Published : 03 Oct 2025, 08:32 PM
আহমদ রফিক, আমাদের রফিক ভাই, জীবন সম্পর্কে বলতেন, “জীবন ও মৃত্যুকে সামগ্রিকভাবে দেখা এবং এই দেখার মধ্য দিয়ে আমরা জন্ম-মৃত্যুর যে দার্শনিক অভিধা—এগুলো একত্র করতে পারি। সেগুলো অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। দার্শনিকরা নানাভাবে জীবন-মৃত্যুকে দেখেছেন। জীবনে সবসময় সংশয় কাজ করে। এই সংশয় অতিক্রম করেই দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। কেউ জীবনকে ভাববাদী দর্শনে, কেউ বস্তুবাদী দর্শনে পরিচালনা করেছেন। তবে জীবনের সর্বক্ষেত্রে মানবতাবাদকে গুরুত্ব দিয়ে চলাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। সবসময় এটাই গুরুত্ব দিয়ে সামনে রাখতে হবে। এভাবেই আমি আমার জীবন ব্যয় করার চেষ্টা করেছি।”
তার মানবতাবাদ শুধু মানবের জন্য নয়, সর্বপ্রাণে বিস্তৃত ছিল। সেই আলোচনার সবটুকু আমি হয়তো করতে পারব না, পরে কখনও অন্য লেখায় সে চেষ্টা করতে পারি। আপাতত আহমদ রফিক আমার মতো এক তুচ্ছ মানবের মনের কোঠায় নিজেকে যেভাবে স্থাপন করেছিলেন, তা বলতে চাই। আমি নিজের কথাই বলব বেশি, তবে তার মধ্য দিয়ে আহমদ রফিকের মতো মহীরূহ কেমন করে আমার এবং আমার মতো অনেকের ‘রফিক ভাই’ হয়ে যেতেন, সেটা বোঝাতে পারব আশা করছি।

২০০৯ সালে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে বিদায় নেওয়ার সময় আমি ‘বিপ্লবীদের কথা’নামে চার পাতার একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করি। শুরুতে এক হাজার কপি ছাপালেও এক বছরের মাথায় তা তিন হাজারে উন্নীত করতে হয়। এ পত্রিকায় মূলত অগ্নিযুগের বিপ্লবী ও বিভিন্ন সময়ের গণআন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরা হত।
পত্রিকাটি ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হতো। আর ঢাকায় বাম সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছে আমি নিজে সরাসরি বিক্রি করতাম। পাশাপাশি কিছু বিশিষ্টজনের কাছেও আমি পত্রিকাটি পৌঁছে দিতাম। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক। পত্রিকার দাম ছিল মাত্র ২ টাকা।
২০১০ সালে আমি ‘বিপ্লবীদের কথা’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করি। আর ২০১১ সালে ‘বিপ্লবীদের কথা’র পক্ষ থেকে ১৫ অক্টোবর অগ্নিযুগের পাঁচ বিপ্লবীর জন্মশতবর্ষ পালন করি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল, প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, সিপিবি নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও বাসদের আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান।
পরের দিন সকাল ১১টার দিকে রফিক ভাই আমাকে ফোন দিলেন। তিনি বললেন, “আমি পত্রিকায় দেখেছি, অগ্নিযুগের পাঁচ বিপ্লবীর জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানটি তুমি আয়োজন করেছ। তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সত্যিই এটা প্রশংসার দাবিদার। তুমি একদিন বাসায় আসো, তোমার সঙ্গে কথা আছে। পারলে দু’একদিনের মধ্যে এসো।”
আমি উত্তর দিলাম, “ঠিক আছে। আমি পরশুদিন সকাল ১১টায় আপনার বাসায় থাকব।”
আগে থেকেই রফিক ভাইকে আমি নিয়মিত পত্রিকা দিতাম। তিনি পত্রিকা সম্পর্কে নানা পরামর্শ দিতেন। কথা অনুযায়ী একদিন তার বাসায় গেলাম। তিনি হাসিমুখে আমাকে বরণ করে নিলেন। ছানা ও চানাচুর খেতে দিলেন। আমার মনে হয়, তার বাসায় যারাই গিয়েছেন, ছানা থেকে বঞ্চিত হননি। তারপর শুরু হলো দীর্ঘ আলাপ—অগ্নিযুগের ইতিহাস, সাহিত্য, মার্সসীয় দর্শন এবং বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার আলোচনা।
আলাপ শেষে তিনি আমাকে একটি খাম দিলেন। আমি নেওয়ার আগে জিজ্ঞেস করলাম, “এটা কী?”
