Published : 21 Feb 2026, 10:05 PM
খুমিভাষী নাংফ্রার সঙ্গে দেখা সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারে–সবাই এক নামে যাকে পাবলিক লাইব্রেরি বলে। বিধিবদ্ধ নীরবতার ভেতর হালকা গুঞ্জন, টেবিলজুড়ে বই আর ল্যাপটপের আলোয় বসে আছে সে। সময়টা এক ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয়ার্ধ। বাইরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রস্তুতি, দেয়ালে ভাষা আন্দোলনের পোস্টার, মাইকে ভেসে আসছে গান আর কবিতার লাইন। ভাষার জন্য লড়াইয়ের স্মৃতিতে পাবলিক লাইব্রেরি লাগোয়া গোটা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ভরে আছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্লাস অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে নাংফ্রা খুমিকে নিজের মাতৃভাষা নিয়ে একটা প্রেজেন্টেশন দিতে হবে। কাজটা শুনতে সহজ। নিজের ভাষা নিয়ে কথা বলা তো কঠিন হওয়ার কথা না। সে ল্যাপটপ খুলে গুগলে টাইপ করল নিজের ভাষার নাম। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর স্ক্রিনে ভেসে উঠল হাতেগোনা কয়েকটি লিঙ্ক। দু-একটি গবেষণা-প্রবন্ধ, যেগুলোতে তার ভাষা বিশ্লেষিত হয়েছে সংখ্যা ও শ্রেণিবিভাগে। কয়েকটি ইউটিউব ভিডিও, যেখানে তাদের পাহাড়ি জীবনকে দেখানো হয়েছে দূর থেকে–পর্যটকের ক্যামেরায় ধরা দৃশ্যে। দু-একটি ভিডিওতে খুমিভাষী কিছু প্রবীণ মানুষ নিজ জনজাতির গল্প বলছেন। শব্দ আছে, কিন্তু সাবটাইটেল ছাড়া অধিকাংশ দর্শকের জন্য তা অর্থহীন।
নাংফ্রা একটু থামে। এবার সার্চ করে বাংলায়। ফলাফল শত সহস্র। খবর, ব্লগ, মতামত, সাহিত্য, বিতর্ক, ইতিহাস, ডকুমেন্টারি, আর্কাইভ–অন্তহীন প্রবাহ। তারপর ইংরেজিতে। আরও বিস্তৃত জগৎ খুলে যায় তার সামনে। গবেষণা, জার্নাল, আন্তর্জাতিক আলোচনা, পডকাস্ট–যা কিছু দরকার তার সবই আছে এ ভাষাতে। স্ক্রিনের আলো তার চশমায় প্রতিফলিত। তুলনাটা যথেষ্ট স্পষ্ট। এক ভাষা ভরপুর উপস্থিতির শক্তিতে। আরেকটি ভাষা টিকে আছে সীমিত কিছু নথি, স্মৃতি আর ভিডিওর ফ্রেমে।
এই সার্চ বারের ভেতরেই আজকের ভাষা-বাস্তবতার হিসাব লুকিয়ে আছে। কারণ, ভাষা এখন শুধু মুখে উচ্চারিত শব্দ নয়; ভাষা এখন সার্চ রেজাল্ট, কিবোর্ড লেআউট, ইউনিকোড, ডেটাবেস, অ্যালগরিদম। অনলাইনে দৃশ্যমানতা আজ ভাষিক ক্ষমতার এক নতুন রূপ। দৃশ্যমান ভাষা মানে উদ্ধৃতিযোগ্য ভাষা, সংরক্ষণযোগ্য ভাষা, শেয়ারযোগ্য ভাষা। যে ভাষা সার্চে কম আসে, কনটেন্টে কম ব্যবহৃত হয়, সেটি ধীরে ধীরে জনপরিসর থেকে সরে গিয়ে সীমিত পরিসরে আটকে পড়ে।
ভাষার মাসে যখন আমরা ১৯৫২ সালের শহীদদের স্মরণ করি, তখন আমাদের গর্ব হয়। এই ভূখণ্ড ভাষার মর্যাদার জন্য রক্ত দিয়েছে। সেই ঐতিহাসিক সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। কিন্তু ইতিহাসের সেই নৈতিক অবস্থান আজ নতুন এক প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে: ডিজিটাল যুগে এদেশের সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর ভাষাগুলো কোথায় দাঁড়িয়ে?
