Published : 05 May 2026, 01:03 AM
থালাপতি বিজয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই এমজিআর অর্থাৎ বিখ্যাত অভিনেতা এম. জি. রামচন্দ্রনের তুলনা চলে না। থালাপতি বিজয় তামিল সিনেমার মেগাস্টার, কিন্তু অনভিজ্ঞ রাজনীতিক। প্রাক-গণনাকারী কোনো ফলাফলে তিনি মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না। অথচ এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বাজিমাৎ করে অতীতের সব নির্বাচনি হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে চলেছেন। থালাপতির দল তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে ছিটকে পড়েছে। কার্যত থালাপতির দলই সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে।
এই ঘটনা কীভাবে সম্ভব হলো? সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হলো, তামিলনাড়ুতে অভিনেতাদের পূজা করার প্রবণতা রয়েছে; ফলে জনরায়ও অনেক সময় অভিনেতাদের পক্ষেই যায়। থালাপতির বিজয় তেমন একটি মুহূর্ত। তামিলনাড়ুর বাইরেও জনপ্রিয় ধারণা সেটাই। এর উদাহরণ হিসেবে এমজিআরের ক্ষমতায় আসা কিংবা ১৯৯১ সালে জয়ললিতার মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসীন হওয়াকে দেখানো হয়।
তবে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক পরিস্থিতি একাধিক দ্রাবিড়ীয় ধারার সঙ্গে জড়িত। এর স্বতন্ত্র ও গভীর সাংস্কৃতিক ভিত্তি বুঝতে প্রয়োজন নিমগ্ন চেতনা ও অঙ্গীকার, যা পূরণ করতে জনপ্রিয় নায়ক পর্যন্ত হোঁচট খান। রজনীকান্তের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথাই ধরা যাক; দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ব্যর্থ হয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়িয়ে অভিনয়ে মনোনিবেশ করেন। ‘সর্বজনীন নায়ক’ খ্যাত কমল হাসান অন্তত ‘মাক্কাল নিধি মাইয়াম’ দল গঠন করেছিলেন। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা এবং ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে দলটি একটি আসনও জিততে পারেনি।
বর্তমান ক্ষমতাসীন দল দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম ক্ষমতা ধরে রাখতে না পারার জন্য শুধু সরকার-বিরোধিতাকে দায়ী করবে। অবশ্য বিষয়টি তুচ্ছ নয়; এম. করুণানিধির মৃত্যুর পর স্টালিনের নেতৃত্বে দলটি টানা দুই মেয়াদে রাজ্য শাসন করেছে। তাদের উল্লেখযোগ্য সাফল্যও রয়েছে। সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করে নারীদের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচিতে যুক্ত করা হয়। তামিলনাড়ুর দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি এবং ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়া দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম প্রচারিত ‘দ্রাবিড়ীয় মডেল’কে শক্তিশালী করেছিল।
অন্যদিকে ব্যর্থতাও কম নয়, বিশেষ করে দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে যে স্বেচ্ছাচারিতা তৈরি হয়, তার স্পষ্ট উদাহরণ ২০২০ সালে সান্থাকুলামে বাবা-ছেলে জয়রাজ ও বেনিক্সের পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা। এই ঘটনায় সম্প্রতি একটি দায়রা আদালত নয়জন পুলিশকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম রাজ্যের বৃহৎ প্রশ্ন ও তামিল পরিচয়ের বিষয়ে যত মনোযোগ দিয়েছে, তার সিকিভাগও চাকরি ও আইনশৃঙ্খলার মতো বাস্তব সমস্যায় দেয়নি। ফলে দলটি ক্রমশ জনমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল। স্টালিনের সরকার গত কয়েক বছর ধরে হিন্দি ভাষা ও সংস্কৃতির আরোপণ এবং তার প্রভাব মোকাবিলায় ব্যস্ত ছিল। শিক্ষানীতিতেও ব্যর্থতা স্পষ্ট। নতুন শিক্ষানীতি নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত তামিল স্বার্থকেই জলাঞ্জলি দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত এসবের কোনোটিই প্রভাবশালী পরিবর্তন আনতে পারেনি। বাস্তব পরিবর্তন আনার মতো কর্মসূচি থেকে দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম রাজ্যের মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। সেই অসন্তোষকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে থালাপতি বিজয়ের তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম। দলটি এখন জনগণের প্রথম পছন্দ হিসেবে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। যদিও তামিলাগা ভেট্রি কাজাগামের প্রধান ভরসা ছিল বয়ানের রাজনীতি; তামিলনাড়ুর জন্য বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার সুযোগ তারা খুব কমই পেয়েছে।