তিনি বললেন, “এখানে কিছু টাকা আছে। এই টাকা তোমাদের কাজে লাগবে। তুমি যে কাজটি করছ, এতে সহযোগিতা প্রয়োজন। আমার সাধ্য থাকলে আরও দিতাম। তবে মাঝে মাঝে কিছু কিছু দিতে পারব।”
আমি বললাম, “রফিক ভাই, এখন টাকার দরকার নেই।”
তিনি খুব ক্ষেপে গেলেন। ভয়ে আমি আর কিছু না বলে খামটি নিলাম।
তখন তিনি বললেন, “তুমি কোনো কাজ করলে আমাকে জানাবে। আমি তোমার সঙ্গে থাকব।”
আহমদ রফিক আমার সঙ্গে এ যে কত আনন্দের, তা তাকে বলা হয়নি। বললাম, “ভাই, শত বিপ্লবী এবং খাপড়াওয়ার্ড নিয়ে দুটি বইয়ের কাজ করছি। আগামী বছর এপ্রিল মাসে বই দুটি প্রকাশ করতে পারব।”
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “এপ্রিল মাসে কেন?”
আমি বললাম, “২৪ এপ্রিল খাপড়াওয়ার্ড দিবসের অনুষ্ঠান করব, আর সেই অনুষ্ঠানে এই বই দুটির মোড়ক উন্মোচন করব।”
তিনি বললেন, “এটা করতে পারলে ভালো হয়। আমি তোমার অনুষ্ঠানে থাকব।”

কথা অনুযায়ী কাজও হলো। ২৩ এপ্রিল খাপড়াওয়ার্ডে অনুষ্ঠান করলাম। সেখানে রফিক ভাই, বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানসহ দেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। সেই দিন থেকেই রফিক ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কের দ্বিতীয় ধাপের অর্থাৎ ঘনিষ্ঠতার সূচনা হয়।
তারপর ২০১৩ সালে আমি ‘বিপ্লবীদের কথা’ নামে একটি প্রকাশনার উদ্যোগ নিয়ে অগ্রসর হই। আমার কাছে কিছু টাকা ছিল, বাড়ি থেকেও কিছু গাছ বেচে এনেছিলাম। কিন্তু তাতে প্রকাশনা পরিচালনা ও বই ছাপানো সম্ভব ছিল না।
তখন আমার মনে পড়ল শহীদুল্লাহ ভাইয়ের কথা। প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, যিনি এর আগেও আমাকে দুটি বই প্রকাশের জন্য অর্থ দিয়েছিলেন। যদিও সেই টাকা বই বিক্রি করে প্রায় পুরোটা শোধ করে দিয়েছিলাম। এজন্য তিনি বলেছিলেন, “এমন কোনো কাজে টাকা দরকার হলে ফোন দিয়ে চলে আসবে।”
আমি তাই তার কাছে গেলাম। গিয়ে প্রকাশনার পরিকল্পনার কথা খুলে বললাম। তিনি জানতে চাইলেন, “তোমার কাছে কত টাকা আছে?”
আমি বললাম, “দেড় লাখ টাকা।”
তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আর কত টাকা হলে প্রকাশনা শুরু করতে পারবে?”
