Published : 29 Dec 2025, 10:27 PM
একটি মর্যাদাশীল ও বৈষম্যমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যেই সংঘটিত হয়েছিল রক্তঝরা জুলাই অভ্যুত্থান। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এই যে, শহীদের রক্ত শুকানোর আগেই যখন নেতৃত্বের নৈতিক স্খলন, রাজনৈতিক দলগুলোর সুবিধাবাদ এবং সংস্কারের নামে মতানৈক্যের নাট্যকর্ম শুরু হয়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে জন্ম নেয় এক গভীর ‘কালেক্টিভ ট্রমা’ বা সামষ্টিক মনস্তাপ। শরীফ ওসমান বিন হাদি এই ট্রমারই অবশ্যম্ভাবী এক সন্তান। হাদি ছিলেন প্রথাগত পচা-গলা রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিপরীতে বিষের প্রতিষেধক ‘এন্টি-ডট’। তার হত্যাকাণ্ড তাই কেবল একজন ব্যক্তি বা নেতার মৃত্যুর চাইতেও অনেক বেশি, হাজারো মানুষের টিকে থাকা স্বপ্নের ওপর এক সরাসরি আঘাত। আর এই চরম সংবেদনশীল সময়ে বিএনপি নেত্রী নিলোফার চৌধুরী মনির ‘গিনিপিগ’ শব্দটি আগুনের ওপর ঘি ঢালার মতো একটা কাজ।
শোক, সন্দেহ এবং সুরক্ষা কবচ
ওসমান হাদি জনসাধারণের কাছে একটি ‘আর্কিটাইপ’ বা আদর্শ পুরুষে পরিণত হয়েছিলেন। যখন মানুষ দেখে এমনকি বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতারা পর্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠতে শুরু করে, তখন তারা অবচেতনভাবে এমন একজনকে খোঁজে যে তাদের হয়ে সত্যি কথাটা অন্তত বলবে। হাদি ছিলেন মানুষের সেই কণ্ঠস্বর।
হাদির হত্যাকাণ্ডের পর জনমনে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তাকে ফ্রয়েডীয় ভাষায় ‘ডিসপ্লেসমেন্ট’ বলা যেতে পারে। মানুষ খুনিদের ধরতে পারছে না, রাষ্ট্রের বিচারহীনতায় তারা অসহায়, আর এই অন্তর্গত ক্রোধের একটি বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে নিলোফার মনির বক্তব্যে উচ্চারিত একটি শব্দের ওপরে। মানুষ যখন কোনো গভীর শোকে কাতর থাকে, তখন তারা অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় প্রিয় প্রতীকের প্রতি যে কোনো নমনীয় বা অস্পষ্ট শব্দকেও তারা ‘অবমাননা’ হিসেবে গণ্য করে।
নিলোফার মনি যখন ‘গিনিপিগ’ শব্দটি ব্যবহার করেন, তখন তিনি হয়তো এই শব্দে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বোঝাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মানুষের অবচেতন মন সেটিকে গ্রহণ করেছে ‘রিডাকশনজম’ বা অবমূল্যায়ন হিসেবে; কারণ, জনমনস্তত্ত্ব এখন এমন এক অবস্থায় আছে যেখানে তারা বিশ্বাস করে, রাজনৈতিক দলগুলো হাদিকে কেবল তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সোপান হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। মনির ‘গিনিপিগ’ শব্দটি তাদের এই ‘ব্যবহৃত হওয়ার’ ভীতিকে উসকে দিয়েছে। ফলে মানুষের ক্ষোভ এখানে শুধু একটি শব্দের বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি সম্ভাব্য ‘বিট্রেয়াল’ বা বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কার বিরুদ্ধে।
চিহ্নের রাজনীতি এবং অর্থের বিচ্যুতি
‘গিনিপিগ’ শব্দটি একটি ‘মেটাফোর’ বা রূপক। সচরাচর বিজ্ঞানের গবেষণাগারে প্রাণীদের ওপর যে পরীক্ষা চালানো হয়, তাকে বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। নিলোফার মনি তার ব্যাখ্যায় দাবি করেছেন, তিনি হাদিকে ষড়যন্ত্রকারীদের দাবার ঘুঁটি বা পরীক্ষামূলক শিকার হিসেবে বোঝাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখানে ‘প্রাগম্যাটিকস’ বা প্রসঙ্গের ব্যাকরণ ভিন্নভাবে কাজ করেছে।
ভাষাবিজ্ঞানী ফার্দিনান্দ দ্য সসুরের তত্ত্বে ‘সিগনিফায়ার’ (শব্দ) এবং ‘সিগনিফাইড’ (ধারণা) এর মধ্যে যে সম্পর্ক থাকে, তা নির্ধারিত হয় সামাজিক প্রেক্ষাপটে। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘গিনিপিগ’ শব্দটির সিগনিফাইড বা অর্থ কেবল ‘পরীক্ষার বস্তু’ নয়, বরং এটি একটি প্রাণীর সঙ্গে তুলনা–যা একজন শহীদের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে।