বাংলাদেশের ভাষাচিত্র বহুবর্ণ। ৪০টিরও বেশি ভাষা এখানে প্রচলিত। তবু বাস্তবতা হলো, তাদের বড় অংশই প্রজন্মান্তরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে। পরিবারে ব্যবহার কমছে, বিদ্যালয়ে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার কাঠামো সীমিত আর জনপরিসরে বাংলার প্রাধান্য। এই বাস্তবতার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে– ডিজিটাল উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির প্রশ্ন।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাইজেশন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর অধীনে ৪২টি ভাষার ব্যাকরণিক বিষয়আশয়, শব্দভাণ্ডার ও ব্যবহারভিত্তিক বাক্যসমূহের ডাটাসেট তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে সংগৃহীত হয়েছে ১২হাজার ৬৫০ মিনিটের অডিও-ভিজ্যুয়াল ডেটা। এগুলো বাংলা ও ইংরেজিতে অনুবাদ ও এনোটেশন করা হয়েছে। যথাযথ মান বজায় রেখে আইপিএ ট্রান্সক্রিপশনেরও চেষ্টা চলেছে। প্রতিটি ভাষার জন্য ত্রিভাষিক লেক্সিকন তৈরি হয়েছে। মারমা, চাকমা ও ম্রো ভাষাসহ কয়েকটির জন্য ইউনিকোড ডেভেলপ করা হয়েছে। উইন্ডোজ ও অ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক ইউনিভার্সাল কিবোর্ড তৈরি হয়েছে, যাতে ভাষাগুলো ডিজিটাল লেখালেখিতে ব্যবহার করা যায়। ‘এথনোলেন’ নামে একটি ডেটা সংগ্রহ অ্যাপ তৈরি হয়েছে। প্রতিটি ভাষার বিস্তারিত প্রোফাইল প্রস্তুত করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘মাল্টিলিং ক্লাউড’ প্ল্যাটফর্মে এসব উপাদান ডিজিটাল রিপোজিটোরি হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। সেই সঙ্গে সংগৃহীত ভাষিক নমুনাগুলো সংশ্লিষ্ট ভাষার দক্ষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে যাচাই ও ভেলিডেশন করা হয়েছে।
এই উদ্যোগের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কারণ, ভাষা সংরক্ষণ কেবল আবেগের দায় নয়; এটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, পদ্ধতিগত শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগেরও বিষয়।
তবুও এখানেই আলোচনা থেমে থাকে না। ডিজিটাল রিপোজিটোরিতে কোনো ভাষার উপস্থিতি আর তরুণ প্রজন্মের প্রতিদিনকার ডিজিটাল জীবনে সেই ভাষার সক্রিয় ব্যবহার এক জিনিস নয়। সংরক্ষণ ভাষাকে নথিবদ্ধ করে ঠিকই, কিন্তু ভাষাকে জীবিত রাখে তার দৈনন্দিন ব্যবহার।
নাংফ্রা খুমির মতো একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী যদি নিজের ভাষায় টাইপ করতে না পারে, যদি তার ফোনের ডিফল্ট কিবোর্ডে সেই ভাষা না থাকে, যদি অটোকারেক্ট বারবার তার লেখা শব্দ বদলে দেয়, যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ভাষায় লিখলে পাঠক না পায়–তাহলে ভাষাটি ডিজিটাল রিপোজিটরিতে সংরক্ষিত থাকলেও বাস্তবে প্রান্তিকই থেকে যায়। কারণ, একটি ভাষার ইউনিকোড থাকা আর সেটি প্রতিদিনের মেসেজ, স্ট্যাটাস, কমেন্ট, ব্লগ বা ভিডিওর সাবটাইটেলে ব্যবহৃত হওয়া এক বিষয় নয়। তরুণরা যে ভাষায় স্বপ্ন দেখে, প্রতিবাদ করে, প্রেমের কথা লেখে– আখেরে সেই ভাষাই টিকে থাকে।