আমি বললাম, “তিন লাখ টাকা হলে আমি শুরু করতে পারব।”
তিনি কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “আচ্ছা, আগামী সপ্তাহে এসে টাকা নিয়ে যেও। আর বই বিক্রি করে একটু একটু ফেরত দিও। ফেরত দিলে আগামীতে আবার টাকা দেব। যত টাকা লাগে দেব।”
একদিন পত্রিকা দিতে আমি রফিক ভাইয়ের বাসায় গেলাম। আড্ডার ফাঁকে তাকে প্রকাশনার পরিকল্পনার কথা বললাম। তিনি শুনে খুব খুশি হলেন এবং বললেন, “আমিও তোমাকে কিছু দিতে পারব। আগামী মাসে এসে নিয়ে যেও। আর এই টাকা দিয়ে তুমি নিজেও একটু খাওয়া-দাওয়া করো। তুমি তো পুষ্টিহীনতায় ভুগছ।”
এ কথা বলেই তিনি আমার চোখ, মুখ আর জিহ্বা গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন। তারপর আবার বললেন, “তুমি ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়া না করলে এই সুন্দর কাজগুলো আর এগোবে না। এই কাজগুলো আমাদের করার কথা ছিল, আমরা করতে পারিনি। তাই তোমাকে দেখে আমি সাহস পাই। তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে। সেজন্য খেতে হবে।”
এরপর তিনি যত্ন করে বললেন, কী কী খাব আর কী কী খাব না— সেই পরামর্শও দিলেন। আমি বুঝলাম, রফিক ভাই আমাকে না, আমি যে কাজের দায় কাঁধে তুলে নিয়েছি, সেটাকে বেশি ভালোবাসেন। যে কাজ তার করার কথা ছিল, সেই কাজ আমাকে দিয়ে করাতে চান। বলার অপেক্ষা রাখে না, কাজগুলো যদি তিনি করতে পারতেন, তাহলে শতগুণ ভালো হত। একজন মানুষ জীবনে তো কম কাজ করেননি। সেই যখন ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র ছিলেন, তেভাগা আন্দোলনের ইলা মিত্র নির্যাতনের শিকার হয়ে এলেন চিকিৎসা নিতে। তিনি ছিলেন ইলা মিত্রের সঙ্গে বাইরের পৃথিবীর যোগসূত্র। ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকা আমরা সবাই জানি। হোস্টেলে তার রুমে বসেই হয়েছিল প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের পরিকল্পনা। তারপর বাকি জীবন মেডিকেল কলেজের সেরা ছাত্রদের একজন রবীন্দ্রনাথ নিয়ে গবেষণা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেই ছিল তার একান্ত বসবাস।
কবি, প্রাবন্ধিক, রবীন্দ্রগবেষক, সংস্কৃতিসেবী ও মার্কসবাদী চিন্তক আহমদ রফিকের জন্ম ১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুর গ্রামে। শৈশব কেটেছে নড়াইল মহকুমা শহরে, আর কৈশোর ও তরুণ বয়সের শিক্ষা জীবন কেটেছে মুন্সিগঞ্জ ও ঢাকায়। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এম.বি.বি.এস ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনে যুক্ত ছিলেন শিল্প ব্যবস্থাপনা, বিশেষত ওষুধশিল্পে। পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আজীবন সক্রিয় থেকেছেন।
আহমদ রফিক রচিত ও সম্পাদিত বইয়ের সংখ্যা ৬০টিরও বেশি। তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বহু পুরস্কার ও সম্মাননা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৯), অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৫), কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট কর্তৃক রবীন্দ্র-তত্ত্বাচার্য্য উপাধি (১৯৯৭) এবং বাংলাদেশে রবীন্দ্র পুরস্কার (২০১১)। এছাড়াও বহু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান থেকে স্বর্ণপদক ও সম্মাননা পদক পেয়েছেন।
বিখ্যাত এই মানুষটি প্রতিবছর বইমেলায় এসে কিছু সময় থাকতেন ‘বিপ্লবীদের কথা প্রকাশনা’র স্টলে। শহীদুল্লাহ ভাই বইমেলায় এলে বিপ্লবীদের কথায় বসতেন। তবে প্রকাশনার কাজের বাড়তি চাপের কারণে ২০১৫ সালে মাসিক পত্রিকা ও ওয়েবসাইটের কাজ বন্ধ করে দিতে হয়। পরে করোনা মহামারীর শুরু হলে ২০২১ সাল থেকে প্রকাশনার কাজও অনেক কমে যায়। গত চার বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বইমেলায় আর কোনো স্টল দেওয়া হয়নি।
২০১৬ সালে আমি রফিক ভাইয়ের একটি সাক্ষাৎকারভিত্তিক বই প্রকাশ করি। এরপর তাকে ভাষা আন্দোলনের ওপর একটি বই দেওয়ার প্রস্তাব রাখি। তিনি হেসে বললেন, “ভাষা আন্দোলনের ওপর তো আমি বই লিখেছি। আবার নতুন করে কী লিখব?”
