Published : 09 May 2026, 04:29 PM
শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে বিশ্বে নানা মুনির নানা মত থাকলেও যে মতটি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে, তা হলো মানুষের নৈতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে তার দ্বিতীয় জন্ম লাভ। মানুষের সমাজ মানেই হলো ওই সমাজ যেখানে জ্ঞান প্রজন্মের পর প্রজন্ম হস্তান্তরিত হয়। অন্য প্রাণীর দক্ষতা বা বৈশিষ্ট্য জেনেটিক প্রক্রিয়ায় ডিএনএ-এর মাধ্যমে স্থানান্তরিত হলেও মানুষের শিক্ষার বৃহত্তর অংশটিই হস্তান্তরিত হয় পারিবারিক ও সামাজিক প্রক্রিয়ায়। যে প্রক্রিয়াটি আধুনিককালে আরেক ধাপ বিকশিত হয়ে শিক্ষা প্রদানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। একইসঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিক প্রক্রিয়াটিও বহাল রেখে।
নানা মুনির নানা মতের বাইরেও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে বাংলার সাধারণ মানুষের শিক্ষা সম্পর্কিত ধারণা। শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বাংলার সাধারণ মানুষ যা বোঝে, তা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী-গুণীদের মতের সঙ্গে অভিন্ন। তবে মধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং লুণ্ঠনভিত্তিক পুঁজিবাদী মাৎস্যন্যায় সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার ওই মহান লোকজ দর্শনের বিচ্যুতি ঘটছে। ওই দর্শনটি হচ্ছে ‘মানুষ হওয়া’।
মানুষ হওয়া কী? বাংলার লোকজ ধারণা অনুযায়ী যার মান ও হুঁশ আছে সেই মানুষ। ‘মান’ শব্দটি সংস্কৃত ‘মনু’ ও ইংরেজি ‘ম্যান’ শব্দের অনুরূপ। এর সঙ্গে হুঁশ অর্থাৎ সচেতনতা বা বিবেক যুক্ত হলে তবে মানুষ হয়। সাধারণ মানুষ এভাবেই তা বিশ্বাস ও প্রকাশ করে। বাঙালি ভাষাতত্ত্ববিদ কলিম খানও তেমনই মনে করেছেন। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আক্ষেপ করে লিখেছেন, “সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী/ রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ কর নি।” এখানে মানুষ না করা বলতে কবি বাঙালির দক্ষ, যুগোপযোগী, স্বনির্ভর ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন না হওয়া বুঝিয়েছেন।
আবার কারও আচরণে নৈতিক ঘাটতি দেখা গেলে যে কোনো বাঙালি ক্ষুব্ধস্বরে বলে ওঠেন, ‘লোকটা মানুষ না।’ কিংবা তাকে ‘অমানুষ’ বলেন যা একটা গালির মতো। স্পষ্টতই বাংলাভাষী মানুষের কাছে ‘মানুষ’ শব্দটির বিশেষ ব্যঞ্জনা ও ব্যাপ্তি রয়েছে। এখানে মানুষ কেবলমাত্র জীববৈজ্ঞানিক হোমো সেপিয়েন্স নয়; বরং এটি হলো শিক্ষা ও দীক্ষার মাধ্যমে মনুষ্যত্ব লাভ করা। মনুষ্যত্ব মানে বিবেক, নীতিনৈতিকতা, সচেতনতা, আদর্শবাদিতা, মানসিক বিকাশ লাভ ইত্যাদি।
শিক্ষার এই লোকজ ধারণার ফলেই অতীতে মা-বাবা সন্তানকে শিক্ষকের হাতে তুলে দিয়ে বলতেন ‘মানুষ করে দিতে’। এমনকি শিক্ষকের কাছে তাদের এমন নির্দয় আবেদনও ছিল, “এই ছেলের গায়ের মাংস আপনার, আর হাড্ডিগুলো আমার।” এই কথার অর্থ নিষ্ঠুরতা ছিল না; বরং শিক্ষক ও অভিভাবক উভয়েই ধরে নিতেন যে মনুষ্যত্ব অর্জনের জন্য অর্থাৎ সততা, নিষ্ঠা, আদর্শ, নৈতিকতা, বিবেকবোধ এসব গুণ লাভের জন্য যা কিছু করণীয় তাই যেন করা হয়। অর্থাৎ, মানুষ হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলার শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ কোনো আপস করতে রাজি ছিল না।
