Published : 23 Dec 2025, 11:45 AM
শরীফ ওসমান হাদির জানাজা কেবল একজন মানুষের শেষ বিদায় নয়; সেটা ছিল এক ধরনের নীরব গণভোট। যে ভোটে ব্যালট ছিল না, কিন্তু ছিল জনমনের উচ্চারণ। এই জানাজায় যে লোকসমাগম হয়েছে তা শুধু অবিশ্বাস্যই নয় অভূতপূর্ব বটে। এই জনসমাগমে তরুণদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। বহু দূর-দূরান্ত থেকে লোক এসেছিল এই জানাজায়। তরুণদের সঙ্গে মধ্যবয়স্ক মানুষদের সংখ্যাও ছিল চোখে পড়ার মত। এই উপস্থিতির বড় দিক এটা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত স্বেচ্ছাকৃত মানুষের জনসমাগম। মানুষ স্বেচ্ছায় নিজ উদ্যোগে আগ্রহভরে এখানে সমবেত হয়েছে।
এই জানাজায় জনমানুষের নিজস্ব উপস্থিতিকে তাতিয়ে রেখেছিল বেশ কিছু স্লোগান। বিশেষ করে, ‘গোলামি না আজাদি, আজাদি আজাদি’ স্লোগান যেমন ছিল তেমনি ছিল, ‘দিল্লী না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’ স্লোগান। ফলে বলা যায় কোনো রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি না থাকলেও এই জানাজায় উপস্থিত জনসমাগমের অন্তরে ছিল একটা রাজনৈতিক প্রণোদনা। যেটা হাদির মধ্যে তারা পেয়েছিলেন।
হাদির সোশাল মিডিয়ায় উপিস্থিতির বড় জায়গা ছিল তার ‘ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ডাক’। সম্ভবত সেটাই তার প্রতি জনমানুষের আকর্ষণের বড় দিক। খুব সহজ সরলভাবে, সাফ দিলে, অনাড়ম্বরভাবে ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রত্যয়ই সম্ভবত তার প্রতি জনআকর্ষণের একটা বড় কারণ। নানা ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক কথা, কাজ ও আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই স্বল্পায়ু জীবনকে জনআকর্ষণের দিকে আনতে পেরেছিলেন হাদি। যেখানে সাধারণ সচেতন জনসমাজ বিশেষত তরুণরা নিজেদের ভেতরের চাওয়াটাকে দেখতে পেয়েছিলেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে স্পিরিট, হাদি ছিলেন, সেই স্পিরিট ধারণ করা সবচাইতে সচল-সপ্রাণ সত্তার জীবন্ত প্রতিনিধি। যিনি প্রচলিত রাজনৈতিক ফর্মের বাইরে যেয়ে কথা বলতেন, ফর্ম ভাঙ্গা কার্যক্রম করতেন। জনমানুষ জুলাই গনঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে রাজনীতি ও জীবনকে দেখতে চেয়েছিল, আমাদের ছাত্র-জনতার রাজনৈতিক অংশ, রাজনৈতিক ক্ষমতাবান ব্যক্তিবর্গ তা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ক্ষমতার মধ্যে ঢুকে যাওয়া ছাত্রদের যে অংশকে একসময় মাথায় তুলে বৈষম্য পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল জনআকাঙ্ক্ষা, তা ব্যর্থ হবার পরও, হাদি সেখানে একটা ক্ষীণ আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছিলেন একেবারে নিজস্ব প্রচেষ্টায়, নিজের ঘরানায়।
জনআকাঙ্ক্ষা প্রতিষ্ঠার নামে দ্বিচারিতা ও অনৈতিকতাকে ভর করে প্রচলিত রাজনীতি অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতার যে চর্চা করে, যে ব্যক্তিক-গোষ্ঠিগত বৈষয়িক প্রতিষ্ঠা লাভে উম্মুখ থাকে, জুলাই গনঅভ্যুত্থানের অগ্রভাগের সেনানীরা তা করবে না এটাই ছিল সাধারণ জনপ্রত্যাশা। সেটা যখন ব্যর্থ হয়েছে তখন জনহৃদয়ে শরীফ ওসমান হাদি ও তার ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ কিছুটা ব্যতিক্রমী কার্যক্রম হাজির করেছে। এটা পতিত ফ্যাসিবাদি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্বকে বিরক্ত করলেও সাধারণ জনমানুষের একটা বড় অংশকে আগ্রহী করে তুলেছে। ঢাকা-১২ আসনে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাল্টের বিরুদ্ধে তার অতিসাধারণ, জনসম্পৃক্ত-ব্যতিক্রমী নির্বাচনি প্রচারণা মানুষের মনোযোগ কেড়েছে। হাদি তার কথা ও দিলসাফ বক্ত্যব্যের মধ্য দিয়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদ, তাদের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দোসরদের যেমন আঘাত করেছেন তেমনি ‘রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র হয়ে ওঠা’ অতি ক্ষমতাশীল গোষ্ঠীতন্ত্রের বিরুদ্ধেও কথা বলেছেন। তার এই রাজনৈতিক আচরণ ও বক্তব্য ছিল সহজ-সরল অনাড়ম্বর এবং অপ্রমিত, সেটা জনহৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। তরুণরাও তার নতুন রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি করা কথায় আকৃষ্ট হয়েছে। ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা–জাতীয় জীবনের সকল স্তরে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, বৈষম্যের বিলোপ, প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন, ফ্যাসিবাদীদের বিচার, রাজনৈতিক সংস্কার, আর্থিক দুর্নীতির বিলোপ ইত্যাদি জনপ্রত্যাশার আশাজাগানিয়া কথক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন শরীফ ওসমান হাদি।