তখন আমি বললাম, “আপনি যদি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতি এবং কমিউনিস্ট পার্টির অবদান নিয়ে একটি বই লিখতেন, তাহলে তা সময়োপযোগী হতো।”
আমার এই প্রস্তাব গ্রহণ করে তিনি লিখে দেন ‘ভাষা-আন্দোলনে ইতিহাস বিকৃতি: তমদ্দুন মজলিস ও কমিউনিস্ট পার্টি’নামে একটি বই, যা ২০১৭ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়। এর পরের বছর তিনি ‘ইলা-রমেন’ নামে আরেকটি বই লিখলেন, সেটিও আমি প্রকাশ করি।
২০১৬ সালে আমি সম্পাদনা করি ‘২১’ প্রথম খণ্ড। এতে একুশের প্রথম সংকলন (১৯৫৩) থেকে বেশ কয়েকটি লেখা যুক্ত করা হয়। ওই সংকলনের প্রথম লেখাটি ছিল আলী আশরাফ নামে এক লেখকের। কিন্তু তার কোনো হদিস পাচ্ছিলাম না। পরে জানা গেল, এটি আসলে একটি ছদ্মনাম। এই আসল পরিচয় উদ্ধারে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়। অবশেষে রফিক ভাই বললেন, “তিনি আর কেউ নন, তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম নেতা কমরেড খোকা রায়।”
রফিক ভাইয়ের বাসায় আমি প্রায় দুই মাস পরপর একবার যেতাম। সেসব সময়ে তার জীবনের নানা গল্প শুনতাম। শুরুতে তিনি ব্যক্তিগত বিষয়গুলো এড়িয়ে যেতেন। আমি তার জীবনের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস জানতে চাইলে তিনি বেশ বলতেন, কিন্তু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে খুব একটা বলেননি। তবে করোনার পরে তিনি তার ব্যক্তিগত বিষয়গুলো নিয়েও বলতে শুরু করেছিলেন। হয়ত তখন আমাকে তিনি আপন করে নিয়েছিলেন বলেই এমনটা করেছিলেন। প্রায়ই বলতেন— “এই কথাগুলো কারো কাছে বলবে না।”
তবুও আমি একবার একজনের কাছে বলেছিলাম। তিনি ছিলেন রফিক ভাইয়ের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ছেলে, যিনি তাকে ‘চাচা’ বলে ডাকতেন এবং বাবার মতো স্নেহ করতেন। আমার বলার একটাই উদ্দেশ্য ছিল— যাতে তিনি রফিক ভাইকে একটু দেখাশুনা করেন। সত্যিই, করোনার সময় থেকে তিনি রফিক ভাইয়ের নিয়মিত খোঁজখবর নিতেন। তখন থেকে রফিক ভাইয়ের আর্থিক দৈন্যদশা শুরু হয়েছে। প্রকাশকরা মাঝেমধ্যে সামান্য কিছু টাকা দিতেন। এছাড়া তিনি দুটি বইয়ের পুরস্কার হিসেবে কিছু অর্থ পেয়েছিলেন। আর বর্তমানে যে বাসায় থাকতেন, তার বাড়িওয়ালা ভাড়ায় কিছুটা ছাড় দিতেন।
তার আপনজন বলতে ছিলেন একজন বুয়া ও তার দীর্ঘদিনের সহচর ড্রাইভার কালাম—যিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তার সঙ্গে ছিলেন। রফিক ভাই নিঃসন্তান ছিলেন। তার স্ত্রী, যিনি একজন চিকিৎসকও ছিলেন, ২০০৬ সালে মারা যান। সে সময় তারা উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের একটি নিজস্ব ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। ২০০৮ সালে সেই ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে ইস্কাটনে নতুন বাসায় ওঠেন। সেখানে কিছুদিন থাকার পর বর্তমান বাসা অপরাজিতার ৫ম তলায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
