Published : 26 Oct 2025, 05:36 PM
বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির জীবন্ত নিদর্শন হল এর অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও নগর রূপ। তবে এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্য আজ চরম সংকটের মুখে। একদিকে যখন বাংলাদেশের তিনটি স্থান বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, অন্যদিকে রাজধানী ঢাকার পুরনো অংশসহ সারা দেশের শত শত ঐতিহাসিক স্থাপনা অবহেলা, সংরক্ষণের অভাব এবং উন্নয়নের নামে ধ্বংসের মুখোমুখি।
ঢাকা শুধু একটি নগর নয়; এটি বাংলার হৃদয়, একটি জীবন্ত ইতিহাসগ্রন্থ। হাজার বছরের বেশি পুরনো এই শহর তার সরু গলিপথ, প্রাসাদ, মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও বসতবাড়ির স্থাপত্যে ধারণ করে আছে সেন, সুলতানি, মুঘল, ঔপনিবেশিক এবং দেশীয় স্থাপত্যের অনন্য সমন্বয়। তবু আজ এই শহর তার ঐতিহাসিক পরিচয় রক্ষার সংগ্রামে নিঃস্বপ্রায়। আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, ঢাকা গেইট ও কলম্বো সাহেবের সমাধির মত কিছু নিদর্শন সংরক্ষণের মাধ্যমে নতুন জীবন পেয়েছে; কিন্তু শত শত অন্য ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা দখল, অবহেলা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
সম্প্রতি ওয়ারী খ্রিষ্টান কবরস্থানে কলম্বো সাহেবের ঐতিহাসিক সমাধির সফল পুনরুদ্ধার প্রকল্প এক নতুন আশার আলো দেখিয়েছে। ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর সিমেটারিজ ইন সাউথ এশিয়া (বিএসিএসএ) এবং কমনওয়েলথ হেরিটেজ ফোরামের অর্থায়নে সম্পন্ন এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে যে যথাযথ উদ্যোগ ও সহযোগিতা থাকলে ঐতিহ্য সংরক্ষণ সম্ভব। এই কবরস্থানে শায়িত আছেন ঢাকার প্রশাসন, বাণিজ্য ও উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত বহু বিদেশি নাগরিক—পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসি, ব্রিটিশ, আমেরিকান, চীনা ও আর্মেনিয়ান—যাদের জন্য নির্মিত হয়েছে নানান শৈলীর সমাধি স্থাপনা। দীর্ঘদিনের অবহেলায় পরিত্যক্ত এই সমাধিক্ষেত্র সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত হলে এটি পরিণত হতে পারে ঢাকার একমাত্র ঐতিহ্যনির্ভর সাংস্কৃতিক উদ্যান হিসেবে।
মুঘল সুবেদার শায়েস্তা খাঁ বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে একটি পূর্ণাঙ্গ দুর্গ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন, যদিও নানা কারণে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ আমলে এটি সিপাহী ব্যারাক হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং বহু স্থাপত্যিক পরিবর্তন আসে, যেগুলোর মধ্যে হাম্মামখানা অন্যতম। আমেরিকান অ্যাম্বাসেডর’স ফান্ডের অর্থায়নে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই স্থাপনাকে তার আদি রূপে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হল, দক্ষিণের শাহ বুরুজ ও পূর্ব পাড়ের বিশাল অংশ দখলদারদের কবলে। দুর্গ দেয়ালের গা ঘেঁষে নির্মিত অবৈধ স্থাপনাগুলোর কারণে এই ঐতিহাসিক দুর্গ আজও ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারছে না।
এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সোনারগাঁর বড় সরদারবাড়ি। কোরিয়ান শিল্পপতি কিহাক সাংয়ের সহযোগিতায় এই ভবনসমষ্টি সংরক্ষিত হয়েছে ইয়াংওয়ান করপোরেশনের সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) আওতায়। আটটি ভবনের এই কমপ্লেক্স বাংলার প্রায় পাঁচ শত বছরের স্থাপত্য
ঐতিহ্যের ধারাবাহিক প্রতিচ্ছবি। এমনকি পুরো পানাম নগর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিতে চাচ্ছেন এই শিল্পপতি। এই বেসরকারি উদ্যোগ শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের উদাহরণ নয়, বরং বাংলাদেশের অন্যান্য শিল্পপতিকেও ঐতিহ্য সংরক্ষণে উৎসাহিত করবে।
