Published : 09 Mar 2026, 08:21 AM
আমার নিজ জেলা যশোরে বেশ কিছুদিন ধরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত খবর দেখে জেনেছি, একজন কলেজ অধ্যাপক যিনি একাধারে সাংবাদিকও, এই বিষয়ে প্রচুর পরিশ্রম করছেন। রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী যশোরের খ্যাতনামা ব্যক্তিরা (বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার) এ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করছেন। এলাকায় এসব ব্যক্তি এলে ২-৫ জন সহযোগী নিয়ে অধ্যাপক সাহেব তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং ছবিসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করেন।
ছবি বা খবর দেখে মনে হয়, মতবিনিময়কারীরা সবাই এই উদ্যোগের সঙ্গে একমত। সত্যি বলতে কী, এটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ, এলাকাবাসী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে এলাকায় একটা বিশ্ববিদ্যালয় হলে তা সার্বিকভাবে উন্নয়নের জোয়ার আনবে। তাছাড়া এই জনবহুল ছোট দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং খাদ্য রপ্তানি বাড়ানোর জন্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বিরাট ভূমিকা রাখবে, এমন প্রত্যাশা তো স্বাভাবিক। সাধারণ মানুষ এই প্রত্যাশা ও স্বপ্ন নিয়েই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার সঙ্গে মেলে না, এটা যেন আমাদের সমাজের বিজ্ঞজনেরা ভুলতেই বসেছেন। যে জেলায় ইতিমধ্যে একটা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সেখানে আলাদা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় না করে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা কৃষি ফ্যাকাল্টি খুললেই যে উদ্দেশ্য পূরণ হয়, তা আমাদের শিক্ষিত সমাজ জানেন না, এটা বিশ্বাস করা কষ্টকর। তবে পরিকল্পনাহীন শিক্ষাব্যবস্থার এই দেশে সরকার যেখানে শিক্ষিতদের তোষামোদ করে একের পর এক বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে চলেছে, সেক্ষেত্রে যশোরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবির যৌক্তিকতা আছে বৈকি!
দিনক্ষণ ঠিক মনে নেই। দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক যশোরে এসেছিলেন এলাকার সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে সুশীল সমাজের সঙ্গে মতবিনিময় করতে। ওই সভায় এত সুন্দর সুন্দর সব প্রস্তাবনা এসেছিল যে আজও মনে আছে। নৌবন্দর স্থাপন, কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, স্থলবন্দরের উন্নয়ন, শিল্পকারখানা রক্ষা, নদীগুলোকে বহমান রাখা, কৃষিতে পৃষ্ঠপোষকতা, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, সড়ক যোগাযোগ, রেল সেবা জনকল্যাণমুখী করা, জলাবদ্ধতা নিরসন, বনায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরিসহ আরও অনেক উন্নয়নের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রস্তাব এসেছিল। ওই সভাতেও শুনেছিলাম যশোরে একাধারে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চাই। কিন্তু বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়ে একেকটা ফ্যাকাল্টি খুললেই যে সমস্যার সমাধান হয়, তার জন্য এত খ্যাতনামা ব্যক্তিদের এত শ্রমঘণ্টা নষ্ট করার যুক্তি আমি এখনও খুঁজে পাই না।
বাংলাদেশে উন্নয়নের জন্য এলাকায় একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির উপস্থিতি খুবই জরুরি। দরকার এমন একজনের যিনি নিজের শক্তিতে একটা সাব-ডিভিশনকে ডিভিশন বানাতে পারেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে হাটহাজারীতে নিয়ে যেতে পারেন, চাঁদপুর পলিটেকনিককে জেলা শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে কচুয়ায় সরিয়ে নিতে পারেন, নদীভাঙনের হুমকিতে থাকা সিরাজগঞ্জে যমুনা সেতু নিয়ে যেতে পারেন, তিস্তা ব্যারেজ ডালিয়ায় নিতে পারেন, নিজের বাড়ির সামনে নামানোর জন্য ঢাকা-আরিচা সড়কের গতিপথ বদলাতে পারেন, একটা মনোটেকনিক ইনস্টিটিউটকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে পারেন।
এমন শক্তিমান, ক্ষমতার বলয়ে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি না থাকলে যে কোনো এলাকার উন্নয়ন প্রত্যাশা সোনার হরিণের পেছনে ছোটা ছাড়া আর কিছু নয়। দেশের উন্নয়ন বাজেটের তিন-চার ভাগের বেশি একটা বিভাগে যায় এসব শক্তিমানদের দৌলতেই, বিভাগে চারটা জেলা না ১০টা জেলা, সেটা বিবেচনায় নেওয়া হয় না। অতীতেও ছিল না, এখনও নেই। ক্ষমতার বলয়ে থাকা একজনের ইচ্ছাপূরণে দেশ, জাতি, জাতীয় পরিকল্পনা কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক ধারণাকে পেছনে ফেলে বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় করতে গেলে যশোরেরও বোধহয় এমন প্রভাবশালী শক্তিমানের প্রয়োজন।