অথচ তিনি তার জীবনে অসংখ্য মানুষকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন, সাধ্যমতো পাশে দাঁড়িয়েছেন। ছাত্রদের অনেককে নিজের সাধ্যের মধ্যে পড়াশোনা করিয়েছেন। তাদের দুজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে আজ ভালো অবস্থানে আছেন। কিন্তু একথা বলতে গিয়ে রফিক ভাই আক্ষেপ করে বলেছিলেন— “তারা এখন আর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে না।”
আরেকজনকে তিনি সন্তানের মতো মানুষ করেছিলেন। তাকেও নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন, কিন্তু তার সঙ্গেও কোনো যোগাযোগ নেই।
রফিক ভাইয়ের আপনজন বলতে কেউ ছিল না। তার ভাইবোন সবাই মারা গেছেন। ভাতিজা-ভাতিজিরা বেঁচে আছেন, কিন্তু তাদের কাছেও তিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবনের কথা কখনো খুলে বলেননি।
২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস, বইমেলা চলছে। খাপড়াওয়ার্ডের বিপ্লবী ও ভাষাসংগ্রামী আমিনুল ইসলাম বাদশাকে নিয়ে স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক।
অনুষ্ঠান শেষে তৎকালীন পরিকল্পনা মন্ত্রী রফিক ভাইয়ের হাত ধরে তার বইটির মোড়ক উন্মোচন করে দিতে অনুরোধ করলে তিনি সরাসরি অস্বীকৃতি প্রকাশ করেন।
খুব সম্ভবত ২০১০ সালের বইমেলায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বাংলা একাডেমিতে বক্তৃতাকালে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে কথা বলছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আহমদ রফিকসহ আরও কয়েকজন ভাষাসংগ্রামী।
প্রধানমন্ত্রী তার আলোচনায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ভাষা আন্দোলনের প্রধান নেতা ও ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করে যাচ্ছিলেন। তখন রফিক ভাই মাথা নেড়ে একাধিক বক্তব্যে ‘না’ বুঝিয়েছিলেন। এসময় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। তাদের একজন পরবর্তীতে বলেছিলেন— আহমদ রফিক বেয়াদবি করেছেন। আসলে ওই লোকটির কাছে আমিই জানতে চেয়েছিলাম, আহমদ রফিককে স্বাধীনতা পদক দেওয়া হচ্ছে না কেন? তিনি বলেছিলেন, এভাবে করলে স্বাধীনতা পুরস্কারের আশা করতে পারেন কীভাবে! ওই ব্যক্তির কথাটি আজও মনে পড়লে গা ঘিনঘিন করে ওঠে। তারাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলার সকল আন্দোলনের একক নেতা বানানোর যে প্রয়াস নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা, তার মদদদাতা ছিলেন। আহমদ রফিকরা তো ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধ মানুষ, তাই প্রায় শতবর্ষের কাছাকাছি পৌঁছে মৃত্যুবরণ করেও স্বাধীনতা পদকটি পেলেন না। তাতে অবশ্য আহমদ রফিকের কিছু যায় আসে না, এটা আমাদের জাতীয় গ্লানি হয়ে থাকবে। ভাষা আন্দোলনের জন্যই তিনি পুরস্কারটি পেতে পারতেন। সাহিত্যের জন্যও তাকে পুরস্কৃত করা হলে কোনো বিতর্কের অবকাশ ছিল না। পাননি, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে বয়ান নির্মাণ করা হয়েছে, তাতে তিনি যোগ দিতে পারেননি।
পদক বা পুরস্কারের জন্য নয়, অর্থকষ্টের কারণে রফিক ভাই স্বাধীনতা পদকটি পেতে চেয়েছিলেন, এটা আমি দিব্যি দিয়ে বলতে পারি। কারণ তার সঙ্গে তো আমার নিয়মিত কথা হত। কোনো কাজে পল্টন বা প্রেসক্লাবে এলেই আমাকে ফোন দিতেন রফিক ভাই। ফোনে শুধু বলতেন, “তুমি দোকানে আছ?”