সরকারের সুরক্ষা সেবা বিভাগ ঢাকার প্রাচীন আফগান দুর্গ; যা পরে কেন্দ্রীয় কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল—এর সংরক্ষণকাজ শুরু করেছে।
কারাগার স্থানান্তরের পর এলাকা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ছিল। সংস্কার শেষে এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং নাগরিক অভিজ্ঞতার নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। মানুষ এখানে ঐতিহাসিক সেলগুলোতে অবস্থান করে সেই সময়ের কারাজীবনের অভিজ্ঞতা নিতে পারবে, দেখতে পাবে ঢাকার প্রত্নসম্পদ ও স্থাপত্যের বিবর্তন। একই সঙ্গে এই বৃহৎ সবুজ এলাকা পরিণত হবে পুরান ঢাকার ‘ফুসফুস’ হিসেবে।
অন্যদিকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে টিকাটুলীর রোজ গার্ডেনের সংস্কারকাজও সম্প্রতি শেষ হয়েছে। ঋষিকেশ দাশ শ্রেণিবৈষম্যের প্রতিবাদে এই ভবন নির্মাণ করেন—বলধা গার্ডেনে প্রবেশাধিকার না পাওয়ায় ক্ষোভে তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব বাগানবাড়ি—‘রোজ গার্ডেন’। এর প্রাসাদ ও গোলাপের বাগান আজ ঢাকার ইতিহাসে এক স্মারক অধ্যায়, যেখানে একসময় বেঙ্গল স্টুডিওর জন্ম হয়েছিল। সংস্কার শেষে এই ভবনে আবারও সেই ঐতিহাসিক ব্যবহার ফিরিয়ে আনার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে ঐতিহাসিক নর্থব্রুক ও জনসন হলের সংস্কারকাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণে এবার সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক। তাদের সহায়তায় পরিচালিত ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডেশন প্রজেক্টের অন্যতম আকর্ষণ হল এই দুটি স্থাপনার সংস্কার ও পুনরুজ্জীবন প্রকল্প। কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে ঢাকার ঐতিহ্য রক্ষার ক্ষেত্রে এটি একটি মাইলফলক হয়ে দাঁড়াবে। এতে ভবিষ্যতে ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিশ্ব ব্যাংকসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার আগ্রহ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে সংস্কার কার্যক্রমে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বাধা দেখা দিয়েছে। নর্থব্রুক হল-সংলগ্ন এলাকায় একটি ক্লাব ভবন স্থান সংকুলানের অজুহাতে চারপাশের প্লাজা এলাকা দখলের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে মাঝে মাঝেই সংস্কারকাজ বন্ধ হয়ে পড়ছে, যা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে দাতা সংস্থাগুলো। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবন দুটি সংস্কার শেষে এলাকাটিকে একটি উন্মুক্ত পাবলিক প্লাজা হিসেবে গড়ে তোলা হবে; যেখানে পুরান ঢাকার কোলাহলময় পরিবেশ ও বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ের মধ্যে সরাসরি সংযোগ সৃষ্টি হবে। দক্ষিণ প্লাজাটি হবে পুরান ঢাকাবাসীর উৎসব, মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু। এই উদ্যোগ সফল করতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ঐতিহাসিক ভবনের সামনের অংশে অবস্থিত লঞ্চঘাট বা পন্টুন সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এ বিষয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটিও গঠিত হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, প্রশাসনিক জটিলতা ও লাল ফিতার বাঁধনে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