থালাপতির এই অভাবনীয় সাফল্য দেখায়, তামিলনাড়ুর অসন্তোষ অধিকাংশ বিশ্লেষক ও গবেষকের ধারণার চেয়েও গভীর ছিল। একদিকে দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতি মানুষের বিতৃষ্ণা, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কল্পনা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি হতাশা। পুরোনো রাজনীতি এখনো দ্রাবিড় আন্দোলনের পুরোনো ভাষাতেই কথা বলে। ফলে একবিংশ শতকে সামাজিক ন্যায্যতা ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে নতুন আশা ও হতাশাকে পরিবর্তিত বাস্তবতায় বোঝার ক্ষেত্রে অন্য দলগুলো ব্যর্থ হয়। সেই জায়গাতেই থালাপতির দল চোখধাঁধানো সাফল্য লাভ করেছে।
এমজিআরের সঙ্গে তুলনার প্রশ্নে ফিরে আসা যাক; এই তুলনা কতটা যুতসই? থালাপতির বিজয় নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী। তবে এমজিআরের সঙ্গে তার মিল সীমিত। এমজিআর ছিলেন ঘোর আদর্শবাদী। তিনি সি. এন. আন্নাদুরাইয়ের শিষ্য এবং দ্রাবিড় রাজনীতির অগ্নিপরীক্ষায় গড়ে উঠেছিলেন। অন্যদিকে, থালাপতির আদর্শিক গুরু ই. ভি. রামস্বামী পেরিয়ার। ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় আসার সময় এমজিআরের রাজনৈতিক ও সমাজসেবামূলক কাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল। তামিল চলচ্চিত্র সেই ভাবমূর্তিকে আরও শক্তিশালী রূপ দেয়।
অন্যদিকে, দুই বছর আগে তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম গঠনকারী থালাপতির রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নেই। তিনি স্থানীয় দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম ও বিজেপিকে রাজনৈতিক এবং আদর্শগত প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মাঝে মাঝে আন্দোলনেও যুক্ত থেকেছেন। গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ তুলে নিট (NEET) পরীক্ষা নিষিদ্ধ করার আহ্বানও জানিয়েছেন। তবে সৎ প্রশাসনের একটি অস্পষ্ট ধারণার বাইরে তামিলনাড়ুর জন্য তার পরিকল্পনা এখনো স্পষ্ট নয়।
থালাপতির মতোই আরেকজন তারকা-রাজনীতিবিদ ছিলেন, যার গল্প থালাপতির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না, তবে শিক্ষণীয় দিক রয়েছে। তিনি ক্যাপ্টেন বিজয়কান্ত; ২০০৫ সালে তিনি ‘দেশিয়া মুরপোক্কু দ্রাবিড় কাজাগাম’ গঠন করেন। তার প্রধান রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল দুর্নীতিবিরোধী গণআন্দোলন। সেই ভাবাবেগের জোয়ারে দলটি ২০১১ সালে তামিলনাড়ুর দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। তিনি বিরোধী দলের প্রধান নেতা হন। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় তিনি নিজেকে তামিল রাজনীতির প্রধান খেলোয়াড় বা কিংমেকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
কিন্তু এক দশকের মধ্যেই ব্যক্তিপূজা বা কাল্ট রাজনীতি এবং দ্বিতীয় সারির নেতৃত্বের অভাবে দলটি ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। থালাপতির দলের জন্য এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; তার দল এখনো অনেকটাই সাধারণ ভক্তনির্ভর। ফলে তিনি এখন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। এই অবস্থার বাইরে বের হতে পারলেই রাজনীতি ও শাসনের আসল কাজ শুরু হবে।
লেখাটি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনূদিত; এর লেখক পূজা পিল্লাই ওই পত্রিকার সিনিয়র সহকারী সম্পাদক। তিনি সমাজ, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও রাজনীতির আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা করেন। সিনেমা, সাহিত্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, খাদ্য-রাজনীতি ও সমকালীন রাজনৈতিক পরিবর্তন তার লেখার প্রধান ক্ষেত্র।