Published : 25 Oct 2025, 06:18 PM
রবীন্দ্রসংগীতের সুরে বেড়ে উঠেছিলাম, কিন্তু সময়ের নিষেধাজ্ঞা, রাষ্ট্রের বাধা, আর ভাগ্যের ইশারা আমাকে টেনে নেয় আধুনিক গানের পথে। সেজ চাচা আবু হায়দারের হাত ধরে আমার সংগীতজীবনের সূচনা, পরে সংগীতজ্ঞ আজাদ রহমান ও নায়করাজ রাজ্জাকের মত মানুষদের সান্নিধ্যে সেই যাত্রা পেল গতি। প্রথম সিনেমার গান ‘বন্দী পাখির মত মনটা কেঁদে মরে’ দিয়েই যেন খোলা আকাশে ডানা মেলেছিলাম আমি। সেদিন থেকে শুরু—এক পাখির সুরময় উড়ান, ২০১৫ সাল পর্যন্ত আমি পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে গান করেছি।
বেশ বড়সড় একটা একান্নবর্তী পরিবারে আমার জন্ম। বাবা-চাচারা চার ভাই। আমার জন্মের আগ থেকে দাদা ও বাবা ঢাকায় থাকলেও দাদি ও মা ছিলেন গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার হারুঞ্জা গ্রামে। সেখানেই ১৯৪৬ সালের ১ অগাস্ট আমার জন্ম হয়।
দাদা ছিলেন আজিমপুরের ওয়েস্ট অ্যান্ড হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক। তখনকার সময়ের অত্যন্ত জ্ঞানী ও প্রভাবশালী একজন মানুষ তিনি। বাবা-চাচারা সবাই শিক্ষা নিয়ে সচেতন ছিলেন। বাবা এ এফ তসলিম উদ্দীন আহমেদ ছিলেন ঢাকার নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক, তিনি তার ভাইদের মধ্যে সবার বড়।
আমার মেজ চাচা এ এফ খলিলুর রহমান ছিলেন পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রধান, পরে তিনি বগুড়া মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে অবসরে গিয়েছেন। সেজ চাচা আবু হায়দার সাইদুর রহমান ছিলেন ঢাকা ডেন্টাল কলেজের অধ্যক্ষ। তিনি শুধু চিকিৎসকই নন, গানও লিখতেন। গানের জগতে তিনি ডাক্তার মাস্তানা নামে পরিচিত ছিলেন। ছোট চাচা এ এফ ফজলুর রহমানও ডাক্তার। তিনি শিশুবিশেষজ্ঞ ছিলেন।
আমার গানের জগতে আসা সেজ চাচার মাধ্যমে। পঞ্চাশের দশকে যখন মেডিকেল কলেজে পড়তেন, তখন তারা একদল বন্ধু মিলে সংগীতচর্চা শুরু করেন। এখনকার আনন্দময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সে সময় ‘রয় হাউস’ নামে পরিচিত ছিল। সেখানে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, এমনকি নাচেরও আয়োজন হত চাচাদের উদ্যোগে। মাসে চার দিন তারা ক্লাস নিতেন। মাঝেমধ্যে সেখানে যেতাম আমি, দেখে মুগ্ধ হতাম।
আমি তখন ছোট, ১৯৫৬-৫৭ সালের দিকের কথা। তত দিনে আমার মা আর দাদিসহ পরিবারের সবাই ঢাকায় চলে এসেছে। আমি নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তাম। স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার জন্য যেমন আলাদা শিক্ষক ছিলেন, তেমনি গানের শিক্ষকও ছিলেন। গানের শিক্ষক শেখ আবুল ফজলুল রবীন্দ্রসংগীত শেখাতেন আমাদের। সেজ চাচা আবু হায়দারের কাছেও আমি রবীন্দ্রসংগীত শিখেছি।