হাদির সব রাজনৈতিক কথা, কাজ, ন্যারেটিভ যে খুবই যৌক্তিক ছিল তা হয়তো বলা যাবে না, কিন্তু তার সামগ্রিক কর্মকাণ্ড জনসমাজের প্রভাবশালী অংশের কাছে ক্রমশ আদরণীয় হয়ে উঠছিল, এই সত্যকেও অস্বীকার করার জো নেই।
হাদি জনসমাজের প্রত্যাশাকে বুঝতে পেরেছিলেন কিন্তু সেটা বুঝতে অপারগ হয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাজের বৃহত্তর অংশ। মানুষ যে স্বপ্নে চব্বিশে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, এখানকার রাজনৈতিক অংশ তাকে শুধুই নির্বাচন ও ক্ষমতার পালাবদলের বয়মে ভরে ফেলেছে। ভারতের হিন্দুত্বাদী সরকারের আধিপত্যবাদী ও অন্যায্য প্রভুসুলভ আচরণে বাংলাদেশের জনহৃদয়ে ‘ভারত প্রশ্নে’ যে জনক্রোধ, তাকে জনচোখে না দেখে ক্ষমতায় যাবার বার্গেনিং পয়েন্ট হিসেবে নেগোসিয়েশনের চেষ্টা করছে এখানকার বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলো। এটা বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে অমর্যাদাকর ও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করেছে। আমাদের বড় রাজনৈতিক দলগুলো এটা বুঝতে না চাইলেও ভারতীয় থিংকট্যাংক সেটা আমলে নিয়েছে।
বাংলাদেশের জনমানুষ বিশেষত তরুণ অংশের মধ্যে যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তন ঘটেছে যা এখানকার বড় ও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিবর্গ বুঝতে অপারগ তা বুঝেছে ভারতীয় রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিক অংশ। ভারতীয় লোকসভার সদস্য, কংগ্রেস নেতা, লেখক-চিন্তক-রাজনীতিবিদ শশী থারুরের নেতৃত্বে গঠিত ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটি সম্প্রতি দেওয়া এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে মত দিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে ভারত আজ তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত সংকটের মুখোমুখি।
গত দুই বছরে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের অস্থির পরিস্থিতি সম্পর্কে লোকসভা সদস্য শশী থারুরের সভাপতিত্বে গঠিত সংসদের পররাষ্ট্র বিষয়ক স্থায়ী কমিটির এই প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিসমূহ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে ভারতের জন্য ‘সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ’ সৃষ্টি করেছে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশে একটি ‘পরিবর্তন’ পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পুনর্বিচেনা বা কৌশলগত পুনঃসমন্বয় না হলে, নয়াদিল্লি ঢাকায় তাদের ‘কৌশলগত পরিসর’ হারিয়ে ফেলতে পারে।
প্রতিবেদনের মর্মকথা হচ্ছে, ভারতের জন্য ১৯৭১ সালের চ্যালেঞ্জ ছিল অস্তিত্বগত—একটি মানবিক সংকট এবং একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম। আজকের হুমকি তুলনামূলকভাবে সূক্ষ্ম হলেও সম্ভবত আরও গভীর ও গুরুতর—একটি প্রজন্মগত বিচ্ছিন্নতা, রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং ভারতের দিক থেকে সরে যাওয়ার সম্ভাব্য কৌশলগত পুনর্বিন্যাস। গত ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ‘দ্য হিন্দু’-তে , ‘India faces its ‘greatest strategic challenge’ in Bangladesh since 1971: Parliamentary committee on external affairs’ শিরোনামে কল্লোল ভট্টাচার্যের লেখায় এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
