Published : 20 Jun 2025, 01:22 AM
গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান শেষে বাংলাদেশের গতিপথ কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে প্রাথমিকভাবে যে আগ্রহ ছিল, তা ধীরে ধীরে সংশয় ও অনিশ্চয়তায় রূপ নিয়েছে।
সরকার পতনের পর ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত না হওয়া, নির্বাচনের সময়, স্থানীয় না জাতীয় নির্বাচন আগে, সংস্কারের রূপরেখা, রাষ্ট্রের মূলনীতি ইত্যাদি নানাবিধ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান রাজনীতির গতিপথকে জটিল করেছে।
ঈদের আগের রাতে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধের যে কোনো একটি দিনে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দেন। সেনাবাহিনী, বিএনপি এবং বামপন্থী দলগুলো চেয়েছিল ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন। অপরদিকে, জামায়াতে ইসলামীর চাওয়া ছিল এপ্রিলে, সেটা দলটি স্পষ্ট করে না বললেও বুঝতে অসুবিধে হয়নি আমজনতারও।
অধ্যাপক ইউনূসের ভাষণ জামায়াতের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ—জনমানসের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের কাছে বিষয়টি এ ভাবে ধরা পড়ে। অনেকে আবার বিষয়টা এভাবে দেখেছেন–আপাতদৃষ্টিতে রাষ্ট্রে যাদের শক্তিশালী চলক (actor) বলে মনে করা হয়, তাদের বাইরে যেয়ে সরকার স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম—সে বার্তা ইউনূস জাতিকে দিয়েছেন।
প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ সমস্যার সমাধান না করে সঙ্কটকে আরও ঘনীভূত করে। এ প্রেক্ষাপটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে লন্ডনে অধ্যাপক ইউনূসের বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়। এ বৈঠক থেকে সিদ্ধান্ত হয় যে, ‘সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা গেলে ২০২৬ সালের রমজান শুরু হওয়ার আগের সপ্তাহেও নির্বাচন আয়োজন করা যেতে পারে’। লক্ষ্যণীয় যে, যৌথ বিবৃতির ভাষা এমনভাবে করা হয়েছে যাতে সরকার চাইলেই নির্বাচন আবার পিছিয়ে দিতে পারে।
এ বিবৃতির সঙ্গে বিএনপি আপাত ঐক্যমত প্রকাশ করেছে। বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা এতে বেশ উৎফুল্ল। সরকারের সফলতা হলো, তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথম বৈঠকে ডিসেম্বরে নির্বাচনের দাবি থেকে দলটিকে সরিয়ে আনতে পারা।
নির্বাচনের ঘোষণা ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলোর মেরুকরণকে স্পষ্ট করেছে। ৫ অগাস্টের পর রাজনীতিতে নয়া মেরুকরণ তৈরি হয়। মোটা দাগে এ মেরুকরণের এক দিকে হাসিনা বিরোধী সব ইসলামবাদী দল, এনসিপি, এবি পার্টিসহ আরও কয়েকটি ছোট দল। এ রাজনৈতিক দলগুলোর সবাই প্রধান উপদেষ্টার এপ্রিলে নির্বাচনের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছিল।
তারেক রহমানের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠকের পর তাদের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটেছে। প্রধান উপদেষ্টার এপ্রিলের নির্বাচনের সময় থেকে সরে আসার বিষয়ে এনসিপি এবং ইসলামবাদী দলগুলো, বিশেষত জামায়াতে ইসলামী তাদের অসন্তুষ্টির কথা ব্যক্ত করেছে। জামায়াত স্পষ্ট করে এতে প্রধান উপদেষ্টার নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে অভিযোগ এনেছে।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারী আরও কঠিন ভাষায় বৈঠকের পর দেওয়া বিবৃতির সমালোচনা করেছেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, এ মিটিংয়ের মাধ্যমে আরেকটি ফ্যাসিবাদ তৈরির অবতারণা করা হয়েছে। এতে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক মারা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র বলে অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মনে হয়েছিল। কিন্তু এ দুটি দলই বেশ কঠিন ভাষায় বিএনপির সঙ্গে সরকারের এ আপাত সমঝোতার বিষয়টিকে নিন্দা করেছে। ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, সাম্প্রতিক সময়ে তাহলে সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে কি চিড় ধরেছে? সরকার কি কোনো কারণে এনসিপি এবং ইসলামবাদীদের থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখতে চাচ্ছে?