ম্যাট্রিক পাস করার পর ভাবতে লাগলাম, কী করব? আমার বন্ধুবান্ধব ইন্টারমিডিয়েট করে কেউ মেডিকেলে, কেউ আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে। আমি তার আগেই সংগীতে থিতু হয়ে গিয়েছি। ইন্টারমিডিয়েটেই ভর্তি হই, উচ্চাঙ্গসংগীতের শিল্পী ওস্তাদ বারীণ মজুমদারের প্রতিষ্ঠান ‘কলেজ অব মিউজিকে’।
ষাটের দশকে সারা দেশের বিভিন্ন স্কুলে গানের প্রতিযোগিতা হত, সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ১৯৬২ ও ১৯৬৩ সালে পরপর দুই বছর সারা দেশের মধ্যে রবীন্দ্রসংগীত ও আধুনিক গানে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলাম।
কলেজ অব মিউজিকে শুধু ইন্টারমিডিয়েট ছিল এবং আমি ছিলাম ওই কলেজের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী। রবীন্দ্রসংগীত ও আধুনিক গানে দুবার প্রথম হওয়া আমাকে সংগীতেই দীক্ষিত করতে চেয়েছিলেন সেজ চাচা। চাচার উৎসাহ না পেলে মিউজিক কলেজে পড়া হত না।
চাচা আসলে তার অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা আমাকে দিয়ে পূর্ণ করতে চেয়েছিলেন। সংগীতচর্চার খুব শখ ছিল আমার এই চাচার। কিন্তু দাদার কারণে সেটা করতে পারেননি। তাই আমাকে দিয়ে সংগীতচর্চা করালেন। দাদা কিন্তু আমার সংগীত শিক্ষাতেও আপত্তি করেছিলেন। বাবা ছিলেন ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ অবস্থানে। এভাবেই আমার সংগীতজীবনের সূচনা হয় চাচার সাহায্যে।

আমি রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি। কিন্তু ১৯৬৫ সালের দিকে পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করে দেয়, ফলে আমাদের চর্চার সেই ধারা থেমে যায়।
এখন নাজিমুদ্দিন রোডের শেখ বোরহানুদ্দীন কলেজে ছিল ইস্ট পাকিস্তানের বেতার কেন্দ্র। সেখানে ‘স্কুল ব্রডকাস্টিং’ নামে ৪৫ মিনিটের একটা অনুষ্ঠান ছিল। শুধু আমাদের স্কুল না, যেখানে বিভিন্ন স্কুলের ছাত্ররা কবিতা, প্রবন্ধ, সংগীত পরিবেশন করত। স্কুলে থাকতে এই অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলাম আমি। কলেজে পড়া অবস্থায় ১৯৬৬ সালের দিকে বেতারে অডিশন দেওয়ার সুযোগ মিলল আমার।
তখন আমাদের এখানে আধুনিক গানের যে চর্চা ছিল, সেটার সঙ্গে আমার খুব পরিচয় একটা ছিল না। তখন খুব জনপ্রিয় একজন শিল্পী ছিলেন খন্দকার ফারুক আহমেদ। তার বাড়ি বগুড়ায়। তাকে বললাম, ‘ভাই, আমার বাড়ি তো আপনার বাড়ির ওইখানে। আমি তো এই দেশের কোনো শিল্পীর গান জানি না। আমারে গান শিখিয়ে দেন কিছু।’ তিনি আমাকে দুই দিনে সাতটা গান শিখিয়ে দিলেন। এইটুকু সম্বল করে আমি অডিশন দিতে যাই।
অডিশন বোর্ডে ছিলেন শিল্পী আব্দুল আহাদ, তিনি রবীন্দ্রসংগীতের বিশেষজ্ঞ। বিচারকদের অন্য দুজন ছিলেন শিল্পী ফেরদৌসী রহমান ও সুরকার সমর দাস। সমর দাসকে এখন অনেকেই ভুলে গেছেন, কিন্তু বাংলাদেশের সংগীতে তার অবদান অপরিসীম।
এর মধ্যে আমি ছায়ানটে উচ্চাঙ্গসংগীত শিখেছি, সেখানে আমার শিক্ষক ছিলেন সুরকার ও শিল্পী আজাদ রহমান। তিনি এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে। ১৯৬৫ সালে ছায়ানটের শিক্ষক ছিলেন আর বেতারে প্রযোজক হিসেবে চাকরি করতেন। তিনিই আমাকে উচ্চাঙ্গসংগীতে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন।
