Published : 28 Apr 2026, 12:34 PM
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে আবারো হত্যার চেষ্টা করা হলো। শনিবার ট্রাম্প যখন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নৈশভোজে অংশ নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই এক বন্দুকধারী ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা চালায়। কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, ওই ব্যক্তি শটগান, হ্যান্ডগান আর একাধিক ধারালো ছুরি নিয়ে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা তাকে আটকে ফেলায় ট্রাম্প এ যাত্রায় বেঁচে যান।
কোল টমাস অ্যালেন নামের ওই বন্দুকধারীই প্রথম ব্যক্তি নন, যিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন। ২০২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি বড় ধরনের নিরাপত্তা লঙ্ঘন ও হত্যা প্রচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছেন ট্রাম্প। কিন্তু কেন এমনটা ঘটছে? বারবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকেই কেন হত্যার চেষ্টা করা হচ্ছে? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হতে পারে হামলাকারীদের ব্যক্তিগত উন্মাদনা বা বিচ্ছিন্ন চরমপন্থা। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর কাঠামোগত কারণ। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক সহিংসতার উত্থান, অস্ত্রের সহজলভ্যতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা আর ক্রমবর্ধমান বিভাজনমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি এর জন্য দায়ী।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমেই একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা স্বীকার করতে হয়। এ পর্যন্ত অন্তত ১১ জন প্রেসিডেন্টকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রতি চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে একজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অথবা তাদের প্রাণনাশের চেষ্টা চালানো হয়েছে। দেশটির ইতিহাসে এখন পর্যন্ত চারজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট—আব্রাহাম লিংকন, জেমস এ. গারফিল্ড, উইলিয়াম ম্যাককিনলি ও জন এফ. কেনেডি—হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে রোনাল্ড রেগান এবং জেরাল্ড ফোর্ডসহ আরো বেশ কয়েকজন প্রেসিডেন্টের ওপর বন্দুক হামলা হলেও তারা প্রাণে বেঁচে যান। মার্টিন লুথার কিং-এর মতো নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতাদেরও হত্যা করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ডনাল্ড ট্রাম্পের ওপর বারবার হামলার চেষ্টা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমেরিকার দীর্ঘকালীন সংগ্রামের একটি প্রবণতা।
নতুন কিছু উপাদান এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তুলেছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক সহিংসতার মাত্রা। দেশটিতে বন্দুকজনিত সহিংসতার হার উন্নত বিশ্বের অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য মতে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১২ মিনিটে একজন ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্রের আঘাতে নিহত হয়েছেন। ওই বছর মোট ৪৪ হাজার ৪৪৭ জন মানুষ বন্দুকের গুলিতে মারা যান। শুধু মৃত্যুই নয়, প্রতি বছর আরও হাজার হাজার মানুষ গুলিতে আহত হন। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সহিংসতা একটি দৈনন্দিন বাস্তবতা, যা সমাজে সহিংসতার প্রতি একধরনের স্বাভাবিকীকরণ তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্র শুধু রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত নয়; এটি অস্ত্রে সজ্জিত একটি সমাজ। যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের চেয়ে বন্দুকের সংখ্যা বেশি। সর্বশেষ জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে ৩৩ কোটির কিছু বেশি মানুষ বসবাস করে। অন্যদিকে, এক হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বেসামরিক নাগরিকদের মালিকানায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। অস্ত্রের এই সহজলভ্যতার কারণে প্রেসিডেন্টসহ অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন যে, উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন সেমি-অটোমেটিক অস্ত্র যখন খুব সহজে কেনা যায়, তখন একজন জননেতার জন্য প্রয়োজনীয় ‘সুরক্ষা বলয়’ নিখুঁতভাবে বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। নিরাপত্তার গণিত অত্যন্ত নিষ্ঠুর। একজন আততায়ী কেবল একবার সফল হলেই চলে, কিন্তু সিক্রেট সার্ভিসকে প্রতিটি সেকেন্ডে সফল হতে হয়।
প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতার পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্য বা রেটরিকের উগ্রতাকেও সহিংসতার অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, যখন জনপরিসরের ভাষা ঘৃণা, অবমাননা এবং মানবিকীকরণহীনতায় ভরে যায়, তখন কিছু মানুষের কাছে সহিংসতা গ্রহণযোগ্য বলে মনে হতে পারে। আইএসডি গ্লোবালের মতো ডিজিটাল বিশ্লেষণকারী সংস্থাগুলোর গবেষণা দেখিয়েছে যে, রাজনীতিবিদদের লক্ষ্য করে অনলাইনে সহিংস বক্তব্য ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালের শেষের দিকে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায় যে, দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকান মনে করেন যে রাজনৈতিক নেতারা সহিংস বক্তব্যের নিন্দা জানান না। এর ফলে রাজনীতিবিদদের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ছে।