একটি ভাষা যদি সার্চে কম আসে, কনটেন্টে কম ব্যবহৃত হয়, অনলাইন শিক্ষাসামগ্রীতে অনুপস্থিত থাকে, তবে সেটি ধীরে ধীরে জ্ঞানপ্রবাহের বাইরে সরে যেতে থাকে। তখন সেই ভাষার মানুষ বুঝে যায়, তাদের ভাষার বাস স্মৃতির ভেতর আর অন্য ভাষায় নির্মিত ভবিষ্যৎ।
আবার, একটি ভাষার ইউনিকোড থাকলেই সেটি ব্যবহৃত হবে–এমন নিশ্চয়তা নেই। কিবোর্ড থাকলেই তরুণরা তা ব্যবহার করবে–এমনও নয়। ভাষা তখনই বাঁচে, যখন সেটি অর্থনৈতিক উপযোগিতা ও সামাজিক মর্যাদা পায়। যখন সেটি লোকজ স্মৃতির অংশ না থেকে সমসাময়িক কথোপকথনের অংশ হয়।
আজকের তরুণ প্রজন্মের বড় অংশের ভাষাজগৎ নির্ধারিত হয় ডিজিটাল স্ক্রিনে। ইউটিউব ভিডিও, ফেইসবুক স্ট্যাটাস, ইন্সটাগ্রাম ও টিকটক কনটেন্ট, অনলাইন গেম–এসবের ভেতর যে ভাষা বেশি উপস্থিত, সেটিই সহায়ক ও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। যে ভাষাগুলো এই সব পরিসরে অনুপস্থিত থাকে, প্রজন্মান্তরে সেগুলোর অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
আজকের বিশ্বে প্রযুক্তি নির্ধারণ করে কোন ভাষা শেখা লাভজনক, কোন ভাষায় দক্ষতা অর্জন করলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে, কোন ভাষায় তথ্য সহজলভ্য। একটি ভাষা যদি সফটওয়্যার, সার্চ ইঞ্জিন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অনলাইন শিক্ষা বা ডিজিটাল ব্যবসার ভেতর জায়গা না পায়, তাহলে সেটি ধীরে ধীরে আবেগের ভাষায় পরিণত হয়, কাজের ভাষায় নয়।
সুতরাং প্রশ্নটি সরল হলেও গভীর: আমরা কি বাংলাদেশের বিপন্ন ভাষাগুলোকে কেবল ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে রক্ষা করতে চাই, নাকি সেগুলোকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে চাই, যাতে সেগুলো ডিজিটাল অর্থনীতি, জ্ঞানব্যবস্থা ও জনপরিসরের অংশ হতে পারে? কারণ, ভাষার মর্যাদা তখনই পূর্ণ হয়, যখন সেটি স্মৃতিতে যেমন থাকে, তেমনি প্রযুক্তিতেও থাকে; যখন সেটি ইতিহাসের ভাষা যেমন, তেমনি সম্ভাবনারও ভাষা হয়ে ওঠে।
ডিজিটাইজেশন প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের আদিবাসীদের ভাষাগুলোকে নথিবদ্ধ ও সংরক্ষিত করেছি। ভাষাগুলো এখন ডেটাবেস, প্রোফাইল, ইউনিকোড ও কিবোর্ডে জায়গা পেয়েছে। এটি ভাষা রক্ষার প্রথম ধাপের প্রয়াস।
এখন দরকার দ্বিতীয় ধাপ। সরকারিভাবে সংগৃহীত এইসব ভাষিক উপাত্ত কি সংশ্লিষ্ট ভাষাগুলোর শিক্ষণ কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে? তরুণদের কি নিজের ভাষায় ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে? স্থানীয় ভাষা-সম্প্রদায়ের মধ্যে কি প্রযুক্তিসক্ষম ভাষাচর্চা উৎসাহিত করা হচ্ছে? কেননা, ভাষা বাঁচে ব্যবহারে, আর ব্যবহারের জন্য দরকার মর্যাদা, সুযোগ এবং সহজ প্রযুক্তি।