আমি দোকানে আছি বললে কিছুক্ষণ পর কাজ শেষ করে তিনি ‘বিপ্লবীদের কথা প্রকাশনা’-তে চলে আসতেন। এসে প্রথমেই জিজ্ঞেস করতেন, “কী কাজ করছ?”
তারপর মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং কাজের বিষয়ে এমনভাবে পরামর্শ দিতেন, যাতে সেটি আরও ভালো ও সুন্দর হয়।
আধা ঘণ্টা মতো বসে থাকতেন। শুধু এক কাপ চা আর কয়েকটা বিস্কুট খেয়ে চলে যেতেন। মাঝে মাঝে বলতেন, “শহীদুল্লাহ ভাইকে বল, এই দোকানটা কিনে দিতে। আমিও সহযোগিতা করব। সেলিমকেও বলব।”
একবার তো আমার সামনেই সেলিম ভাইকে ‘বিপ্লবীদের কথা প্রকাশনা’টা বাঁচিয়ে রাখার জন্য উদ্যোগ নিতে বলেছিলেন।
রফিক ভাইয়ের একটি স্বপ্ন ছিল, যা তিনি প্রায়ই আমার সঙ্গে শেয়ার করতেন। তিনি বলতেন— “ভাষাসংগ্রামীদের স্মৃতি জাদুঘর হওয়া খুব জরুরি। সেখানে সব ভাষাসংগ্রামীদের স্মৃতি, তাদের লেখা বইপুস্তক এবং ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের দলিল-দস্তাবেজ সংরক্ষিত থাকবে। একেবারে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘরের মতো। যাতে ভবিষ্যতের তরুণ প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানতে পারে।”
একথা শোনার পর আমি ২২ অগাস্ট ২০২৩ তারিখে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে ‘ভাষাসংগ্রামীদের স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গে একটি আবেদন করি। সেই আবেদনে রফিক ভাই নিজেও সুপারিশ (রিকমেন্ড) করেন। তিনি লিখেছিলেন— “আমি মনে করি, ভাষাসংগ্রামীদের স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের সবার জন্য খুব জরুরি। এ বিষয়ে উদ্যোগ নিলে আমি খুশি হব।”
এছাড়াও ২৩ জুন ২০২৪ তারিখে আমি ভাষাসংগ্রামীদের ভাতা প্রদানের প্রসঙ্গেও আরেকটি আবেদন করি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই দুটি আবেদনের ব্যাপারে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তেমন কোনো সাড়া মেলেনি।
গত ৫৪ বছরে ভাষাসংগ্রামীদের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বলতে কিছু নেই। ভাষাসংগ্রামীদের জন্য কোনো ভাতা বা রাষ্ট্রীয় সুবিধা কখনো চালু হয়নি। আহমদ রফিক ভাইয়ের জন্য এই রাষ্ট্র কিছুই করেনি।