মানুষের কান শব্দটির পেছনের রাজনৈতিক বিশ্লেষণটুকু না শুনে কেবল ‘গিনিপিগ’ আর ‘হাদি’–এই দুটি শব্দকে একীভূত করে ফেলেছে। ভাষাতত্ত্বের ভাষায় একে বলা হয় ‘সিলেক্টিভ পারসেপশন’। যখন মানুষ সংক্ষুব্ধ থাকে, তখন তারা পুরো বাক্যের গূঢ়ার্থ বোঝার চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু নেতিবাচক শব্দকে আঁকড়ে ধরে প্রতিবাদের অস্ত্র বানাতে পছন্দ করে। নিলোফার মনির ব্যাখ্যাটি তাই ভাষাগতভাবে যুক্তিনির্ভর হলেও সাধারণ মানুষের আবেগের ব্যাকরণে তা ধোপে টেকেনি।
আত্মত্যাগ বনাম সুবিধাবাদ
দার্শনিক দৃষ্টিকোণে এই সংকটটি ‘এথিকস অব কেয়ার’ এবং ‘পলিটিক্যাল রিয়েলিজম’–এই দুইয়ের মধ্যকার একটা দ্বন্দ্ব। ওসমান হাদি ছিলেন একজন ‘আইডিয়ালিস্ট’ বা আদর্শবাদী। তিনি সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলতেন। তার এই অকপটতা ছিল সত্যের জন্য বিষপান করতে দ্বিধাহীনতার উদাহরণ। অন্যদিকে, নিলোফার মনি বা প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো ‘পলিটিক্যাল মেকিয়াভেলিয়ানবাদ’ বা রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিশ্বাসী।
এখানে হাদিকে ‘গিনিপিগ’ বলাটা দার্শনিক অবমাননা হিসেবে কেন বিবেচিত হচ্ছে? কারণ, ‘গিনিপিগ’ হওয়ার মধ্যে কোনো ‘এজেন্সি’ বা নিজস্ব ইচ্ছা নেই। কিন্তু হাদি যা করেছেন, তা ছিল তার নিজস্ব সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তিনি স্বেচ্ছায় ঝুঁকি নিয়েছেন, জনগণের চাঁদায় নির্বাচন লড়তে চেয়েছেন। তাকে যখন কোনো ষড়যন্ত্রের ‘গিনিপিগ’ বলা হয়, তখন তার ‘হিরোইজম’ বা বীরত্বকে অস্বীকার করে তাকে একটি ‘প্যাসিভ অবজেক্ট’ বা নিষ্ক্রিয় বস্তুতে নামিয়ে আনা হয়। অথচ, হাদি ছিলেন একটি ‘সাবজেক্ট’, যার নিজস্ব সত্তা ছিল। নিলোফার মনির বক্তব্যে সেই সাবজেক্টিভিটি হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলেই এটা বড় এক সংকট হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে। মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, একজন শহীদ কি কেবলই একটি সংখ্যা বা রাজনৈতিক দাবার একটি চাল? হাদির মতো একজন ব্যক্তি যিনি ভারতকে আধিপত্যবাদ ধরে নিয়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তার মৃত্যুকে যদি কেবল একটি ‘এক্সপেরিমেন্ট’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়, তবে তা সমগ্র জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের প্রতি এক প্রকার উপহাস হয়ে দাঁড়ায়।
বৃহৎ শক্তি এবং অভ্যন্তরীণ কূটচাল
হাদি হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষমতার যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তাতে হাদি ছিলেন এক অস্বস্তিকর কণ্ঠস্বর। তিনি ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে যে নতুন সাংস্কৃতিক-রাজনীতি শুরু করেছিলেন, তা ক্রমে বিএনপির মতো বড় দলের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারত। বিশেষ করে হাদি যে আসনে প্রার্থী ছিলেন, সেখানে বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার অবস্থান।
হাদির খুনি গ্রেপ্তার না হওয়া এবং বিএনপির আইনজীবীদের মাধ্যমে তাদের আইনি সুবিধা পাওয়া–এইসব ঘটনা একটি ‘স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স’ বা কাঠামোগত সহিংসতার ইঙ্গিত স্পষ্ট করে। এই রাজনৈতিক অবিশ্বাসের আবহে নিলোফার মনির মন্তব্যটি কেবল ভুল শব্দচয়ন নয়, বরং অনেকের চোখে এটি ‘ফ্রয়েডীয় স্লিপ’ বা মনের ভেতরের অবদমিত সত্যের বহিঃপ্রকাশ মনে হতে পারে। মানুষ মনে করছে, বিএনপি হয়তো ভেতর থেকে হাদিকে এমনই তুচ্ছ মনে করে।
একইসঙ্গে ভারতের প্রসঙ্গটি অনস্বীকার্য। হাদি ছিলেন ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এক সোচ্চার কণ্ঠ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের যে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রয়েছে, তার বিপরীতে হাদির অবস্থান তাকে একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক লক্ষ্যে পরিণত করেছিল। হত্যাকাণ্ডের আগে খুনিদের অ্যাকাউন্টে বিপুল টাকার লেনদেন এবং শত শত সিসিটিভি ফুটেজ আর ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট থাকা সত্ত্বেও তাদের ধরতে না পারা বা না ধরা স্পষ্টতই রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরকার একটি বড় ধরনের যোগসাজশ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সন্দিহান করেছে। নিলোফার মনির মন্তব্য এই বড় অপরাধ থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে একটি ছোট শব্দ-বিতর্কের দিকে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
মিডিয়া এবং ‘কাটপিস’ সংস্কৃতি: আংশিক সত্যের ঝুঁকি
বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্যের ‘ডিটেক্সচুয়ালাইজেশন’ বা প্রেক্ষাপটহীন উপস্থাপন একটি বড় সমস্যা। শব্দচয়নগত উদ্ভূত সংকট পরবর্তী সময়ে নিলোফার মনি তার বক্তব্যের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সেখানে দেখা যায় তিনি আসলে হাদির পক্ষ নিয়েই বলতে চেয়েছিলেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, যারা হাদিকে হত্যা করেছে তারা তাকে ব্যবহার করতে চেয়েছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার ‘কাটপিস’ বা ছোট ক্লিপিংসে কেবল ‘গিনিপিগ’ শব্দটিই বড়ভাবে প্রচারিত হয়েছে। এটা প্রচলিত সাংবাদিকতার এক নৈতিক সংকট। যখন সংবাদমাধ্যমের ‘ভিউ ব্যবসা’য় একটি বড় সত্য (হাদি হত্যাকাণ্ড এবং বিচারের অভাব) আড়ালে পড়ে যায় একটি ছোট বিতর্কের (মনির শব্দচয়ন) কারণে, তখন প্রকৃত লাভ হয় খুনিদের। জনমানুষের এই সংবেদনশীলতাকে পুঁজি করে যারা ভিডিও কাটছাঁট করছে, তাদের সবাই যে ভিউ ব্যবসার জন্যই করছেন এমন নয়, তাদের মধ্যে কারো কারো উদ্দেশ্য হয়তো মনির রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করা কিংবা হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল দায় থেকে রাষ্ট্রকে আড়াল করা।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তির পথ
আমাদের দায় মূল সত্যের কাছে ফিরে আসায়। নিলোফার মনি ‘গিনিপিগ’ শব্দ ব্যবহার করে ভুল করেছেন কি করেননি, তার চেয়েও বড় সত্য হলো ষড়যন্ত্রকারীরা ওসমান হাদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করেছে এবং রাষ্ট্র এখনো তার খুনিদের ধরতে পারেনি।
মনির বক্তব্য নিয়ে যে ক্ষোভ, তা আসলে বিচারহীনতার বিরুদ্ধে মানুষের দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভের একটি বহিঃপ্রকাশ মাত্র। হাদি ছিলেন নৈরাশ্যে নিপতিত জনতার এক আশার প্রদীপ। সেই প্রদীপ নিভে যাওয়ার পর মানুষ যখন অন্ধকারে হাতড়াচ্ছে, তখন যে কোন দায়িত্বহীন শব্দ তাদের আঘাত করবেই। নিলোফার মনির ক্ষমা চাওয়া বা দুঃখ প্রকাশ কেবল তার দল বা তার নিজের জন্য নয়, বরং এই জুলাই-পরবর্তী সংবেদনশীলতাকে সম্মান জানানোর জন্যেও প্রয়োজনীয়।
তবে আলোচনার কেন্দ্রে পুনরায় হাদির বিচারকে ফিরিয়ে আনতে হবে। দলীয়, সরকারি কিংবা আন্তঃদেশীয়–কার হাত এই হত্যাকাণ্ডে রয়েছে, তার স্বচ্ছ তদন্তই পারে এই মনস্তাত্ত্বিক সংকটের সমাধান করতে। শব্দ নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে, কিন্তু লাশের রাজনীতির অবসান হওয়া জরুরি। হাদি চেয়েছিলেন একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র, যেখানে সাধারণ মানুষ সাদাকে সাদা বলার সক্ষমতা রাখবে। আজ তার মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে তৈরি হওয়া এই সংকটে এটা স্পষ্ট যে, আমরা এখনো সেই মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ থেকে অনেক দূরে।