যতীন সরকার তার ‘শিক্ষাবিষয়ক প্রবন্ধ’ গ্রন্থে (ভূমিকা প্রকাশনী, ২০১৫) লিখেছেন, “... বাঙালি জাতি মানুষ হওয়াকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। মানুষ যে কেবল জন্মসূত্রেই মানুষ হয় না, কর্ম ও সাধনার মধ্য দিয়ে যে তাকে মানুষ হয়ে উঠতে হয়—এ কথাটা বাঙালি জানে, এবং পৃথিবীর অন্যসব জাতির চেয়ে ভালোভাবে জানে। সে কারণেই অন্য জাতির ভাষায় ‘মানুষ হওয়া’ বা ‘মানুষ হও’-এর মতো কথার প্রচলন নেই, বাঙালির আছে। এর জন্য বাঙালি হিসেবে নিশ্চয়ই আমরা গর্ব করতে পারি।”
অন্তত গর্ব করতে পারার কথা ছিল, কিন্তু তা হয়নি। এই না পারার কারণ সাধারণ মানুষ নন, অসাধারণেরা, যারা সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষাদীক্ষাসহ সবরকম ভাগ্য নির্ধারণ করে থাকেন। মানুষ হওয়া সম্পর্কে তখনকার অক্ষরজ্ঞানহীন (অশিক্ষিত নয়) বা আধাঅক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন (অর্ধশিক্ষিত নয়) বাবা-মা যা বুঝতেন তা আসলেই এত বড় ও কাঙ্ক্ষিত যে আপসের কোনো প্রশ্নই আসে না। ছেলেমেয়েকে মানুষ করার এই সর্বাত্মক আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ হচ্ছে গুরুর কাছে ওই আবেদন। শিক্ষা যেহেতু দ্বিতীয় জন্মলাভ যা ব্যতীত কোনো মনুষ্য সন্তানের পক্ষে প্রাণী সত্তা থেকে উত্তরণ করে মনুষ্যত্ব অর্জন করা সম্ভব না বলে তারা মনে করতেন, তাই ওই আকাঙ্ক্ষা।
কিন্তু শিক্ষা সম্পর্কে এই গভীর লোকজ দর্শন অপসরিত হতে থাকে অন্য একটি ঔপনিবেশিক কুদর্শন দ্বারা: লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়ায় চড়ে সে। ব্রিটিশ প্রবর্তিত আমাদের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় এই সুবিধাবাদী মধ্যবিত্তীয় দৃষ্টিভঙ্গিই ধীরে ধীরে জয়লাভ করতে থাকে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আর মানুষ তৈরির ক্ষেত্র থাকে না, তা হয়ে উঠতে থাকে ‘ম্যান’ তৈরির কারখানায়। এই বিষবৃক্ষের গোড়ায় পানি ঢেলে তাকে বিরাট করে তুলতে ভূমিকা রাখেন আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত (অর্থাৎ অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন) বাবা-মা কিংবা অভিভাবকেরা, অনেকাংশে শিক্ষকদের সহযোগিতায়।
অর্থাৎ আমাদের জনসাধারণের মনে শিক্ষার উদ্দেশ্য যখন মানুষ হওয়া, আমাদের নীতিনির্ধারকদের মনে তখন ‘ম্যান’ তৈরির আকাঙ্ক্ষা দানা বেঁধে উঠতে থাকে। লক্ষণীয় যে, শিক্ষায় বাংলার চেয়ে ইংরেজি বেশি আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। বাবা-মা প্যারেন্টস হয়ে যান, শিক্ষক হন টিচার ও শিক্ষার্থী মানুষ হওয়ার প্রয়োজন ফেলে ‘ম্যান’ হওয়ার দৌড়ে লিপ্ত হয়। বিষয়টা কেবল শব্দের ইংরেজি-বাংলার পার্থক্যে সীমাবদ্ধ না। শুদ্ধ বাংলা বলতে ও লিখতে পারার চেয়ে অশুদ্ধ ইংরেজি লেখা আমাদের কাছে বেশি গর্বের বিষয় ওঠে। মাতৃভাষা গুরুত্ব হারিয়ে ফেললে শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এমনিতেই পরিবর্তিত হয়ে যায়। উদ্দেশ্য মানুষ থেকে বদলে ম্যান হওয়ার লক্ষ্যের মাঝে হারিয়ে যায়। পুরো ব্যবস্থার এ সেই প্রতীকী চিত্র।