সীমিত সম্পদ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কিছু উল্লেখযোগ্য সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে এসব সাফল্যের উদাহরণ এখনো ব্যতিক্রম হিসেবেই রয়ে গেছে; সাধারণ বাস্তবতা হল ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর ক্রমাগত অবনতি ও বিলুপ্তির আশঙ্কা। মুঘল আমলের বাণিজ্যিক এলাকার পাশে নদীঘেঁষে গড়ে উঠেছিল ছোট কাটরা ও বড় কাটরা; যা প্রথম দিকে ছিল ভ্রমণকারীদের জন্য মোটেলসদৃশ স্থাপনা, পরবর্তীকালে সুবেদারদের আবাসিক ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মুঘল আমলের আবাসিক স্থাপত্যের একমাত্র জীবন্ত নিদর্শন এই দুটি স্থাপনাই আজ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও দখল করা; তাদের অস্তিত্ব এখন কেবল ধ্বংসাবশেষে সীমাবদ্ধ। প্রতিদিনই চলছে আগ্রাসন, অবৈধ দখল ও ধ্বংসের নতুন পাঁয়তারা।
একইভাবে ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম নিদর্শন রূপলাল হাউসও আজ অবৈধ দখলকারীদের দখলে। তবে আশার আলো এখনো নিভে যায়নি; কারণ, ভবনের দোতলায় বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি ইউনিট সরকারি ব্যবস্থাপনায় অবস্থান করছে, যা স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ভবনের সামনের ও পেছনের অংশজুড়ে রয়েছে অবৈধ মশলার গুদাম।
যদি যথাযথ সংরক্ষণ এবং পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে রূপলাল হাউসকে ‘মশলা জাদুঘর’ ও গণপরিসর হিসেবে রূপান্তর করা যেত, তাহলে এটি ঢাকার বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও পুনরুজ্জীবিত হতে পারত।
১৯৮২ সালে তৎকালীন সরকার যে উদ্যোগে আহসান মঞ্জিল উদ্ধার ও সংস্কার করেছিল, সেটি ছিল বাংলাদেশের সংরক্ষণ ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ; যা স্থাপত্যবিশেষজ্ঞদের মতে দেশের প্রথম সফল সংরক্ষণ প্রকল্প। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় অনেকে আশাবাদী হয়েছিলেন যে এবার হয়তো বড় কাটরা, ছোট কাটরা এবং রূপলাল হাউসও একইভাবে উদ্ধার ও সংরক্ষিত হবে। কিন্তু সেই আশার প্রতিফলন এখনো ঘটেনি।
এসব গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক স্থাপনার পাশাপাশি পুরান ঢাকার অলিগলিজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী আবাসিক ভবন ও স্থান। দ্রুত নগরায়ণ, জমির দুষ্প্রাপ্যতা এবং ভূমিমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। আর্থিক প্রণোদনার অভাবে অনেক মালিকই তাদের পুরনো সম্পত্তি ভেঙে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। ফলে প্রায়ই দেখা যায়, যেকোনো সরকারি ছুটি বা অবকাশের সুযোগে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কোনো ভবনকে ঘিরে ধ্বংসযজ্ঞের খবর প্রকাশ পায়। সম্প্রতি শতবর্ষী মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন স্মৃতি ভবন ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে, যা এক গভীর সাংস্কৃতিক ক্ষতির ইঙ্গিত দেয়। একই সময়ে নারিন্দার প্রথম পয়ঃনিষ্কাশন পাম্পিং স্টেশন—ঢাকার আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সূচনালগ্নের এক ঐতিহাসিক স্থাপনা—সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। তদ্রূপ, টিপু সুলতান রোডের শঙ্খনিধি হাউসের মন্দির অংশটি ভেঙে সেখানে এখন গাড়ির গ্যারেজ স্থাপন করা হয়েছে।
পুরান ঢাকায় ঐতিহ্য সংরক্ষণ বনাম নগর উন্নয়নের দ্বন্দ্ব এখন এক গভীর ও আলোচিত সংকটে পরিণত হয়েছে। এই সংকটের মূল কারণ, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য সমাধান এবং তার উত্তরণের পথ নির্ধারণ করাই আজ জরুরি। কারণ, সঠিক নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগই পারে এই মহানগরের ঐতিহাসিক স্বকীয়তা রক্ষা করতে, পাশাপাশি অর্থনীতির গতিশীলতাও বজায় রাখতে। এই সংকট উত্তরণের জন্য চিহ্নিত করতে হবে মূল চ্যালেঞ্জগুলো—