ডনাল্ড ট্রাম্প এক্ষেত্রে এক অনন্য অবস্থানে রয়েছেন। তিনি যেমন চরম বিদ্বেষের লক্ষ্যবস্তু, তেমনি তিনি নিজেই এক ধরনের যুদ্ধংদেহী রাজনীতির চর্চা করেন, যা আগুনের শিখাকে আরও উসকে দেয়। ট্রাম্পের রাজনীতির ধরন সমাজে উত্তেজনা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। তিনি প্রায়শই তীব্র ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিভাজন সৃষ্টিকারী মন্তব্য করেন। তবে এটিও সত্যি যে ট্রাম্প এককভাবে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী নন। তিনি এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশের অংশ, যেখানে মেরুকরণ ইতিমধ্যেই গভীর ছিল। ইতিহাসবিদরা মনে করিয়ে দেন যে যুক্তরাষ্ট্রে অতীতেও, যেমন গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময় বা ১৯৬০-এর দশকের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সময়, বিভাজনের রাজনীতি ছিল। যখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শুধু ভিন্নমতাবলম্বী নয়, বরং ‘হুমকি’ বা ‘শত্রু’ হিসেবে তুলে ধরা হয়, তখন সহিংসতার নৈতিক বাধা দুর্বল হয়ে যায়।
আধুনিক সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাঠামো এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বড় কোনো ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। এগুলো মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ায় এবং কখনও কখনও সহিংসতাকে ন্যায্য বলে মনে করার মানসিকতা তৈরি করে। এই ডিজিটাল পরিবেশে মানুষ নিজের মতের সঙ্গে মিল থাকা তথ্যই বেশি গ্রহণ করে, ফলে বিভাজন আরও গভীর হয়।
একটি মনস্তাত্ত্বিক দিকও এখানে কাজ করছে। যখন একটি সমাজ চরমভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন কিছু মানুষ নিজেদেরকে ‘ন্যায় প্রতিষ্ঠার যোদ্ধা’ হিসেবে দেখতে শুরু করে। তারা বিশ্বাস করে যে সহিংসতা একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক হাতিয়ার। এই ধরনের ‘লোন উলফ’ বা একক হামলাকারীরা নিজেদের একটি জাতীয় সংগ্রামের নায়ক হিসেবে দেখতে শুরু করে। একজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ যেমনটি বলেছেন, এই ব্যক্তিরা প্রায়ই নিজেদের মনে মনে ‘দেশপ্রেমিক ঘাতক’ হিসেবে কল্পনা করে এবং বিশ্বাস করে যে সহিংস কাজের মাধ্যমে তারা একটি ভেঙে পড়া সমাজকে মেরামত করছে। এ ধরণের হামলাকারীদের শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সিক্রেট সার্ভিসের ব্যর্থতাকেও উপেক্ষা করা যায় না। কিছু হামলায় দেখা গেছে, নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে ফাঁক ছিল। যদিও শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব, তবুও যে দেশ জাতীয় নিরাপত্তার পেছনে শত শত বিলিয়ন ডলার খরচ করে, সেখানে একজন বন্দুকধারীর পক্ষে প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি করার চেষ্টা মেনে নেয়া যায় না। সিক্রেট সার্ভিসের প্রতি অধিকাংশ আমেরিকানের আস্থা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নীতিনির্ধারণে অচলাবস্থা। গবেষণায় দেখা গেছে, বড় ধরনের বন্দুক হামলার পরও যুক্তরাষ্ট্রে আইনপ্রণেতাদের অবস্থান খুব একটা পরিবর্তিত হয় না। ফলে সমস্যার মূল কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়। সহিংসতার চক্র অব্যাহত থাকে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে একাধিক হত্যাচেষ্টার ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো একটি গভীরতর সংকটের লক্ষণ। নিরাপত্তার ঘাটতি ব্যাখ্যা করতে পারে কীভাবে হামলা সম্ভব হয়েছে। অস্ত্রের সহজলভ্যতা ব্যাখ্যা করে কেন এসব হামলা এত মারাত্মক। কিন্তু মূল কারণ লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক মেরুকরণ, উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য এবং সামাজিক বিভাজনের মধ্যে। যখন একটি দেশে ঐকমত্যের রাজনৈতিক আদর্শের অভাব থাকে, তখন নেতৃত্বের ওপর সরাসরি হামলার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। আমেরিকা যতক্ষণ না তার অস্ত্রের সহজলভ্যতা, নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং রাজনৈতিক ভাষার ধরনে পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনবে, ততক্ষণ পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্ট পদ বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক পেশা হিসেবেই থেকে যাবে।
বাংলাদেশসহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের জন্য এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতা হঠাৎ করে জন্ম নেয় না। ভাষা, আচরণ এবং প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতার মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে তৈরি হয়। যখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখা হয়, তখন ঝুঁকি বেড়ে যায়। ডনাল্ড ট্রাম্পের ওপর হামলার প্রচেষ্টাগুলো একটি সতর্কবাণী যে, কোনো সম্পদ বা প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস একটি সমাজকে রক্ষা করতে পারে না যদি সেই সমাজ একে অপরের সঙ্গে ন্যূনতম মানবিক সম্মান নিয়ে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
ড. মো. আবু নাসের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, বেকার্সফিল্ডের কমিউনিকেশনস বিভাগের চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন