Published : 03 Sep 2025, 09:04 PM
যেসব এলাকায় আগে কখনো বন্যা দেখা যায়নি, সেখানেও এখন বন্যা হচ্ছে। আবার যেসব এলাকা দীর্ঘকাল ঝড়-ঝঞ্জার প্রকোপমুক্ত ছিল, সেসব এলাকাও নতুন করে জলোচ্ছ্বাসের শিকার হচ্ছে।
আমরা জানি, ২০২৪ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভয়ানক বন্যায় ২১ লাখের মতো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সিলেট এবং সুনামগঞ্জে এই দুর্যোগে ৭৭,২০০ শিশু গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এছাড়া, ২০২৪ সালের অগাস্টে পূর্বাঞ্চলে আরও ভয়াবহ বন্যা ঘটে, যাতে প্রায় ৫৮ লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জীবন-জীবিকা ও অবকাঠামো ধ্বংসের মুখে পড়ে। এ তথ্য ইউনিসেফের।
প্রকৃতির স্বাভাবিক ডাক—যেমন পরিচিত পাখির গান, সন্ধ্যায় শেয়ালের ডাক, সাপ-ব্যাঙের আওয়াজ বা রাতে পেঁচার চিৎকার যেন সব অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। মাছের স্বাদ বদলে গেছে, খাদ্যের পুষ্টিগুণ হ্রাস পাচ্ছে। অনেক খাবার এখন প্রাণী এবং মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
আগের সরল, সাধারণ ও টেকসই জীবনধারায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। আমরা এখন গ্রহণ করছি সস্তা, সাময়িক আরামদায়ক কিন্তু পরিবেশবিধ্বংসী জীবনযাপন। গ্রাম, উপশহর এবং শহর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক, বায়ু, জল ও মাটির দূষণ। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় বছরে প্রায় ৪,৫০০ টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, ঢাকার এই কঠিন বর্জ্যের বেশিরভাগই বুড়িগঙ্গাসহ নদীগুলোতে ফেলা হয়। আরও ভয়ঙ্কর হলো পরিবেশের প্রতি মানুষের আচরণজনিত দূষণ, যা এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আমাদের দেশীয় শিল্প, ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান, বিভিন্ন গাছপালা, সংস্কৃতি এবং শেকড় ক্রমশ লুপ্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঋতুর পরিচিত ছন্দও বিপর্যস্ত।
আগে দুই মাস অন্তর ঋতু সহজেই চেনা যেত, কিন্তু এখন তার সৌন্দর্য অনুভব করাই কঠিন। নতুন রোগের উদ্ভব হচ্ছে, পুরোনো রোগগুলো নতুন রূপে ফিরে আসছে। জলাবদ্ধতা বাড়ছে, নদীগুলো তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ হারাচ্ছে। আলো দূষণের মতো নতুন দূষণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। রোদের তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা সবাইকে উদ্বিগ্ন করছে। এছাড়া ভূমিকম্পের আশঙ্কাও বাড়ছে। সারা দেশে অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের মনে এখন লুকানো ভয়: ‘কখন, কী ঘটে?’
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে অতিরিক্ত আড়াই লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে, কেবল অপুষ্টি, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া ও হিট স্ট্রোকে।
প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমেছে, কিন্তু এসব ঘটনার ঘনঘটা মানুষের মানসিক এবং সামাজিক নিরাপত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। এই অনিরাপত্তার অর্থনৈতিক মূল্য আমরা গণনা করি না এবং এ নিয়ে গবেষণাও সীমিত।
আমরা এখন সর্বত্র ‘স্থায়িত্বশীলতা’ খুঁজছি। কিন্তু এই ধারণাটিকে আমরা কি গভীরভাবে চিন্তা করছি? বর্তমান স্থায়িত্বশীলতা আগের মতো নয়। যদি আমরা সামগ্রিক বিচার না করে পরিকল্পনা করি, তবে তা কখনোই টেকসই হতে পারে না। পরিবার, প্রতিষ্ঠান, অঞ্চল, দেশ—সবাইকে এখন অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে জ্ঞানলাভ করতে হবে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহের সমন্বয়ে, নির্ভরযোগ্য তথ্য ও গবেষণার আলোকে পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। প্রতিটি মানুষকে জানতে হবে, স্থায়িত্বশীলতা কেবল একটি ধারণা নয়, এটি একটি জীবনব্যবস্থা।
আমাদের অর্থনীতিকেও রূপান্তর করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, তামাকভিত্তিক অর্থনীতি থেকে সরে এসে পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে তামাকজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ৩০,৫৬০ কোটি টাকা, যা জাতীয় আয়ের ১.৪ শতাংশ; অথচ সরকার এই খাত থেকে আয় করে ২২,৮১০ কোটি টাকা—অর্থাৎ ক্ষতি আয়ের চেয়ে অনেক বেশি (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, দ্য টোবাকো অ্যাটলাস, ২০২৩)।