ক) প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও আইনের সীমাবদ্ধতা: ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং বিদ্যমান আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা এখন বড় প্রতিবন্ধক। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর অ্যান্টিকুইটিস অ্যাক্টের আওতায় এখন পর্যন্ত মাত্র ৩০টি স্থাপনাকে চিহ্নিত ও সংরক্ষণের আওতায় নিয়েছে। অন্যদিকে রাজউক তার বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট অনুযায়ী মাত্র ৭৪টি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাকে তালিকাভুক্তির পর গেজেট করেছে।
২০১৮ সালের হাইকোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে ইউএসজি তালিকাভুক্ত ২,২০০টি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাকে সুরক্ষার নির্দেশ দেওয়ার সাত বছর পেরিয়ে গেলেও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এখনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।
২০২০ সালে রাজউক কর্তৃক ঘোষিত নতুন ড্যাপের আওতা বিস্তৃত করে সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও বিরুলিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এই সমগ্র অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর তালিকা না থাকায় ঐতিহ্য সংরক্ষণ কার্যত আইনগতভাবে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে ঢাকার অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী ভবন সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত না হওয়ায় সেগুলো রক্ষার কোনো কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেই।
খ) মালিকানার জটিলতা: বেসরকারি মালিকানাধীন এবং ঔপনিবেশিক যুগের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর ক্ষেত্রে মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতা একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শাঁখারীবাজার এলাকার অনেক ভবনে প্রায় প্রতিটি কক্ষের আলাদা মালিক রয়েছেন। আদি মালিকেরা দেশভাগের সময় ভারতে চলে যাওয়ায় পরবর্তীকালে বিভিন্ন হস্তান্তর ও উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, যা অর্পিত সম্পত্তি আইন দিয়েও পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব হয়নি। এমন জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহায়তাও কাজে লাগানো যায়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমেরিকান অ্যাম্বাসেডর’স ফান্ড থেকে আর্থিক সহায়তা পাওয়া সত্ত্বেও সংস্কারকাজ শুরু করা যায়নি; ফলে পুরো অর্থ ফেরত দিতে হয়েছে। এটি ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার এক স্পষ্ট উদাহরণ।
গ) আর্থিক প্রণোদনার অভাব: ঐতিহ্য সংরক্ষণে সবচেয়ে বড় বাধা হল আর্থিক প্রণোদনার অভাব। কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা বা প্রণোদনা না থাকলে বেসরকারি মালিকেরা তাদের পুরনো স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলে নতুন ভবন নির্মাণে আগ্রহী হবেন, এটাই স্বাভাবিক। বাজারের শক্তি ও জমির চাহিদা এতটাই প্রবল যে, শুধু আইন বা ডেভেলপমেন্ট কন্ট্রোল দিয়ে তা রোধ করা সম্ভব নয়।
২০২০ সালের বিএনবিসিতে (বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড) স্পষ্টভাবে টিডিআরের (ট্রান্সফার অব
ডেভেলপমেন্ট রাইটস) উল্লেখ থাকলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি। এমনকি ঐতিহ্য সংরক্ষিত ভবনের মালিকদের জন্য কর মওকুফ (ট্যাক্স এক্সেমশন) বা অন্যান্য আর্থিক সুবিধাও চালু করা হয়নি।