যে দেশে প্রাথমিক শিক্ষা লক্ষ্য অর্জনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, সরকারি হিসাবে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থীও ঠিকমতো পড়তে পারে না, এক-দু জন শিক্ষক দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা চালানো হয়, সেখানে উচ্চশিক্ষা অলীক কল্পনা বলেই সাধারণের বিশ্বাস। অথচ শিক্ষিত সমাজ প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে যত কথা বলে, তার শতগুণ বলে উচ্চশিক্ষা নিয়ে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ শিশু বাংলা পড়তে পারে না (১৪ জুন ২০২৩, বাংলাদেশ জার্নাল)। এ নিয়ে কেউ কথা না বললেও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ২ শতাংশ বা ৪ শতাংশ পাস করেছে বলে লজ্জাজনক বলে তারাই ইথার করে ফেলেন। অথচ আমাদের মতো অর্ধশিক্ষিত, স্বশিক্ষিত মানুষের চোখে প্রাথমিক শিক্ষার এ করুণ অবস্থায় ভর্তি পরীক্ষার ফল এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক।
সাধারণের ধারণা দেশে শিক্ষিতদের একটা সিন্ডিকেট আছে, যারা শিক্ষার গোড়ায় পানি না দিয়ে আগায় পানি ঢালতে ব্যস্ত। বিশেষায়িত শিক্ষার নামে বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী। দুঃখ এই যে, এরা বিদেশে গিয়ে শ্রম বিক্রি করলেও টাকা দেশে পাঠায় না। নিজেদের পরিবারের জন্য সব ব্যবস্থা করে তারপর দেশের জন্য জ্ঞানের ভাণ্ডার খোলে। এরা ভালো করেই জানে, জনগণ শিক্ষিত হয়ে গেলে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে ডলার আহরণের শখ মিটে যাবে। তাই এরা মনে করে, স্বল্পশিক্ষিত-অশিক্ষিত রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ঘাড় ভেঙে নিজেদের ভাগ্য বদলানোর ব্যবস্থা আরও গতিশীল করাই উত্তম।
সাধারণ জনগণ জানে, দেশের প্রতিটি বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ই ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে প্রতিষ্ঠিত। এসব বিশ্ববিদ্যালয় নিজ নিজ পেশার উন্নয়নে কী ভূমিকা রেখেছে তা সাধারণের বোধগম্য নয়। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে একই বিষয়ের অন্য প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদনও দেয় না। তাই রাজবাড়ি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যত প্রকৌশলী এসেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ও গুণী প্রকৌশলী এসেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ঠিক তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক বেশি ও গুণী চিকিৎসক দিয়েছে। এসব জেনেও কেন এক শ্রেণির বিজ্ঞ মানুষ বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় চায় এবং সরকার একের পর এক প্রতিষ্ঠা করে চলে, তা বিবেচনার দাবি রাখে।
দেশের এক শ্রেণির মানুষের কাছে প্রকল্প মানেই প্রচণ্ড আগ্রহের জায়গা। কারণ একেকটা প্রকল্প শত মানুষের স্বপ্ন পূরণ করে, শত মানুষের ভাগ্য বদলায়, কিন্তু বাস্তবায়নের দায়িত্ব কাউকে নিতে হয় না। আজ পর্যন্ত কোনো প্রকল্পের নেতিবাচক পরিণতির জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হয়নি। শুধু জনকল্যাণের সুগারকোটেড কথা বললেই প্রকল্প অনুমোদন হয়ে যায়। বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্পগুলোও বোধহয় একই রকম। একটা খুললেই আরও একাধিক খোলার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় হলে ব্যক্তিগত অর্জনের পথ পরিষ্কার হয় না। তাই সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় বা বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকাল্টি খোলার ক্ষেত্রে আমাদের বিজ্ঞজনদের আগ্রহ খুবই কম।
সাধারণ মানুষ মনে করে, যে কোনো উদ্যোগ বা প্রকল্পে দায়িত্বপ্রাপ্তদের পুরস্কার ও তিরস্কারের ব্যবস্থা থাকা দরকার। মনগড়া গল্প বললে হবে না। পুরস্কারের পাশাপাশি ব্যর্থতার দায় নিয়ে শাস্তি ভোগের বিধানও থাকতে হবে। তাই যশোরের সাধারণ মানুষের ভাবনা, একটা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জাতিকে খাদ্য নিরাপত্তা দিতে পারে, খাদ্য রপ্তানিকারক দেশ বানাতে পারে—যদি সাফল্য-ব্যর্থতার দায়িত্ব নিয়ে কেউ এগিয়ে আসে। তাহলে যশোরে একটা কেন, আরও দশটা বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় হোক কিংবা কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় একটা করে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হোক, তাতে সাধারণ মানুষের আপত্তি থাকার কথা নয়। বোধহয় থাকবেও না।