রাসায়নিকের যথোপযুক্ত প্রয়োগ, প্লাস্টিক দূষণ হ্রাস বিশেষ করে একবার ব্যবহার্য পণ্য, পলিথিন এবং প্লাস্টিক বন্ধ করা, হাইব্রিড খাদ্যের নির্ভরতা কমানো—এসব অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুনর্বিবেচনা করতে হবে। বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্লাস্টিক ব্যবহার তিনগুণ বেড়েছে। ঢাকায় বাসিন্দারা বছরে গড়ে ২২.২৫ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহার করে, যা অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে আড়াইগুণ বেশি। ঢাকায় প্রতিদিন ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মাত্র ৩৭ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয় (বিশ্ব ব্যাংক, প্লাস্টিক সার্কুলারিটি ইন বাংলাদেশ, ২০২১)।
এসবের পরিবর্তে স্থানীয় ফসল এবং পণ্যের টেকসই চাষ এবং চাহিদা বাড়ানোর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশের স্থানীয় খাদ্য এবং কৃষি সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং বিপণন গড়ে তোলা হলে পুষ্টি নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে (এফএও বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপোর্ট, ২০২২)।
আমাদের খাদ্য, পোশাক এবং বিনোদন—সবকিছুতে নিজস্বতা ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ অসুস্থ ব্যবসায়িক সংস্কৃতি, বিদেশি প্রভাব এবং অতিরিক্ত ভোগের কারণে এসব হারিয়ে যাচ্ছে। তাই ঐতিহ্য রক্ষায় এখনই সচেতন হওয়া দরকার।
অনেকে বলেন, ‘বাংলাদেশ সম্ভাবনার দেশ’। কেউ বলেন, ‘সমস্যার দেশ’। আমি বলি, ‘সম্ভবের দেশ’। শত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও যদি আমরা আন্তরিক হই তাহলে সমাধান সম্ভব। কারণ জলবায়ু এবং পরিবেশ নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা এবং উদ্ভাবন অনেক দেশের চেয়ে বেশি। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ভাসমান বাগান পদ্ধতি চালু আছে, যা জলবায়ু-প্রতিরোধী এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)- কর্তৃক বৈশ্বিক কৃষি হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃত। এটি বন্যায় ডুবে যাওয়া জমিতে কার্যকর এবং স্থানীয়দের পুষ্টি ও আয় নিশ্চিত করে।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমরা পরিবেশের প্রতি অন্যায় করেছি। এখন সময় এসেছে সেগুলো সংশোধনের। অন্যকে দোষ না দিয়ে নিজেকে প্রথমে পরীক্ষা করতে হবে। তরুণদের আচরণ, শিক্ষা এবং সংস্কৃতিতে পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি আনতে হবে। শুধু গবেষণা নয়, তার ফলাফল বাস্তবে প্রয়োগও জরুরি।
পরিবর্তন চাইলে নিজেকে বদলাতে হবে। পরিবেশের প্রতি অবিচার না করার জন্য নিজেরাই সতর্ক থাকতে হবে। একজন ব্যক্তি, একটি পরিবার বা প্রতিষ্ঠান সবাই পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তুলুক। যে পরিবর্তন ইতিমধ্যে নেতিবাচকভাবে ঘটেছে, তার জন্য হাহুতাশ না করে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করাই এখন দরকার।
বাংলাদেশ একদিন জলবায়ু এবং পরিবেশগত সমস্যা থেকে উঠে বিশ্বকে উদাহরণ দেখাবে—কীভাবে নিজস্ব সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং আচরণ দিয়ে টেকসই ভবিষ্যৎ গড়া যায়।
স্থানীয় অভিযোজন চর্চা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, ভাসমান বাগান, সৌরশক্তি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ—এসব প্রতিকূলতায় টিকে থাকতে সাহায্য করে। ব্যক্তিগত জীবনে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক পরিহার, স্থানীয় খাদ্য ব্যবহার, সবুজ পরিবহন—এসবও জলবায়ু অভিযোজনের অংশ।
এই ধরনের অভিযোজনমূলক ও প্রশমনমূলক চর্চাকে জাতীয় নীতির সঙ্গে যুক্ত করলে যেমন ‘জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি)’, ‘জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসিএস)’ এবং ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসএপি)’—তাহলে নীতিনির্ধারণে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। এতে জনগণের অংশগ্রহণের পাশাপাশি সরকারি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও সংগঠিত হবে।
জলবায়ু তহবিলের জন্য দেন-দরবার করার প্রয়োজনীয়তা আছে নিঃসন্দেহে, তবে একইসঙ্গে নিজেদের কাজ দিয়েও অসংখ্য প্রমাণ ও উদাহরণ তৈরি করতে হবে, কারণ আমরা চাইলে তা বাস্তবায়ন করেই দেখাতে পারি।
আমাদের জীবনযাপন ও অর্থনীতির চাকা যেন এমন উপাদানে চলে যা প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সেতুবন্ধন রক্ষা করে। তাহলেই গড়ে উঠবে, ‘একটি টেকসই, সহনশীল বাংলাদেশের পরিবেশ-সংস্কৃতি এবং সমৃদ্ধ অর্থনীতি’। তাহলে গড়ে উঠবে একটি টেকসই, সহনশীল বাংলাদেশ—যা বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় হবে।
এই পথচলায় প্রয়োজন জনগণের অংশগ্রহণের পাশাপাশি জাতীয় নীতিমালার সঙ্গে সংহত একটি কৌশল। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এই কৌশলগত নথিগুলোর বাস্তবায়ন তখনই কার্যকর হবে, যখন স্থানীয় ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের উদ্যোগগুলো এর সঙ্গে যুক্ত হবে—একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।