তার সঙ্গে আমার সেজ চাচার সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। সে সময় গান-বাজনা যারা করতেন, তাদের বাড়িভাড়া পাওয়া বেশ কঠিন হত। আমার চাচা তাকে নিজের ভাই পরিচয় দিয়ে বাসা ভাড়া করে দিয়েছিলেন। চাচা একদিন আমাকে তার কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘আমার ভাতিজা গান করে, একটু দেখবেন।’
ছায়ানটে থাকার সময় আমি কয়েক দিন ওনার কাছে উচ্চাঙ্গসংগীত শিখেছি। পুরোটা শিখেছি দাবি করতে পারব না। তার মত উচ্চাঙ্গসংগীতের গুরুর কাছে আরও অনেক শেখার ছিল। ১৯৬৬ বেতারে অডিশনে পাস হওয়ার পর ১৯৬৭ সালে আমার একই দিনে দুইটা গান রেকর্ড হয়।
তখন বিভিন্ন গ্রেডের শিল্পী ছিল, আমি ছিলাম সি-গ্রেডের শিল্পী। সে সময় নিয়ম ছিল, যদি কোনো স্পেশাল গ্রেডের শিল্পী নির্দিষ্ট দিনে না আসতে পারেন, তবে বিশেষ অনুমতি নিয়ে অন্য কাউকে গাইতে দেওয়া হত। আমি তখনো কমার্শিয়াল সার্ভিসে গাওয়ার যোগ্যতা রাখি না। কিন্তু সেই স্পটটা তো খালি যাবে না, তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, আমাকে দিয়ে গান গাওয়ানো হবে।
আজাদ রহমান তখন থেকে আমাকে আধুনিক গানের দিকে প্রস্তুত করতে শুরু করেন। একই দিনে যে দুটি গান গাইলাম, সে দুটিরই সুরকার ছিলেন আজাদ রহমান। এ দুটির একটি সিরাজুল ইসলামের লেখা ‘তোমার দুহাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম, থাকব তোমারি আমি কথা দিলাম…’। অন্য গানটি ছিল জেব-উন-নেসা জামালের লেখা, ‘চঞ্চল দুই নয়নে বলো না কী খুঁজছো, চম্পা না করবী, না পলাশের গুচ্ছ, চঞ্চল দুই নয়নে বলো না কী খুঁজছো...’।
এই গান দুটি প্রকাশের পর গানের ভাগ্য খুলতে থাকে আমার। তখনকার সময়ে এইচএমভির (গ্রামোফোন কোম্পানি) ডিস্কের যে প্লেট, সেটা পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না। রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী কলিম শরাফী এবং আরেকজন ভদ্রমহিলা, যার নাম মনে করতে পারছি না—দুজন মিলে এইচএমভির লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে কাজ করতেন। তাদের কাজ ছিল বেতারে আমাদের শিল্পীদের গান সংগ্রহ করা। আমাদের দেশের শিল্পীদের গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, আধুনিক গান বা পল্লিগীতি—যে গানটি জনপ্রিয়তায় সব থেকে ওপরে থাকত, সেটাকে তারা এইচএমভিতে পাঠাতেন। সেখান থেকে ডিস্ক হয়ে এই দেশে আসত গানটি। আমার ভাগ্য ভালো ছিল, ১৯৬৮ সালে ‘তোমার দুহাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম’ গানটি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের দুই মার্কেটেই বিক্রির দিক থেকে পঞ্চম স্থানে ছিল।
