Published : 31 Mar 2026, 09:52 AM
একটি নবজাতকের প্রথম কান্না পৃথিবীর কাছে তার আগমনের সগর্ব ঘোষণা। কিন্তু রাজশাহীতে ৩৩টি শিশুর মধ্যে এমনও কেউ কেউ ছিল যারা সেই প্রথম কান্নাটুকুও গলার বাইরে আনতে পারার আগে চলে গেল পৃথিবী ছেড়ে। তাদের এই চলে যাওয়া আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেল একরাশ প্রশ্নের সামনে। কোনো মারণব্যাধি নয়, এই নিষ্পাপ প্রাণগুলো ঝরে পড়েছে কেবল একটি যন্ত্রের অভাবে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই যুগে ‘আইসিইউ নেই’ বা ‘ভেন্টিলেটর নেই’—এমন অজুহাতে ৩৩টি শিশুর মৃত্যু কেবল হৃদয়বিদারক নয়, রাষ্ট্রের জন্য চরম লজ্জার। অথচ অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমরা আরও লাশের অপেক্ষায় আছি।
৩৩ সংখ্যাটি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের বক্তৃতা থেকে পাওয়া। তবে বিভিন্ন পত্রিকার খবরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৪ জন শিশু মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম বলছে, গত ১০ থেকে ২৪ মার্চের মধ্যে যে ৪৪ জন শিশু মারা গেছে, তাদের অধিকাংশের বয়সই এক বছরের নিচে ছিল। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ ভেন্টিলেটরের অভাবে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ২৮ মার্চ রাজধানীর শাহবাগে আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে সোসাইটি অব সার্জনস আয়োজিত ‘সিএমই অন মেডিকেল এথিকস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিস্তর কথা বলেছেন।
মন্ত্রীর বক্তব্যে জীবন বাঁচানোর চেষ্টার চেয়ে দায় এড়ানোর পুরোনো কসরৎ প্রকট হয়েছে। যে প্রশাসনিক উদাসীনতা আর আমলাতান্ত্রিক জড়তা দশকের পর দশক ধরে আমাদের স্বাস্থ্য খাতকে পঙ্গু করে রেখেছে, রাজশাহীর এই ঘটনা তারই বীভৎস উদাহরণ। যখন জীবন বাঁচানোর সরঞ্জামের চেয়ে কর্তৃপক্ষের ‘অজুহাতের তালিকা’ দীর্ঘতর হয়, তখন বুঝতে হবে সমস্যাটি কেবল সরঞ্জামের অভাব নয়, নৈতিকতার অবক্ষয়ও।
৩৩টি প্রাণ নিভে যাওয়ার পরও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যখন অবলীলায় বলে দেয়, ‘আমাদের জানানো হয়নি’, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে আমাদের প্রশাসনিক কাঠামো কতটা সংবেদনহীন। একপক্ষ যখন অন্যপক্ষের দিকে আঙুল তোলে, তখন সেই কথার তোড়ে তলিয়ে যায় ৩৩টি পরিবারের বুকফাটা হাহাকার। মন্ত্রণালয়ের ‘অবহিতি’ আর কর্তৃপক্ষের ‘উদাসীনতার’ এই রশি টানাটানিতে বলি হলো এমন সব প্রাণ, যাদের অপরাধ ছিল স্রেফ ভুল সময়ে ভুল দেশে জন্মানো।
সেই মায়েদের কথা একবার ভাবুন, যারা দীর্ঘ নয় মাস বুকের ভেতরে যে নবজাতকের স্বপ্ন লালন করে হাসপাতালের বারান্দায় পা রেখেছিলেন। তারা সেখানে গিয়েছিলেন নতুন জীবনের ঘ্রাণ নিতে, কিন্তু ফিরেছেন সন্তানের নিথর দেহ নিয়ে। মায়েদের সেই রঙিন স্বপ্নগুলো ধুলোয় মিশে গেছে কোনো মহামারী বা দৈব দুর্ঘটনায় নয়, স্রেফ একটি যন্ত্রের অভাবে। বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষের যুগে যদি যন্ত্রের অভাবে মায়েদের কোল খালি হয়, তবে সেই দায় কার? এই অমার্জনীয় ব্যর্থতাকে কেবল ‘জানানো হয়নি’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কি মৃত শিশুদের প্রতি চরম উপহাস নয়?
