Published : 02 Dec 2025, 12:07 PM
রাত ১১টায় গেট বন্ধ; ছাদে ওঠা নিষেধ; অতিথির গাড়ি বাইরে রাখুন; সকল বিল আলাদা করে দেওয়ার পরেও ভাড়ার সঙ্গে সার্ভিস চার্জ—এরকম নানাবিধ বিড়ম্বনার নাম ভাড়াটে জীবন। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়।
সম্প্রতি এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোহাম্মদপুর থেকে বাসা পরিবর্তন করে গ্রিনরোড এলাকার দিকে বাসা খোঁজার অভিজ্ঞতা শোনাতে গিয়ে বলছিলেন: ‘ঢাকা শহরে বাসা খুঁজতে গেলে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। অসহায় বোধ করি। মনে হয় এটি আমার শহর নয়।’
বস্তুত এই অসহায়ত্বের গল্প ঢাকা শহরের লাখ লাখ মানুষের—যারা জীবিকার প্রয়োজনে এই শহরে বসবাস করেন এবং মাসের শুরুতে আয়ের একটি বড় অংশ তুলে দেন বাড়িওয়ালার হাতে। আর কোনো কারণে বাসা পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে নিজেদের ওই অসহায়ত্ব টের পান হাড়ে হাড়ে। যে মানুষেরা প্রতিদিনই ভাবেন, বিশ্বের বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকার শীর্ষে থাকা এই শহর ছেড়ে একদিন ঠিকই চলে যাবেন। হয়তো দেশের বাইরে, না হয় দেশের ভেতরেই অন্য কোথাও কিংবা নিজের জিন্মভিটায়। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের এই স্বপ্নই ঢাকা শহরের ধুলোবালি, দূষণ, চিৎকার আর যানবাহনের বিকট শব্দের ভেতরে হারিয়ে যায়।
১৯৯১ সালে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন নামে একটি আইন করা হয়েছিল–যেখানে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য সরকার কোনো ব্যক্তিকে কোনো এলাকার জন্য ‘নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবে বলে বিধান করা হয়। কিন্তু আইন প্রণয়নের ৩৪ বছরেও ঢাকা শহরের কোনো এলাকায় এরকম নিয়ন্ত্রক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে শোনা যায়নি।
১৯৯১ সালের আইনে মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণে সরকারের এখতিয়ার থাকবে উল্লেখ করে বলা হয় নিয়ন্ত্রক, বাড়ি-মালিক বা ভাড়াটিয়ার আবেদনের ভিত্তিতে, কোনো বাড়ির মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণ করবেন এবং এমনভাবে সেটি নির্ধারণ করবেন যেন সেটির (ভাড়া) বাৎসরিক পরিমাণ বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে স্থিরকৃত ওই বাড়ির বাজার মূল্যের ১৫ শতাংশের সমান হয়।
এখানে বিষয় দুটি। ১. বাড়ির মালিক বা ভাড়াটিয়া আবেদন না করলে নিয়ন্ত্রক ভাড়া নির্ধারণ করে দিতে বাধ্য নন এবং ২. যদি ভাড়া নির্ধারণ করে দিতে হয় তাহলে সেটি বছরে ওই বাড়ির বাজার মূল্যের চেয়ে ১৫ শতাংশের বেশি হবে না।
ঢাকা শহরের কথাই ধরা যাক। ১৯৯১ সালে ঢাকাসহ সারা দেশে বাসা-বাড়ি ও ফ্ল্যাটের যে দাম ছিল, এখন তা বেড়ে কয়েক গুণ হয়েছে। গুলশান-বনানী-বারিধারার মতো এলাকায় তিন রুমের একটি ফ্ল্যাট তিন চার কোটি টাকায় বিক্রি হয় বলে শোনা যায়। সুতরাং, ফ্ল্যাটের দামের ১৫ শতাংশ যদি বাৎসরিক ভাড়া হয়, সেটির অঙ্ক হয় অনেক বড়—যা অবৈধ টাকার মালিক ছাড়া কারো পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। গুলশান, বনানী, বারিধারার বাইরে মূল শহরের ভেতরে কোথাও এখন দুই বেডরুমের ফ্ল্যাটের দামও কোটি টাকার কাছাকাছি। সুতরাং যে ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য এক কোটি টাকা, সেটির ১৫ শতাংশ ১৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরে ওই ফ্ল্যাটের ভাড়া হবে ১৫ লাখ টাকা। মাসে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা—যা আদৌ বাস্তবসম্মত নয়।
