Published : 06 Mar 2026, 07:54 PM
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের দুদিন আগে ‘মুজিব পাবলিক টয়লেট’ লেখা একটি ব্যানার নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড়। শিরোনাম হয়েছে পত্রিকারও। খবরে বলা হচ্ছে, রাজশাহী মহানগরীর কুমারপাড়া এলাকায় গুঁড়িয়ে দেওয়া আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের ধ্বংসাবশেষে ‘মুজিব পাবলিক টয়লেট’ লেখা একটি ব্যানার টানিয়ে দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। যার নেতৃত্বে ছিলেন সংগঠনের রাজশাহী জেলা শাখার আহ্বায়ক মো. নাহিদুল ইসলাম। যদিও রাতের মধ্যেই ব্যানারটি আর সেখানে দেখা যায়নি।
শুধু তাই নয়, নাহিদুল ইসলাম বলেছেন, “আমরা ব্যানার সরাইনি। কে বা কারা সরিয়েছে তা জানি না। বিষয়টি নিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করার বিষয়টি ভাবছি।” তিনি আরও জানান, সেখানে প্রতীকীভাবে পাবলিক টয়লেটের ঘোষণা দেওয়া হলেও ভবিষ্যতে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ বিষয়ে রোববার বিভাগীয় কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। (ইত্তেফাক, ০৬ মার্চ ২০২৬)।
এটুকু পড়ার পরে যে কোনো সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের, বিশেষ করে যার মধ্যে ন্যূনতম দেশপ্রেম আছে, তার পক্ষে স্থির থাকা কঠিন।
১৯৭১ সালে যে মানুষটির ডাকে সাড়া দিয়ে এই দেশের সাত কোটি মানুষ জীবন বাজি রেখে মুক্তির যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল; যে মানুষটা বছরের পর বছর আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছেন; ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ যিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে এবং ওই বছরে ২৫ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ডাক দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির ফয়সালা করতে প্রধান ভূমিকা রাখলেন—স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে ওই মানুষটির মৃত্যুর অর্ধশতাব্দী পরে তার নামে পাবলিক টয়লেট তৈরি হবে? এটি কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব?
যারা এই ব্যানার টানিয়েছেন, তারা সংখ্যায় যাই হোন না কেন বা তাদের এই কাজের প্রতিক্রিয়া যত ছোটই হোক না কেন, বাস্তবতা হলো, মুজিব বা বঙ্গবন্ধুর নামে যে এই দেশে পাবলিক টয়লেট বানানো যায়, এই ধারণা বা এই বিশ্বাস লালন করা মানুষও এই দেশে আছে! তারা কারা? কী তাদের জন্মপরিচয়? তারা কি আদৌ বাংলাদেশ এবং এই দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে? তাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এবং তরুণ বয়সে এসে তাদের এই ঔদ্ধত্যের সীমা দেখে তাদের অভিভাবকরা কেমন বোধ করছেন? যেহেতু কাজটি হয়েছে একটি সংগঠনের ব্যানারে, যে সংগঠনটি জুলাই অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তাদেরকেও এটা পরিষ্কার করতে হবে যে, মুজিব পাবলিক টয়লেট লেখা এই ব্যানার টানানোয় তাদের সম্মতি আছে কি না, নাকি এটি সংগঠনের দু-একজনের অতি উৎসাহ। যদি অতি উৎসাহ হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। আর যদি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সাংগঠনিকভাবেই এই আইডিয়ার সঙ্গে একমত হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে ব্যবস্থা নিতে হবে। কেননা বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়কের নামে পাবলিক টয়লেট বানাতে চাওয়া কিংবা ব্যানার টানানো স্পষ্টত গণনৈরাজ্য সৃষ্টির অপরাধ, তাদের আইনের আওতায় আনা দরকার।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরও রাষ্ট্রের কোনো একটি অংশে কোনো একটি গোষ্ঠী যদি এই ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের সাহস পায়, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