৩৩টি শিশুর এই অকালপ্রয়াণের পর আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই মৃত্যুর দায় আসলে কার? প্রশ্নটি শুনতে যতটা সহজ, এর উত্তর দিতে ততটাই কুণ্ঠিত আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র। যখন একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলোর একটি ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই দায়ভার কেবল একজন পরিচালকের ওপর চাপিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা চরম অসততা। এই মৃত্যুগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো আমাদের ঘুণে ধরা স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
দায়টা এখানে ব্যক্তির চেয়েও বেশি কাঠামোগত। যে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটি রাষ্ট্রীয় হাসপাতাল বছরের পর বছর টিকে থাকে, কিন্তু সেখানে নবজাতকের জীবন বাঁচানোর ন্যূনতম সরঞ্জাম পৌঁছায় না, সেই ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা অবহেলাকেই আগে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত। রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান যখন জোগান দিতে পারে না প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেটর, তখন বুঝতে হবে সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখানে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কেবল সান্ত্বনা বা তদন্ত কমিটি নয়, আজ সময় এসেছে সেই ভঙ্গুর ব্যবস্থার আমূল সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন তোলার, যা জীবন বাঁচানোর চেয়ে, ব্যর্থতা ঢাকতে অজুহাত তৈরিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
রাজশাহীর সেই হাহাকারের মাঝে কিছু বেসরকারি উদ্যোগ এগিয়ে এসেছে, দান করা হয়েছে ভেন্টিলেটর, এমনটাই জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এই মানবিকতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, কিন্তু একটু গভীরে ভাবলে এই প্রশংসার আড়ালে লুকিয়ে থাকা লজ্জাটি কি আমরা দেখতে পাই? একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রীয় হাসপাতালে নবজাতকের প্রাণ বাঁচানোর জন্য যখন বেসরকারি দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়, তখন তা আর সাফল্যের গল্প থাকে না। হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্রের ব্যর্থ স্বাস্থ্যনীতির গ্লানি। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিশাল বাজেটের বরাদ্দ কোথায় যাচ্ছে, যদি হাসপাতালের আইসিইউ সচল রাখতেও আমাদের বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সাহায্য প্রার্থী হতে হয়?
এই সংকটের সমান্তরালে আরেকটি অশনিসংকেত বাজছে—দেশজুড়ে হামের প্রকোপ চলছে এখন। বর্ষা আসন্ন। বর্ষা মানেই জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে মশার অবাধ বংশবিস্তারের সুযোগ। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও চিকুনগুনিয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগ দরজায় কড়া নাড়ছে। অথচ স্থানীয় প্রশাসনের নিস্পৃহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ফগার মেশিনের শব্দ বা মশার ওষুধের গন্ধ আজ অনেক এলাকায় ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই তদারকিহীনতার মাশুল শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই দিতে হবে—হয়তো আরও অনেক নিথর দেহের বিনিময়ে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, তারা বিপুল জনরায়ে সংসদে গেছেন। জনগণের প্রতিটি নিশ্বাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের সাংবিধানিক ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা। উদাসীনতার এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার এখনই শেষ সময়।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, করোনা বা ডেঙ্গুর মতো আমরা কি হামের তাণ্ডব দেখার অপেক্ষায় আছি? উত্তরটা কোনো গালভরা আশ্বাসে নয়, লুকিয়ে আছে আমাদের মাঠ পর্যায়ের প্রস্তুতিতে। যে হাসপাতাল ৩৩টি শিশুর জীবনপ্রদীপ আগলে রাখতে ব্যর্থ হলো, সেখানে হামের মতো সংক্রামক ব্যাধি সামলানোর ন্যূনতম সক্ষমতা কি আদৌ আছে? এই প্রশ্নের উত্তর আজ এড়ানো অসম্ভব।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ক্ষতটা শুধু অর্থের অভাবে নয়, সমন্বয়, জবাবদিহি আর ন্যূনতম দায়বদ্ধতার অভাবে। যখন একজন মন্ত্রী অবলীলায় বলেন যে তাকে প্রকৃত অবস্থা ‘অবহিত করা হয়নি’, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে আমাদের প্রশাসনিক কাঠামো কতটা ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছে। একের পর এক শিশুর মৃত্যু সংবাদ যদি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থদের কান পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারে, অপেক্ষা করতে হয় কখন সংবাদমাধ্যম সরব হবে, তখন সেই কাঠামোর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি অমূলক?
একবার ভাবুন তো, সেই শূন্য কোলটি যদি আপনার নিজের হতো? সেই হাহাকার যদি আপনার নিজের ঘর থেকে আসত? এটি কেবল একটি আবেগতাড়িত প্রশ্ন নয়, এটি আমাদের মানবিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। যতক্ষণ আমরা এই মৃত্যুগুলোকে কেবল অন্যের সমস্যা বা খবরের কাগজের নিছক সংখ্যা মনে করব, ততক্ষণ কোনো অর্থবহ পরিবর্তন আসবে না।
হতাশার এই গাঢ় অন্ধকারেও নাগরিক সচেতনতা আর সামাজিক উদ্যোগের যে সামান্য আলো দেখা যাচ্ছে, তাকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব এখন রাষ্ট্রের। সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে রাজশাহীর এই মর্মান্তিক মৃত্যুগুলো কেবল কিছু সংখ্যা নয়, ভয়াবহ সতর্কবার্তা। এই বার্তার জবাব কেবল পরিদর্শন শেষে বক্তৃতা-বিবৃতিতে নয়, দিতে হবে দৃশ্যমান প্রশাসনিক সংস্কার আর মাঠ পর্যায়ের কাজের মাধ্যমে।