এসব বিবেচনায় নিয়ে ১৯৯১ সালের আইনের এই ১৫ ধারা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না এবং ‘ভাড়া নিয়ন্ত্রক’ নিয়োগসহ বাড়িভাড়ার বিদ্যমান অসঙ্গতি দূর করে ‘মানসম্মত বাড়ি ভাড়া নির্ধারণের জন্য সুপারিশ প্রণয়নে ১৯৫৬ সালের অনুসন্ধান আইনের ৩(১) ধারা অনুযায়ী অনুসন্ধান কমিশন গঠনের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না–তা জানতে চেয়ে ২০১৯ সালে একটি রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। হিউম্যান রাইট্স অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) করা একটি রিটের সম্পূরক আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ (বর্তমান প্রধান বিচারপতি) ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদীর হাই কোর্ট বেঞ্চ রোববার এই রুল জারি করেন।
আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ তখন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মানসম্মত বাড়ি ভাড়া নির্ধারণ করার কথা সরকারের। কিন্তু সরকার সেটি করেনি। ফলে ভাড়াটিয়া এবং বাড়িওয়ালাদের মধ্যে প্রায়ই বিরোধ হচ্ছে। অনেক বাড়িওয়ালা ইচ্ছেমত ভাড়া বাড়াচ্ছেন, অনেক ভাড়াটিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছেন। এসব নিয়ে নানা জটিলতা হচ্ছে। কিন্তু কোনো ভাড়াটিয়া যে আদালতে গিয়ে প্রতিকার পাবেন, আইনি জটিলতা এতটাই বড় যে সেটা তারা পারছেন না। (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ০১ ডিসেম্বর ২০১৯)।
ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২৫ বছরে রাজধানীতে বাসা ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম যতটা বেড়েছে, সে তুলনায় বাসা ভাড়া বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। সুতরাং প্রথমত আইনের এই ধারাটি সংশোধন করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, রাজধানীসহ বড় ও গুরুত্বপূ্র্ণ শহরগুলোর বাসা ভাড়ায় নৈরাজ্য থামাতে সরকারের আইনি ও প্রায়োগিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০১৫ সালে হাইকোর্ট একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটির কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে ডিসেম্বর মাস এলেই বাড়িভাড়া বৃদ্ধির মানসিক চাপে ভুগতে থাকেন ভাড়াটিয়ারা। এ বিষয়ে ভাড়াটিয়াদের প্রতিবাদ কোনো কাজে আসে না। বাড়িওয়ালারা স্পষ্ট বলে দেন, পোষালে থাকেন, না হয় চলে যান। কারণ তিনি জানেন, রাগ কিংবা অভিমান করে অথবা আর্থিক কারণে কোনো ভাড়াটিয়া চলে যাওয়ার পরে ওই বাড়ি বা ফ্ল্যাট অন্য আরেকজন আগের চেয়ে বেশি টাকায় ভাড়া নেবেন।
সরকারি-বেসরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা শহরে যে প্রায় তিন কোটি বা তারও বেশি মানুষ বসবাস করেন, তাদের প্রায় ৭২ শতাংশই থাকেন ভাড়া বাসায়। আয়তন ও জনসংখ্যার হিসাবে ঢাকা সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের একটি। এ শহরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে প্রায় ৪৪ হাজার মানুষ—যা বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই অকল্পনীয়। ন্যূনতম মানবিক সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই মানুষ এই শহরে থাকতে বাধ্য হয়। এই শহরের বাসা ও ফ্ল্যাট ভাড়ায় নৈরাজ্যের মূল কারণ জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ তথা মানুষের বিকল্প না থাকা।
এরকম বাস্তবতায় সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বললেন, ঢাকা শহরের বাড়ি ভাড়া ঠিক করে দেবে সিটি করপোরেশন। ‘ঢাকা শহরের ভাড়াটিয়া বাড়িওয়ালাদের ন্যায্যতা ও অধিকার’ শীর্ষক এই আলোচনায় অংশ নেন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাড়িক মালিক, ভাড়াটিয়া এবং এই বিষয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো। ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ, বাড়িওয়ালারা নিজেদেরকে জমিদার ভাবেন। আর ভাড়াটিয়াদের মনে করেন প্রজা।
