Published : 04 Nov 2025, 05:59 PM
১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক। ঋষিকেশ দাশ লেনে ঐতিহ্যময় ঘটক বংশে তার জন্ম। ঋত্বিকের বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক ছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, লিখতেন কবিতা ও নাটক। তার বদলির চাকরির কারণে পরিবার দেশের নানা প্রান্তে ঘুরেছে। বাবা অবসর নেওয়ার পর রাজশাহীতে বাড়ি করেন; সেই থেকে রাজশাহীর মিয়াপাড়ায় ঋত্বিক কুমার ঘটকের পৈতৃক বাড়ি। যেখানে তার শৈশবের কণ্ঠস্বর, কৈশোরের স্বপ্ন এবং প্রথম সাহিত্যের ছোঁয়া লুকিয়ে ছিল—আজ সব ধ্বংসস্তূপে পরিণত। ওই ঘর-দুয়ার, যেখানে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নামের সঙ্গে তার নাট্যচর্চা জুড়ে ছিল, আজ আর কোনো অস্তিত্ব নেই। ঋত্বিক ঘটকের জীবনের শুরুটা কেটেছে এই পৈতৃক বাড়িতে। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও পরে রাজশাহী কলেজে পড়াশোনার সময় তিনি এই বাড়িতেই থেকেছেন। ঋত্বিক ঘটকের ভাইঝি, বরেণ্য কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীও এই বাড়িতে থেকেছেন।
প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে গতবছর ৫ অগাস্ট সরকার পতন হয়, আর ১৪ অগাস্ট ঋত্বিক ঘটকের পৈতৃক বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। চলচ্চিত্র ও সাহিত্যকর্মীরা এই ধ্বংসের খবর শুনে ভিড় করেছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রের নীরবতার সামনে হার মানে ঋত্বিকপ্রেমীদের চোখের জল। রাজশাহীতে বরেণ্য পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের পৈতৃক বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ বলে বর্ণনা করেছিলেন ভারতের চলচ্চিত্র অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে ঋত্বিক ঘটকের নাতি।
সর্বক্ষেত্রে শুধু দায় এড়ানোর অজুহাত। এই একটি ঘটনায় সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা কত ভঙ্গুর, তা দেখতে পেলাম। ঋত্বিক ঘটকের এই পৈতৃক নিবাস শুধু একটি ভবন নয়; এটি আমাদের চলচ্চিত্র, সাহিত্য এবং মানবতার সংগ্রামের স্মারক। সেখানে কাটানো মুহূর্তগুলো, সাহিত্যচর্চা, নাট্যচর্চা—সবই আমাদের হৃদয়ে লুকিয়ে আছে। আর আজ, সেই স্মৃতি যেন ইটের স্তূপের নীচে চাপা পড়েছে।
ঋত্বিক ঘটক বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী নাম—তিনি কেবল পরিচালক নন, ছিলেন এক দার্শনিক, এক বিপ্লবী চেতনার শিল্পী, যিনি সমাজ, সময় ও মানবতার গভীর যন্ত্রণা অনুভব করতে পারতেন। তার চলচ্চিত্রে প্রতিধ্বনিত হয় দেশভাগের বেদনা, বাস্তুচ্যুত মানুষের হাহাকার ও ছিন্নমূল জীবনের আর্তনাদ। ১৯৪৭ সালের বিভাজন শুধু উপমহাদেশ নয়, ভেঙেছিল ঋত্বিকের আত্মাকেও। পূর্ববঙ্গের রাজশাহীতে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি দেশভাগের পর পরিণত হন এক উদ্বাস্তুতে—যে বাস্তবতা তার শিল্পচেতনার মূল স্রোত হয়ে ওঠে।
দেশভাগ তার মনে সৃষ্টি করেছিল গভীর মানসিক অস্থিরতা। তার কাছে এটি ছিল এক সভ্যতার আত্মবিনাশ, এক মহামানবিক বিপর্যয়। ওই অনুভবই তাকে বানিয়েছিল ‘বিচ্ছেদের শিল্পী’। ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), ‘কোমল গন্ধার’ (১৯৬১), ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬২)—প্রতিটি চলচ্চিত্রেই তিনি দেখিয়েছেন ওই ভাঙনের যন্ত্রণা। ‘মেঘে ঢাকা তারা’র নীতা যেন পূর্ববঙ্গের প্রতীক, যে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েও বাঁচতে চায়। তার ‘আমি বাঁচতে চাই!’ আর্তনাদ আসলে ঋত্বিকের নিজেরই ক্রন্দন।
‘সুবর্ণরেখা’-তে দেশভাগের দাগকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন নদীর রূপে—দুটি বিশ্বের মাঝে বিভক্ত এক রক্তাক্ত রেখা, যা হারানো স্বপ্নের প্রতীক। তার প্রতিটি ফ্রেম, প্রতিটি সংলাপ যেন দেশভাগ-আক্রান্ত এক মনের স্বাক্ষর।
তবু, যতই শিল্পে গভীর হয়েছেন, জীবনে ততই নিঃসঙ্গ। মূলধারার রোমান্টিক চলচ্চিত্রের বিপরীতে তার ক্যামেরা খুঁজেছে বাস্তুচ্যুত মানুষের মুখ। এই আদর্শবাদই তাকে ফেলেছিল আর্থিক সংকটে ও মানসিক যন্ত্রণায়। মদে আশ্রয় নিয়েছিলেন, কিন্তু যন্ত্রণা থামেনি; বরং তীব্রতর হয়েছে। তাঁর ব্যক্তিগত ভাঙনই ছিল জাতির ভাঙনের প্রতিচ্ছবি।