এনসিপি এবং ইসলামবাদীদের বিপরীতে শুরু থেকেই বিএনপি এবং সিপিবি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ মূলত বামপন্থী দলগুলো বড় দাগে নির্বাচনের তারিখ, সংস্কার ইত্যাদি প্রশ্নে অনেকটা একই অবস্থান নিয়েছে। লন্ডনের বৈঠকের সিদ্ধান্তের বিষয়েও তাদের অবস্থান প্রায় কাছাকাছি। লক্ষ্যণীয় যে, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ইসলামবাদীদের থেকে বিএনপি দূরে সরে এসেছে; বিপরীতে, বামপন্থীরা বিএনপিমুখি হয়েছে।
বিএনপি এবং বামপন্থী দলগুলোর মাঠপর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী মনে করেন, এনসিপি এবং অন্তত দুটো ইসলামবাদী দল সরকারের বিশেষ আনুকূল্য পাচ্ছে। সরকার সংশ্লিষ্ট কারও কারও বক্তব্য, কার্যকলাপ বা ভূমিকা তাদের মধ্যে এ ধরনের চিন্তার ভিত্তি তৈরি করেছে। এ বিষয়টা ঘিরে সামনের দিনে রাজনীতির গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে একটা উদ্বিগ্নতা রয়েছে। লন্ডনের বৈঠকের মধ্য দিয়ে ওই উদ্বিগ্নতার পুরোটা দূর হবে কিনা সেটা বোঝার জন্য আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।
এনসিপিকে বিএনপি ও বামপন্থীদের অনেকে ‘কিংস পার্টি’ ভাবেন এবং সেটি তারা সর্বসমক্ষেই বলছেন, যেটি রাজনীতির জটিল সমীকরণে আরেকটি মাত্রা যোগ করেছে। তারা মনে করেন, সরকারের দুজন ছাত্র উপদেষ্টা অনানুষ্ঠানিকভাবে এনসিপির সঙ্গে যুক্ত আছেন। বস্তুত এ বিবেচনা থেকেই বিএনপি এ দুজনের পদত্যাগ দাবি করেছে। শুধু দুজন ছাত্র উপদেষ্টা নয়, বিএনপি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমানেরও পদত্যাগ চেয়ে আসছে বেশ কিছু দিন ধরে।
বিএনপি সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন দুজন ছাত্র উপদেষ্টার বাইরেও সরকারের আরও কিছু ব্যক্তি রয়েছেন, যারা এনসিপিকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেন। সরকার সংশ্লিষ্টদের সম্পর্কে এ ধরনের মূল্যায়ন, সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিএনপির মাঝে এক ধরনের সংশয়ী অবস্থান তৈরি করেছে।
লন্ডনের বৈঠকের পর এটা স্পষ্ট যে, বিএনপি তাদের এ অবস্থান থেকে সরে আসবার ইঙ্গিত দিয়েছে। তারা এখন মনে করছে, নির্বাচনের আগে দুজন ছাত্র উপদেষ্টা পদত্যাগ করলেই নির্বাচনের সময় সরকারের নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে। বিএনপি আর খলিলুর রহমানের পদত্যাগও চাচ্ছে না। সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের যে একটা ইউটার্ন ঘটেছে, লন্ডনের বৈঠক, অনেকটা সেদিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বড় এবং জনপ্রিয় দল হিসেবে বিএনপিকে প্রথম দিকে অনেকের কাছে খুব আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছিল। দলটির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা ভাবতে শুরু করেছিলেন যে তারা প্রায় ক্ষমতায় চলে এসেছেন। নির্বাচনের মাধ্যমে কিছু সময় পরে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তারাই ক্ষমতাসীন হবে—এ ধরনের একটা চিন্তা তারা লালন করছিলেন। কিন্তু দিন যত গড়াচ্ছিল, ওই বিশ্বাসে চিড় ধরার একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছিল দলটির নেতাদের বক্তব্য থেকে।
সরকারের অবস্থানের কারণে তারা যে হতাশ, একাধিক নেতার বক্তব্য থেকে সাম্প্রতিক সময়ে এটি উঠে এসেছে। প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা যখন হতাশার কথা প্রকাশ্যেই বলেন, সেটি দল হিসেবে রাজনীতির মাঠে তাদের দুর্বলতাকেই ইঙ্গিত করে।
