Published : 24 Apr 2026, 10:56 AM
এ দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই পুরোনো ভালো-মন্দ সবকিছু বাদ দিয়ে নতুন করে ঢেলে সাজানোর একটি উদ্যোগ দেখা যায়। অন্যান্য খাতে যা-ই ঘটুক না কেন, শিক্ষাখাতের পরিবর্তনগুলো প্রকটভাবে চোখে পড়ে। দুঃখজনক হলেও সত্য, সবচেয়ে অসংবেদনশীল উপায়ে এই সংবেদনশীল খাতটিতে পরিবর্তন আনা হয়। বর্তমানেও ওই ধারা অব্যাহত রয়েছে। চব্বিশের পর ধারণা করা হয়েছিল, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আচরণ কিছুটা হলেও বদলাবে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমসূত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরকারি কর্তাব্যক্তিদের যে ধরনের আচরণ চোখে পড়ছে, তাতে সরকার, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরির পরিবর্তে পুরো ব্যবস্থার ভেতরের আস্থাহীনতা সামনে চলে এসেছে। প্রকাশ্যে শিক্ষাঙ্গনে যে ধরনের ‘মোরাল পুলিশিং’ চলছে, তার ফলে তৈরি হচ্ছে শিক্ষক-বিদ্বেষী প্রজন্ম। এ অবস্থা চলতে পরিণাম হবে ভয়াবহ।
চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের একটি সাংঘাতিক বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি। ওই সময়ের শুরুর দিকে পরপর তিন মাসে প্রায় তিন হাজারের বেশি শিক্ষক ভয়াবহভাবে নিপীড়ন ও নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। এই নিগ্রহের মূলে ছিল রাতারাতি অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতি বদলে ফেলার তাড়না।
এই ঘটনাগুলোর মধ্যে একধরনের সাদৃশ্য আছে। কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই রাতারাতি পুরোনো সিস্টেম বদলে ফেলার প্রবণতা লক্ষণীয়। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীরা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে সূত্রপাত ঘটাল মব সংস্কৃতির। এর ফলে গত দুই বছরে নীরবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ভেতরে ভয়াবহ এক মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ঘটে গেছে। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের মধ্যে একধরনের ভয় ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং আলগা হয়ে গেছে তাদের দৃঢ় বন্ধন। আমাদের সামনে এখন এক ত্রিমুখী বাস্তবতা; যেখানে সরকার, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
বরাবর যেসব উপায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের ‘ডিল’ করা হয়েছে (শিক্ষকদের পেটানো, গরম পানি ঢেলে দেওয়া, প্রকাশ্যে চার্জ করা, মব করে অসম্মান করা) এবং শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অনিয়মগুলো রাতারাতি বদলে ফেলার চেষ্টা—এসবের কারণে অল্পবয়সী শিক্ষার্থীরা ধরে নিয়েছে যে, শিক্ষকদের সম্মান করা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তাদের ধারণা জন্মেছে যে, জীবন ধ্বংসের জন্য শিক্ষকরাই মূল ভিলেন।
শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা না থাকায় দিন দিন তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানবিমুখ হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে চব্বিশের পর শিক্ষার্থীরা আর ক্লাসে ফিরতে চাইছে না; বরং তাদের আচরণে তীব্র আগ্রাসন প্রকাশ পেয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষকদের যে মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি হয়েছে, তাতে তারা শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে ফেরাতে নিজেদের সেরাটা দিতে পারছেন না। তাদের মধ্যে প্রতিনিয়ত অসম্মানিত হওয়ার ভয় কাজ করে।
এই মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে একধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। এই অবস্থার উন্নতি ঘটাতে চাইলে শুধু হেলিকপ্টারে চড়ে হঠাৎ স্কুল-কলেজ পরিদর্শন, সংবাদ সম্মেলন, আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদান কিংবা নতুন কোনো নিয়ম চাপিয়ে দিলে লাভ হবে না। বরং প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করে তার সঠিক বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে, শিক্ষা ব্যবস্থার এমন নাজুক পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের মানসিক চাপ না বাড়িয়ে বরং তা কমানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতির কারণেই শিক্ষকরা শিক্ষাদান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আর নিজের বলে মনে করছেন না। তারা শুধু চাকরি বাঁচানোর তাগিদে কাজ করে যাচ্ছেন।
কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে কেবল প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের মানসিক চাপের বাস্তবচিত্রটি দেখা যাক। আমাদের দেশের এমপিওভুক্ত ও বেসরকারি স্কুল-কলেজের প্রায় ৯৩ শতাংশ শিক্ষক নিয়মিত পাঠদানের বাইরেও নানা জরিপ, মা সমাবেশ, ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ বিভিন্ন অপেশাদার কাজ করতে বাধ্য হন। এসব কাজ করতে গিয়ে শিক্ষকরা এতটাই কর্মক্লান্ত থাকেন যে শ্রেণিকক্ষে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন না।
এছাড়া, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিয়োগ পেলেও প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির অসহযোগিতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে শিক্ষকরা সারাক্ষণ অস্থিরতায় ভোগেন। তাদের সময় কাটে চাকরি হারানোর আতঙ্কে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শতভাগ পাস করানোর চাপ থাকে শিক্ষকদের ওপর। শুধু তা-ই নয়, ফলাফল খারাপ হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা হুমকি-ধমকির সম্মুখীন হতে হয় তাদের।
পাশাপাশি বেসরকারি (এমপিওভুক্ত) শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য, বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতার স্বল্পতা এবং বদলির সুযোগ না থাকায় তারা তীব্র অসন্তোষ ও মানসিক চাপে থাকেন। নন-এমপিও শিক্ষকরা দীর্ঘদিন বিনা বেতনে বা নামমাত্র বেতনে কাজ করছেন, যা তাদের মধ্যে চরম অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে।
ক্রমাগত অর্থনৈতিক টানাপড়েন আর তীব্র মানসিক চাপের মধ্যে থেকে আনন্দ নিয়ে বা নির্ভীক চিত্তে পাঠদান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বরং শিক্ষকরা এতে মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন।
গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো শিক্ষকদের কোচিং করানোর ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। আবার অনেক স্কুল কর্তৃপক্ষ স্পেশাল কেয়ার বা কোচিংয়ের নামে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করলে শিক্ষকদের সেখানে যুক্ত হতে বাধ্য করা হয়। প্রণোদনাহীন এসব কাজে তারা চূড়ান্তভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। এর বাইরে উপার্জনের একমাত্র পথ কোচিং রাতারাতি বন্ধের সিদ্ধান্তও শিক্ষকদের পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শুধু কি তা-ই? শিক্ষার্থীদের ভালো গ্রেড পাইয়ে দেওয়ার জন্য অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা ক্রমাগত শিক্ষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। এই প্রত্যাশার দায় মেটাতে গিয়েও শিক্ষকদের পেশাগত জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।
একটি গবেষণা বলছে, প্রাথমিক স্তরে ৯৩ শতাংশ শিক্ষক এই অপেশাদার কার্যক্রমের জন্য মানসিকভাবে ও শারীরিকভাবে প্রচণ্ড ক্লান্ত। তারা শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে (লেট-স্টেজ বার্নআউট) রয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বার্নআউটকে একটি পেশাগত উপসর্গ (অকুপেশনাল ফেনোমেনন/সিনড্রম) হিসেবে ঘোষণা করেছে।
ওই সূত্র ধরে বলা যায়, আমাদের প্রাথমিক স্তরের বেশিরভাগ শিক্ষকই মানসিকভাবে স্থির বা দৃঢ় নন। তাদের নানাবিধ মানসিক সমস্যা সামলেই পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। অথচ তাদের জন্য কোনো বিশেষ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাও নেই।
যেহেতু শিক্ষা একটি দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া, তাই শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ থাকলে শিক্ষার্থীরাও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। তারা দিন দিন অস্থির ও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে। যেমন, হঠাৎ নতুন নিয়ম প্রবর্তন করা হলে ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের মানসিক চাপ দ্বিগুণ করে দেয়। মানসিক অস্থিরতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্যহীনতার কারণেই শিক্ষার্থীরা আগ্রাসী হয়ে পড়ছে এবং তাদের মধ্যে আচরণগত জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
এর ধারাবাহিকতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক। উভয় পক্ষই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ হারাচ্ছে। হঠাৎ সামাজিক নীতি-নৈতিকতা ভেঙে পড়ার কারণে একজন শিক্ষার্থী মিসোপেডাগগ বা শিক্ষক-বিদ্বেষী হিসেবে বেড়ে উঠছে, যে শুধু তার শিক্ষককে ঘৃণা করতেই শিখছে।
পরিশেষে, শিক্ষকের হারানো সম্মান ফিরিয়ে দিতে রাজনীতিবিদ ও অভিভাবকসহ সবার আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। কাউকে অসম্মান করে বড় হওয়া যায় না। শিক্ষকদের সঙ্গে প্রকাশ্যে কেমন আচরণ করা হবে, সে জন্য নির্দিষ্ট আচরণবিধি প্রয়োজন। পাশাপাশি রাতারাতি সবকিছু বদলে ফেলার এই অসুস্থ সংস্কৃতিও বন্ধ করতে হবে।