এরপর ১৯৬৯ সালে প্রথম চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার সুযোগ পাই। সিনেমার নাম ‘আগন্তুক’। প্রধান শিল্পী ছিলেন সোহরাব হোসেন, তিনি নজরুলসংগীতের জন্য বিখ্যাত। অত্যন্ত মেধাবী শিল্পী ছিলেন তিনি। আমি আর শ্রীপুরের আব্দুর রব নামের একজন ছিলেন, যিনি পল্লীগীতি গাইতেন। আরও ছিলেন মিয়া মহম্মদ বদরুদ্দিন। এই তিনজন সোহরাব ভাইয়ের গানের সঙ্গে কোরাস করলাম, গানটা ছিল ‘দেখ ভেবে তুই মন, আপন চেয়ে পর ভালো’।
‘আগন্তুক’ সিনেমার সংগীত পরিচালক ছিলেন আজাদ রহমান। ওই গানের রেকর্ডিংয়ের সময় তিনি আমাকে দিয়ে সিনেমার আরেকটি গান গাওয়ানোর কথা চিন্তা করেন। আমার চাচা আবু হায়দারের লেখা, আজাদ রহমানের সুর করা ‘বন্দী পাখির মত মনটা কেঁদে মরে’ গানটি ১০ থেকে ১৫ দিন তিনি আমাকে শেখালেন। তারপর বললেন, তোমাকে সিনেমার জন্য এই গানটা গাইতে হবে। বেতারে তখনো আমি সি-গ্রেডের শিল্পী। আমি যখন গানটা রেকর্ডিংয়ের জন্য যাচ্ছিলাম, বেতারের শিল্পীরা বলছিলেন, ‘আমাদের খুরশীদ আলম চলচ্চিত্রে গান গাইবে।’ তখনকার বেতারে যারা কাজ করতেন, সবার মনমানসিকতা অনেক ভালো ছিল, সর্বান্তঃকরণে একে অন্যের মঙ্গল কামনা করতেন।
বাবুল চৌধুরীর পরিচালনায় ‘আগন্তুক’ সিনেমায় আমার গাওয়া গানটা নায়করাজ রাজ্জাকের ঠোঁটে ফুটে উঠবে। আমি যখন রেকর্ডিংয়ে গেলাম, সিনেমার প্রযোজক আমাকে দেখে আজাদ রহমানকে বললেন, ‘আজাদ, শিল্পী বদলাও।’
আমি তখন ছোট ছিলাম। ইন্টারমিডিয়েট শেষ করেছি। আজাদ রহমান এসেছেন কলকাতা থেকে। ঢাকায় আসার আগেই যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করে ফেলেছিলেন। ওখানে সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেছেন। তখনকার দিনের বিখ্যাত সব শিল্পী—হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় ও মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়—সবাই তার সুরে গান করেছেন।
আজাদ রহমান সাহেব সে সময় প্রযোজককে বলেছিলেন, ‘আমি গলা চিনতে ভুল করি না। এই শিল্পী যদি এই গান না গায়, তাহলে আমি আপনার সিনেমায় সুরকার হিসেবেই থাকব না।’
আজাদ রহমান যে কথা সেদিন বলেছিলেন, এখনকার সময়ে এমন দৃঢ়তা, ত্যাগের এমন ইচ্ছা কেউ দেখাতে পারবেন কি না সন্দেহ আছে। তারপরও প্রযোজক শর্ত দিলেন, গানটা যদি সিনেমায় হিট হয়, তবেই আমি পারিশ্রমিক পাব।
সে সময় নায়করাজ রাজ্জাক তার বাসায় নিয়ে গেলেন আমাকে। পরপর তিন দিন গেলাম তার বাসায়। রাজ্জাক তার স্ত্রী, ছেলে, ড্রাইভার, বাবুর্চি, নিরাপত্তারক্ষী—সবার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। কথা বলিয়ে দিলেন। তিনি কীভাবে কথা বলেন, তিনি কীভাবে হাসেন, কীভাবে রাগেন—সব জানালেন। যাতে আমি বুঝতে পারি, তার ঠোঁটে গানটা কেমন করে মেলাতে হবে।
তারপর গানটা রেকর্ড হয়। সিনেমা মুক্তির পর ‘বন্দী পাখির মত মনটা কেঁদে মরে’ গানটা দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। তারপর আর থেমে থাকতে হয়নি আমার। পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার জীবনের প্রতিটি বাঁকেই কেউ না কেউ সুরের দিশা দেখিয়ে দিয়েছেন। তাদের স্নেহ আর বিশ্বাসই আমাকে একের পর এক গান গাইতে সাহস জুগিয়েছে।