যদিও এই কথায় আপত্তি আছে বাড়িওয়ালাদের। তাদের দাবি, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি নির্মাণ আর নানা বিল পরিশোধের পরে পকেটে তেমন কিছুই থাকে না। হোল্ডিং ট্যাক্স ও অন্যান্য খরচ নিয়েও বাড়িওয়ালাদের অসন্তুষ্টি উঠে এলে এই আলোচনা সভায়। বাড়ি ভাড়া আইন বাস্তবায়ন করতে না পারার কথা স্বীকার করে ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, তারা ঢাকা শহরের ওয়ার্ডভিত্তিক বাড়ি ভাড়া নির্ধারণ করে দেবেন।
বাস্তবতা হলো, সকল বাড়ির সুযোগ সুবিধা ভিন্ন ভিন্ন। সুতরাং ভাড়াও ভিন্ন হতে বাধ্য। সে কারণে বাড়ি বা ফ্ল্যাটের ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া কঠিন। আবার এলাকাভেদে বাসা ভাড়া ঠিক করে দেওয়াও সম্ভব নয়। কারণ একই এলাকায়, এমনকি পাশাপাশি দুটি ভবনের মধ্যেই অনেক পার্থক্য থাকে। ফ্ল্যাটের সাইজ, নকশা, নতুনত্ব, সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি পার্থক্যের কারণে পাশাপাশি দুটি ভবনের ফ্ল্যাটের ভাড়ায় পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। সুতরাং সিটি করপোরেশেন চাইলেও ভাড়া নির্ধারণ করে দিতে পারবে না। করে দিলেও সেটির পরিণতি ১৯৯১ সালের আইনের মতই হবে।
অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগের পতনের পরে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে যে শব্দগুলো সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে তার একটি সংস্কার। রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য অনেকগুলো কমিশন হলেও বাড়ি ভাড়ার মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ ও মানবিক সমস্যা সমাধানে সরকারের কোনো সংস্কার বা সংস্কারের উদ্যোগ চোখে পড়েনি। কিন্তু তারপরও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন অন্তত সমস্যার ব্যাপ্তি উপলব্ধি করে যে কিছু বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াকে মুখোমুখি বসিয়েছে এবং পরস্পরের কথা শুনেছে সেটিও কম কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এভাবে ঢাকা শহরের ভাড়াটিয়াদের কষ্ট লাঘব হবে না বা বাড়ি ভাড়া নিয়ে বছরের পর বছর যে নৈরাজ্য চলছে, তা দূর হবে না।

অর্থনীতির সহজ সূত্র হচ্ছে, যে পণ্যের চাহিদা বেশি কিন্তু জোগান কম, সরকার চাইলেও সেই পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। চাকরি, ব্যবসা, সন্তানের পড়ালেখা আর অভিভাবকের চিকিৎসা—সবকিছুর জন্য যে দেশের মানুষকে রাজধানী ঢাকায় আসতে হয়, সেই শহরে বাসা ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বিরোধী দলীয় নেতা থাকাকালীন সংসদের প্রতিটি অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম ও অন্যান্য সমস্যা প্রসঙ্গে বলতেন: ‘টেইক বাংলাদেশ ফ্রম ঢাকা।’
সুতরাং বাংলাদেশকে ঢাকার বাইরে নেওয়া না গেলে তথা ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা না গেলে; ঢাকার সুবিধাগুলো সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া না গেলে কোনো আইন কিংবা উদ্যোগই হয়তো এই শহরের বাড়ি ভাড়ার লাগাম টানতে পারবে না। অর্থাৎ এখানে পণ্যের চাহিদা কমাতে হবে। তাহলেই তার দাম কমতে বাধ্য। যে শহরে ‘টু লেট’ লেখা সাইনবোর্ড বা নোটিশ টানানোর দুয়েক দিনের মধ্যেই বাসা ভাড়া হয়ে যায় এবং আগের ভাড়াটিয়ার চেয়ে বেশি ভাড়া দিয়ে অন্য একজন ভাড়াটিয়া ওই বাসায় উঠে যান—সেই শহরে বাসা ভাড়া নিয়ন্ত্রণ তথা ভাড়া কমানোর দাবিতে কথা বললে সেই আওয়াজ মূলত লাখ লাখ মানুষের অসহায়ত্বের নিচে চাপা পড়ে যায়। সৎ পথে থেকে বৈধ উপার্জনকারী মধ্যবিত্ত টের পায়: এই শহরটি আসলে তার নয়।