ছিলেন মার্কসবাদে বিশ্বাসী; কিন্তু তার মার্কসবাদ ছিল মানবিক বোধে উজ্জ্বল, যা মানুষের যন্ত্রণা ও আশা দুটোকেই সমান গুরুত্ব দেয়। দেশভাগ-পরবর্তী দারিদ্র্য, উদ্বাস্তু জীবনের বঞ্চনা, নারীর আত্মত্যাগ সবকিছু তিনি দেখেছেন সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিতে, কিন্তু উপস্থাপন করেছেন গভীর মানবিক কাব্যরীতিতে। তার চলচ্চিত্র তাই রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি হয়ে ওঠে মানুষের অস্তিত্ব সংকটের দলিল।
ঋত্বিক ঘটক তার চিন্তাভাবনা গড়ে তুলেছিলেন ভারতের বিভাজন-পরবর্তী সময়ে, যখন সমাজে বিভ্রান্তি, বাস্তুচ্যুতি ও শ্রেণিগত টানাপোড়েন প্রবল। এই সময়েই গড়ে ওঠে বামপন্থী সাংস্কৃতিক আন্দোলন, ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন (আইপিটিএ)। যার সঙ্গে ঋত্বিকের গভীর সম্পৃক্ততা ছিল। ছিল পার্টি রাজনীতি ও তার সাংস্কৃতিক বিনির্মাণের চিন্তা।
আইপিটিএ-তে তিনি নাট্যকার, অভিনেতা ও নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছেন। সেখান থেকেই জন্ম নেয় তার ‘জনগণের সংস্কৃতি’ ভাবনা। ১৯৫৪ সালে লেখা ‘অন দ্য কালচারাল ফ্রন্ট’ ছিল কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক নীতির তাত্ত্বিক সমালোচনা, যা পার্টি থেকে তার বহিষ্কারের পর বহু বছর পর্যন্ত অপ্রকাশিত ছিল। ১৯৯৩ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তার স্বাক্ষরিত পাণ্ডুলিপিটি উদ্ধার করেন। পার্টির শিল্প ও শিল্পীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি সমালোচনার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেন তিনি ওই গ্রন্থে। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল শিল্পকে স্বাধীন ও আদর্শের বন্দিত্বমুক্ত হতে হবে। তিনি দেখিয়েছিলেন, শিল্পকে রাজনীতির অধীন করলে তার স্বাধীনতা নষ্ট হয়। এই দলিল আজও বামধারার শিল্প-বিশ্লেষণ ও আর্ট ও রাজনীতির দ্বন্দ্ব বোঝার জন্য অপরিহার্য।
শিল্পের প্রতি অবিচল সততা আর নিজের কাজের প্রতি কঠোর নিষ্ঠাই যেন ধীরে ধীরে তাকে ডুবিয়ে দিয়েছিল হতাশার গভীর চোরাবালিতে। ঋত্বিক ঘটক বাংলা চলচ্চিত্রের এক অমর নাম, যিনি শিল্পকে কখনো বিনোদনের বাহুল্য ভাবেননি; ভেবেছিলেন মানুষের আত্মার প্রতিধ্বনি। কিন্তু সেই সত্যের অন্বেষণেই যেন নিজের জীবনটাকেই বিলিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
‘সুবর্ণরেখা’র পর দীর্ঘ সময় ধরে তার হাতে কোনো নতুন ছবি এলো না। সময়ের অবহেলা, প্রযোজকের অনাগ্রহ, সমাজের উদাসীনতা সব মিলিয়ে একা হয়ে পড়লেন তিনি। নিজের প্রতি রাগ, চারপাশের প্রতি ক্ষোভ, শিল্পের প্রতি অদম্য ভালোবাসা—সব মিলেমিশে তৈরি করল এক অন্তর্দহন। ব্যর্থতার তীব্র যন্ত্রণা ভুলতে আশ্রয় নিলেন মদের, যেন প্রতিটি চুমুকেই ভুলে থাকতে চান নিজের ভেতরের ক্ষতচিহ্নগুলো।
আগেও বহুবার মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন ঋত্বিক। কিন্তু ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’র পর তিনি যেন পুরোপুরি ভেঙে পড়েন। তাকে নিতে হয় মানসিক হাসপাতালে। সেখানে তিনি ধীরে ধীরে হারাতে থাকেন নিজের স্মৃতি, এক সময় প্রিয়জনদের মুখ চিনতেন না, শুভাকাঙ্ক্ষীদের উপস্থিতিও তার কাছে অপরিচিত হয়ে যায়। জটিল সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত এই মানুষটি মাঝেমধ্যেই হঠাৎ রাগে, হঠাৎ অস্থিরতায় ফেটে পড়তেন।
জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে এক হাসপাতালের নির্জন প্রকোষ্ঠে; যেখানে সঙ্গী ছিল কেবল নীরবতা, আর হয়তো মাঝে মাঝে ফিকে হয়ে আসা কোনো পুরোনো সংলাপের প্রতিধ্বনি।
অসীম প্রতিভা, সীমাহীন যন্ত্রণা এই দুইয়ের মাঝে টানাপোড়েনেই শেষ হয়ে যায় তার পথচলা। ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি, মাত্র ৫০ বছর বয়সে ঋত্বিক ঘটক চিরতরে বিদায় নেন পৃথিবী থেকে।
কিন্তু তিনি কি সত্যিই হারিয়ে গেছেন? না, তার প্রতিটি ফ্রেম, প্রতিটি সংলাপ, প্রতিটি নিঃশ্বাসে আজও ধ্বনিত হয় এক শিল্পীর আর্তনাদ—“শিল্প যদি মিথ্যা হয়, তবে বেঁচে থাকার মানেটাই বা কী?”