রাজনীতির গতিধারার ওপরে যে বিএনপির নিয়ন্ত্রণ নেই—এটা দল হিসেবে বিএনপির জন্য ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছিল না। তারেক রহমানের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার কথা হবার পর থেকে বিএনপি ওই অবস্থা থেকে আপাতত অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে। তবে সেটি স্থায়ী হবে কিনা তা হয়ত বলার সময় এখনও আসেনি।
অধ্যাপক ইউনূসের সরকার সম্পর্কে বিএনপির প্রাথমিক মূল্যায়ন ছিল—নব্বই সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের বিষয়টাও অনেকটা এরকম—যাদের কাজ হবে কয়েক মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে রাজনৈতিক দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। তারা প্রথমে যে বিষয়টা বুঝতে পারেনি সেটা হলো যে, এটি তত্ত্বাবধায়ক নয় বরং গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সরকার। এ দুটো বিষয়ের মধ্যে গুণগত বা মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
নব্বই সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছিল তিন জোটের রূপরেখার আলোকে। তিন জোটের আন্দোলনে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে, যে আন্দোলনে তাদের সঙ্গে দলীয় প্ল্যাটফর্ম থেকে স্বতন্ত্রভাবে জামায়াতও শরিক ছিল।
এরশাদ বিরোধী আন্দোলন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা প্রণয়ন এবং সরকার গঠনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আট দলের পাশাপাশি বিএনপির নেতৃত্বে সাত দলীয় জোটও সমভাবে অংশ নেয়। ফলে এরশাদ পতন পরবর্তী রাজনীতির রেটোরিক, ন্যারেটিভ নির্মাণ এবং এর ধারাবাহিকতা ওপর বিএনপির নিয়ন্ত্রণ এবং ভূমিকা ছিল।
হাসিনা সরকারের পতনের আন্দোলনে বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এ আন্দোলন বিএনপির নামে বা নেতৃত্বে পরিচালিত হয়নি। ফলে সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে বিএনপির মতামত চাওয়া হলেও বিএনপি এ সরকার গঠনে মূখ্য ভূমিকা পালন করতে পারেনি।
হাসিনা পরবর্তী রাজনীতির যে রেটোরিক এবং ন্যারেটিভ সেটি যেমন বিএনপি নির্মাণ করতে পারেনি; তেমনি এ রাজনীতির যে গতিপথ, সেটিরও কোনো ছক বিএনপি এঁকে দিতে পারেনি। একটি রাষ্ট্রের রাজনীতির রেটোরিক, ন্যারেটিভ এবং গতিমুখ যারা নির্মাণ বা নির্ধারণ করে, রাজনীতি এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ মূলত তাদের হাতেই থাকে।
৫ অগাস্ট পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে যারা ক্ষমতাসীন হয়েছেন, তাদের তৈরি করা গতিমুখের আলোকেই বিএনপিসহ অন্যান্য দলকে পা ফেলতে বা তাল মেলাতে হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দল হিসেবে বিএনপির জন্য একটি বড় ধাক্কা। কেননা, সরকারে অথবা বিরোধী রাজনীতির মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে যারা থাকেন, তারাই প্রধানতম দল হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, জনসমর্থন এবং কর্মী সংখ্যার নিরিখে বর্তমানে ক্রিয়াশীল সবচেয়ে বড় দল হয়েও ৫ অগাস্ট পরবর্তী সরকারি বা বিরোধী কোনো রাজনীতির গতিপথের নিয়ন্ত্রক এ দলটি হয়ে উঠতে পারছে না। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি নতুন উপাদান বা ফেনোমেনোন। (চলবে)