এই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘আওয়ামী লীগের আধিপত্যের পতন, যুবনেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদের উত্থান, ইসলামপন্থীদের পুনঃপ্রবেশ এবং চীনা ও পাকিস্তানি প্রভাবের ক্রমবর্ধমান তীব্রতা—এই সবকিছু মিলেই একটি সন্ধিক্ষণকে চিহ্নিত করেছে।’ এতে আরও যোগ করা হয়, ‘এই মুহূর্তে ভারত যদি নিজের কৌশল পুনর্নির্ধারণে ব্যর্থ হয়, তবে যুদ্ধের কারণে নয়, বরং অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে ঢাকা শহরে তার কৌশলগত পরিসর হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।’
উল্লেখ্য, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান অন্তরবর্তী সরকারের সম্পর্ক খুব স্বস্তির নয়। এর প্রধানতম কারণ বাংলাদেশে দণ্ডিত ফ্যাসিবাদী শাসক শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় প্রদান। দলবলসহ শেখ হাসিনা সেখানে শুধু আশ্রয়ই পায়নি, ভারতে বসে নির্বিঘ্নে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে বিষোদগার ও ষড়যন্ত্র করার সুযোগ পাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের যে অনুভূতি তার বিপরীতে আশ্রয় নিয়েছে ভারত। বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পর্কেও ভারতের দাদাসুলভ মনোভাব তারা লুকায়নি। পতিত আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনসহ বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য যে আচরণ তাদের সেটাও বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মনোভাবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাংলাদেশের জনগণের বদলে শুধুমাত্র পতিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার যে নীতি ভারত অক্ষুণ্ণ রেখেছে তা এদেশের জনগণ বিশেষত তরুণ সমাজকে বিক্ষুব্ধ করেছে। এটা ভারতের শশী থারুর তার বিশ্লেষণে ধরতে পেরেছেন। বাংলাদেশে ভারত বিরোধী যে জনমতের বাম্পার ফলন হয়েছে তা ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার ও দলের চরম সাম্প্রদায়িক, আধিপত্যবাদী, অরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন সেটা শশী থারুর প্রকাশ্যে না বললেও, এই আচরণের প্রতিক্রিয়া ও সুদূরপ্রসারী ফল সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
০২.
শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড, জানাজা, দাফন, বিচারের দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, প্রথম আলো-ডেইলি স্টার-ছায়ানটে হামলাসহ যেসব ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজকে নাড়া দিচ্ছে, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন সম্পর্কে উৎকন্ঠায় ফেলছে–তাতে একটা জিনিস সুস্পষ্ট এখানে সরকার যেমন ব্যর্থ হয়েছে, ক্ষমতায় যাবার আকাঙ্ক্ষী বড় রাজনৈতিক দলগুলোও তেমনভাবে ব্যর্থ হয়েছে। জনপ্রত্যাশা আর রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডে যে ফারাক তৈরি হয়েছে, সেটা যে জনআতঙ্ক তৈরি করছে, জনহতাশাকে উসকে দিচ্ছে সেটা আমলে নিচ্ছে না আমাদের রাজনৈতিক এস্টাবলিশমেন্ট। ফলে সামনে বাংলাদেশে কতগুলো অনিশ্চয়তা বিপুল বিক্রমে আগুয়ান হচ্ছে-
এক. ভারত প্রশ্নে অবস্থান পরিষ্কার না হলে, এ বিষয়ে ধোঁয়াশা জারি রাখলে, দলীয় সমর্থকদের বিরাগের মুখে পড়তে হতে পারে বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে।
দুই. সুশাসন প্রশ্নে আচরণে-কর্মকাণ্ডে-বডি ল্যাংগুয়েজে রাজনৈতিক দলগুলো যদি জনগণকে আশ্বস্ত করতে না পারে, তবে, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশার গুঁটি উল্টে যেতে পারে।
তিন. তরুণসমাজের সঙ্গে, চারকোটি নতুন ভোটারের সঙ্গে বড় রাজনৈতিক দলের প্রবীণ অংশের মতপার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। বড় রাজনৈতিক দলগুলো এটা অবজ্ঞা করছে। এটা বিপর্যয় আনতে পারে।
শরীফ ওসমান হাদির জানাজায় উপস্থিত জনসমষ্টির মধ্যে এসব আকুতির দেখা মিলেছে। সেই আকুতির রক্ষক হিসেবেই হাদিকে তারা তাদের মত করে হিরো বানিয়ে নিয়েছে। এই জনআকাঙ্ক্ষাকে, জনহৃদয়ের ভাবনার এই পরিবর্তনকে যদি আমাদের বড় রাজনৈতিক এস্টাবলিশমেন্ট হিসেবে না ধরে, তবে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া যেমন অসম্ভব, সুষ্ঠু রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটাও সুদূরপরাহত।
রাজনীতির এই দেওয়াল লিখন সঠিকভাবে পড়তে না পারলে…. মনে রাখতে হবে, ‘নগর পুড়লে দেবালয়ও রক্ষা পাবে না’।