টিডিআর কার্যকর করার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী ভবনের ক্ষতিগ্রস্ত মালিকদের একটি স্বচ্ছ তালিকা প্রণয়ন করা উচিত, যাতে তারা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। রাজউক যদিও ড্যাপে ঐতিহ্যবাহী ভবনের চারপাশে সংরক্ষিত এলাকার উচ্চতাসংক্রান্ত বিধান ও ডেভেলপমেন্ট কন্ট্রোল প্রবর্তন করেছে, তবু পর্যটনবান্ধব ভূমি ব্যবহার আইন প্রয়োগ করা হয়নি। ফলে ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আর্থিক প্রণোদনার অভাবেই ঢাকা শহর প্রতিনিয়ত তার একের পর এক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হারিয়ে ফেলছে, যা শুধু ইতিহাস নয়, জাতির পরিচয়কেও বিপন্ন করছে।
ঘ) সচেতনতা ও শিক্ষার অভাব: ঐতিহ্য সংরক্ষণে আমাদের সমাজে সচেতনতা ও শিক্ষার অভাব স্পষ্ট। সাধারণ মানুষ প্রায়ই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও বস্তুসমূহের মূল্য সম্পর্কে অবহিত নয়। যখন কোনো কিছুর মূল্য কেবল অর্থনৈতিক মানদণ্ডে নির্ধারিত হয়, তখন তারা অধিক লাভজনক বিকল্পের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়; বিশেষ করে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে, স্থাপত্য ঐতিহ্যের ইতিহাস এবং তার সাংস্কৃতিক মূল্য সম্পর্কে কোনো কার্যকর সচেতনতা গড়ে তোলার ব্যবস্থা নেই। ফলে বড় হয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দৌড়ে জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক চেতনা পিছিয়ে পড়ে। এই কারণে ঐতিহ্য সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বা নিজস্ব উদ্যোগও প্রায় অনুপস্থিত।
এমনকি স্থাপত্য শিক্ষায়ও ঐতিহ্যের গুরুত্ব যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে পেশাগত বাস্তবতায় অনেক স্থপতি ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণের পরিবর্তে সেগুলো ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণে বেশি আগ্রহ দেখান। উদাহরণস্বরূপ, ফার্মগেট এলাকার খামারবাড়িতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সারিবদ্ধ দোতলা বাংলো ঘরগুলো—যেসব ঢাকার ঔপনিবেশিক যুগের মূল্যবান স্থাপত্য ঐতিহ্য—সেগুলোর স্থানে নতুন স্থাপনা নির্মাণে স্থপতিরা কোনো দ্বিধা করেননি।
সংকট উত্তরণের পথ: ঐতিহ্য সংরক্ষণে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও পর্যটন মন্ত্রণালয়—এই চারটির কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে একটি জাতীয় ‘হেরিটেজ ম্যানেজমেন্ট পলিসি’ প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এর আওতায় সাংবিধানিকভাবে একটি ‘হেরিটেজ কমিশন’ গঠন করা উচিত, যেখানে সংরক্ষণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ স্থপতি, প্রত্নতত্ত্ববিদ, শিল্পী, সমাজবিজ্ঞানী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি থাকবেন। ওই কমিশনের কাজ হবে তালিকাভুক্তি, সংরক্ষণ, অর্থায়ন, ব্যবস্থাপনা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি। একই সঙ্গে কমিশন গঠনের আগ পর্যন্ত সব হেরিটেজ ভবন অপসারণ বা ধ্বংসের ওপর তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ শুধু সরকারের নয়, এটি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। আমরা যদি আমাদের ঐতিহ্যকে আজ অবহেলা করি, তবে আগামী প্রজন্ম একটি পরিচয়হীন শহর পাবে, যেখানে ইতিহাসের সঙ্গে তাদের কোনো সংযোগ থাকবে না। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো শুধু ইট-পাথরের গাঁথুনি নয়, এগুলো আমাদের সামষ্টিক স্মৃতি, সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ও নাগরিক পরিচয়ের প্রতীক। প্রতিটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনার সঙ্গে হারাচ্ছি আমাদের স্থাপত্যিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায়। অতএব, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই নগরের ঐতিহ্য সংরক্ষণে এখনই কার্যকর, স্বচ্ছ ও মানবিক পদক্ষেপ নিতে হবে; যেন ঢাকা তার স্বকীয়তা হারিয়ে না ফেলে, বরং পুনরায় হয়ে ওঠে আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের জীবন্ত প্রতীক।