
এছাড়া একই ব্যক্তি বারবার এসব পণ্য সংগ্রহ করছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, সয়াবিন তেল ছাড়া অন্যান্য পণ্যের দাম বাজারে বেশি পার্থক্য না থাকায় নিম্ন-মধ্যবিত্তের মানুষের আগ্রহ কম। তবুও মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের ওপরও চাপ কম পড়ে না; দরিদ্রদের মতোই তাদের জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।