স্মরণ করা যেতে পারে, বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বলেছিলেন, “দেশে মব কালচার শেষ। আর এই ধরনের কাজ বরদাশত করা হবে না।” কিন্তু রাজশাহীতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতারা যা করলেন, তা শুধু মবের উসকানিই নয়, বরং এটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার একটি বিরাট দৃষ্টান্ত, যা নতুন সরকারকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। কেননা, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান হবে, জনমনে এই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু এই ধরনের কর্মকাণ্ড একটি সুস্থ, স্বাভাবিক, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় অন্তরায় সৃষ্টি করবে। সুতরাং, অঙ্কুরেই এসব অপতৎরতা নির্মূল করতে না পারলে এইসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বড় ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করবে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা আদর্শের ভিন্নতা আর স্বাধীনতার স্থপতির নামে পাবলিক টয়লেট বানানোর ঔদ্ধত্য প্রদর্শন এক কথা নয়। আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার বিরোধিতা করা আর যে মানুষটির ডাকে এই দেশের সাত কোটি মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তাকে অসম্মান করা এক নয়। যারা এই ধরনের অপতৎপরতার সঙ্গে যুক্ত, তাদের মানসিক অবস্থান স্পষ্টতই দেশের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে।
তবে শুধু রাজশাহীর এই ঘটনাটিই নয়, ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের আগে আরও একটি ঘটনা হয়তো আপনার নজর এড়িয়ে যায়নি। সেটি হলো, একই দিনে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘শাহ আজিজুর রহমান হল’। একইসঙ্গে শেখ হাসিনা হলের নাম পরিবর্তন করে ‘জুলাই-৩৬ হল’, শেখ রাসেল হলের নাম ‘শহীদ আনাছ হল’, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের নাম ‘উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা হল’ এবং ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান ভবনের নাম ‘ইবনে সিনা বিজ্ঞান ভবন’ করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ আমলে বিভিন্ন স্থাপনার নাম বঙ্গবন্ধু এবং শেখ পরিবারের লোকদের নামে নামকরণের একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। ওই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মূলত বঙ্গবন্ধুকেই হেয় করা হয়েছে। এমন সব প্রতিষ্ঠানও তার নামে নামকরণ করা হয়েছে, যা তার মর্যাদা ও উচ্চতার সঙ্গে বেমানান। সঙ্গত কারণেই আওয়ামী লীগের পতনের পরে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের সমস্ত স্থাপনা থেকে বঙ্গবন্ধু এবং শেখ পরিবারের সকলের নাম বাদ দিয়েছে।
প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। সেটি হলো, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর নাম পরিবর্তন করে ওই হলের নামকরণ করা হয়েছে শাহ আজিজুর রহমান নামে একজন চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীর নামে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতিসংঘে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নাম বদলে একজন চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীর নাম দেওয়াটা যে একটা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ, তা বুঝতে গবেষণার প্রয়োজন হয় না। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো কি না এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যে নতুন বয়ান তৈরির চেষ্টা শুরু হয়েছিল, নতুন সরকারও ওই লিগ্যাসি বহন করছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি বড় দুর্ভাগ্য হলো, এই দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও বিতর্কমুক্ত থাকেনি বা এসব বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। জাতির পিতা ও স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়েও বিতর্কের অবসান হয়নি। একটি জাতির জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন নিয়ে এমন রাজনৈতিক বিভক্তি ও বিভ্রান্তি পৃথিবীর আর কোনো দেশে আছে কি না সন্দেহ।
অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার শাসনামল নিয়ে অজস্র সমালোচনা হতে পারে। তিনি গণবিরোধী হয়ে উঠেছিলেন বলেই তার পতন হয়েছে। কিন্তু তার এই পতনের সঙ্গে অনিবার্যভাবে তার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে টেনে এনে তাকেও অসম্মানিত করা, তার নাম বদলে একজন চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীর নাম প্রতিস্থাপন কিংবা তার নামে পাবলিক টয়লেট বানাতে চাওয়ার ধৃষ্টতাগুলো অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো এখন পাওয়া যাবে না। কিন্তু একটি সহনশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে এসব তৎপরতা ও অপতৎপরতা এবং অতি উৎসাহী কর্মকাণ্ড নির্মূল করতে হবে। না হয় ভেতরে ভেতরে আরেকটি অভ্যুত্থানের মাঠ প্রস্তুত হতে থাকবে।