তার মানে এই নয় যে, যে সব ভাষায় ম্যান মানে মানুষ, সেসব দেশে বুঝি শিক্ষায় মানুষ তৈরি হয় না! বরং উল্টোটাই সত্য। কারণ সেখানে শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ম্যান তৈরি নয়, বরং শিশুদের নীতিনৈতিকতা ও বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। শিক্ষার লক্ষ্য সেখানেও তাই আমাদের সাধারণ মানুষ যাকে বলে মানুষ হওয়া। ইংরেজিতে ম্যান শব্দ পুরুষবাচক, যেখানে নারী বাদ, অতএব এই অসুবিধা বাস্তবসম্মত। আপস হিসেবে তারা অনেকে এখন ‘হিউম্যান’ ব্যবহার করেন যাতে বৈষম্যহীনভাবে নারী-পুরুষ উভয়কে বোঝানো যায়। হিউম্যানিটি শব্দের মাঝেও মনুষ্যত্বের অনেক অর্থ নিহিত আছে। ইনহিউম্যানিটি একইভাবে মনুষ্যত্বহীনতা বোঝায়। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত বঙ্গীয় শব্দকোষে ‘মানুষ হওয়া’ বলতে ‘মনুষ্যোচিত গুণসম্পন্ন হওয়া’ লেখা হয়েছে। হিউম্যানিটিতে এই অর্থ থাকলেও ‘ম্যান’ হওয়া বলতে পুরুষ মানুষ হওয়া ছাড়া কিছুই বোঝায় না। আর ম্যান বা পুরুষ মানুষ হওয়ার মাঝে এক আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা জড়িত।
আমাদের বাবা-মা তাই সন্তানকে ‘মানুষ হও’ বলে দোয়া করলেও ইংরেজ বাবা-মায়েরা বলতে পারেন না যে, বড় হয়ে ‘ম্যান হও’। এ কথা ছেলেদের বললে অর্থহীন হবে, আর মেয়েদের জন্য হাস্যকর। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ওই মহৎ লোকজ দর্শন থেকে সরে গিয়ে পশ্চিমাদের উদ্ভট অনুকরণে ম্যান তৈরিতে পর্যবসিত হয়েছে। এই অনুকরণ দেখে তারাও হাসি চেপে রাখতে পারছেন না। নিজের ভাষা ও মানসসম্পদ ফেলে দিয়ে বিদেশেরটা নকল করতে গেলে এর চেয়ে ভাল ফল হওয়ার কথাও না।
শহিদুল ইসলাম তার শিক্ষাভাবনা (জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ২০১৬) গ্রন্থে লিখেছেন, “শিক্ষার দুটি লক্ষ্য থাকে। একটা নিম্নতর এবং অন্যটি উচ্চতর। নিম্নতর লক্ষ্য হলো স্থূল, ব্যবহারিক, জীবিকা অর্জনের লক্ষ্য। উচ্চতর লক্ষ্য শিক্ষার সংস্কৃতিগত দিক, আদর্শের দিক। প্রথম লক্ষ্যটি যেমন মানুষকে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্যে উৎসাহ যোগায়, দ্বিতীয় লক্ষ্যটি তেমনি তার সাংস্কৃতিক মান, চিন্তার মান উন্নততর স্তরের দিকে প্রবাহিত করে। প্রথমটির সঙ্গে দ্বিতীয়টির কোনো বিরোধ নেই। একটি অন্যটির পরিপূরক।” এরপর তিনি মুস্তাফা নূরউল ইসলামকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, “ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থায় এইটেই স্বাভাবিক যে, সেখানে শিক্ষার ব্যবহারিক দিকটাই থাকবে, উচ্চতর কোনো লক্ষ্য থাকবে না। কেরানিকর্মচারি থাকবে, মানুষের মত মানুষ থাকবে না। আমাদের শিক্ষা মূলত ঔ্পনিবেশিক শিক্ষা। তার কাছে লক্ষ্য ডিগ্রি, চরম লক্ষ্য চাকরি।”
আমরা বলতে পারি এখনকার শিক্ষার লক্ষ্য ‘ম্যান’ হওয়া, মানুষের মত মানুষ হওয়া নয়। অথচ বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে শিক্ষার আগাগোড়া লক্ষ্য মানুষ হওয়া। অন্যদিকে রাষ্ট্র বানাচ্ছে লক্ষ লক্ষ ‘ম্যান’, বৈশ্বিক বাজারের জন্য, মানবতার জয়ের জন্য নয়। তার মাঝেও যে কেউ কেউ মানুষ হয়ে ওঠেন, আর অনেকেই মানুষ হয়ে উঠতে চান, সেটাই এখনও শেষ ভরসা।