Published : 05 Mar 2026, 01:17 AM
৬ মার্চ, ১৯৯৯। যশোরের মাটিতে উদীচীর শিল্পী-কর্মীদের রক্তাক্ত দেহ পড়েছিল। বাংলাদেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসে এটি এক অমোচনীয় ক্ষতচিহ্ন। আজও শহীদ পরিবারগুলো সঠিক বিচার পায়নি। উদীচী দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক চর্চা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও গণমানুষের সংগঠন হিসেবে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছে। যশোরের ওই হামলা শুধু একটি সংগঠনের ওপর আঘাত ছিল না; এটি ছিল বাংলাদেশের সমগ্র প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ধারার ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ। গান, নাটক, কবিতা ও শিল্পের মাধ্যমে যারা অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা করেন, তাদের কণ্ঠরোধ করার এক ভয়াবহ বার্তা।
মৌলবাদী শক্তি বরাবরই সংস্কৃতিকে তাদের মতাদর্শের প্রধান শত্রু হিসেবে দেখেছে। কারণ, সংস্কৃতি মানুষের চিন্তাশক্তি, প্রশ্ন করার সাহস ও মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলে। উদীচীর মতো সংগঠন যখন গণসংগীত, পথনাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে ধর্মান্ধতা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন মৌলবাদী রাজনীতির ভিত্তিতে টান পড়ে। তাই ওই হামলা ছিল সাংস্কৃতিক সংগ্রামকে স্তব্ধ করার সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
হামলার পর দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক চলছে। উদীচী কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন নয়। তবু যারাই ক্ষমতার মসনদে বসেছেন, কেউই শহীদদের পরিবারকে ন্যায়বিচার দিতে পারেননি। এই দীর্ঘসূত্রতা শুধু ভুক্তভোগীদের প্রতি অবিচার নয়, সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা দেয়। সাংস্কৃতিক কর্মীরা বারবার দাবি করেছেন, এই হামলার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ন্যায়বিচার শুধু দোষীদের শাস্তি নয়; এটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সাংস্কৃতিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।
বোমা হামলার পরও উদীচী ও অন্যান্য প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন তাদের কার্যক্রম বন্ধ করেনি। বরং আরও দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে গেছে। সংস্কৃতির ওপর যতবার আঘাত এসেছে, প্রতিবারই তা নতুন শক্তি নিয়ে ফিরে এসেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, গণআন্দোলন ও স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে সংস্কৃতির ভূমিকা ছিল অপরিসীম। তাই সাংস্কৃতিক সংগ্রাম থামিয়ে দেওয়া অসম্ভব। এটি শুধু শিল্পচর্চা নয়, এটি মানুষের আত্মপরিচয় ও মুক্তচিন্তার লড়াই।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনে বোমা হামলা ছিল প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক চেতনার বিরুদ্ধে মৌলবাদী চক্রান্তের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে সহিংসতা কখনো সংস্কৃতিকে স্তব্ধ করতে পারেনি। প্রতিটি আঘাত বরং গণমানুষের সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের শক্তিকে আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
উদীচী একটি গণতান্ত্রিক সংগঠন। এর পরিচালনা পদ্ধতি থেকে শুরু করে নেতৃত্ব নির্বাচন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা অনুসরণ করা হয়। উদীচী বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও মুক্তচিন্তার ধারাকে শক্তিশালী করে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। গান, নাটক, কবিতা, লোকসংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার মাধ্যমে সমাজে সচেতনতা তৈরি করার যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, তা শুধু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নয়, এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনারও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই ধারা বারবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। উগ্রবাদী ও মৌলবাদী শক্তি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে যাতে সমাজে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয় এবং প্রগতিশীল কণ্ঠ দুর্বল হয়। ২০০৫ সালে নেত্রকোনায় উদীচীর কার্যালয়ে বোমা হামলা সাংস্কৃতিক পরিসরে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। স্থানীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে দুর্বল করার জন্য এ ধরনের আক্রমণ অনেক সময় পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়েছে বলে সাংস্কৃতিক কর্মীরা মনে করেন। এতে বোঝা যায় যে, এই আক্রমণ শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়; সারাদেশেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা।
এ ধরনের হামলার আরেকটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হলো পহেলা বৈশাখে বোমা হামলা, যেখানে ছায়ানট আয়োজিত নববর্ষের সাংস্কৃতিক আয়োজন লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশের অন্যতম অসাম্প্রদায়িক উৎসব। এই অনুষ্ঠানে হামলা ছিল মূলত বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর আঘাত। এর মাধ্যমে উগ্রবাদী শক্তি বোঝাতে চেয়েছিল যে তারা উৎসব, সংস্কৃতি ও গণজাগরণ সবকিছুকেই স্তব্ধ করতে চায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও দেখা গিয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্য হুমকি ও হামলার ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণা চালিয়ে কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠী প্রকাশ্যে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর নাম ঘোষণা করে আক্রমণের কথা বলেছে। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকায় উদীচীর কার্যালয়, ছায়ানট ভবনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। একইসময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত সংবাদপত্র অফিসগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়, যার মধ্যে প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টার-এর অফিসে হামলার ঘটনাও ঘটেছে যা পরিকল্পিত। এসব ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে আক্রমণের মুখে ফেলেছে।
এসব হামলার পেছনে একই প্রবণতা লক্ষণীয়, অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চর্চাকে লক্ষ্যবস্তু করা, আগে থেকে উসকানিমূলক প্রচারণা চালানো এবং সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পী, লেখক ও গণমাধ্যমকে একসঙ্গে চাপে ফেলা। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস অন্য কথা বলে। যতবার সংস্কৃতির ওপর আঘাত এসেছে, ততবারই তা নতুন প্রাণশক্তি নিয়ে ফিরে এসেছে। উদীচী, ছায়ানটসহ সকল সংগঠন আজও অটুট। নতুন প্রজন্মের শিল্পী ও কর্মীরা এই ধারাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলার ইতিহাস শুধু সহিংসতার ইতিহাস নয়; এটি প্রতিরোধ ও পুনর্জাগরণের ইতিহাস। এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সংস্কৃতি মানুষের চেতনা, স্বাধীনতা ও মানবিকতার লড়াই। আর ওই লড়াইয়ের পথেই উদীচী জাতিকে বারবার নতুন দিশা দেখিয়ে চলেছে।