Published : 24 Oct 2025, 03:15 AM
অন্তর্বর্তী সরকারের নামকরণের ভেতরেই তাদের দায়িত্বের পরিসর নির্ধারিত রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার আগে একটি অনির্বাচিত শক্তি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা দখল করে রেখেছিল। তাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব অনির্বাচিত শাসনব্যবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিত্বের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সেই নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ রাখার নিশ্চয়তা বিধান করা। অর্থাৎ, গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠাই এই ধরনের সরকারের মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পেয়েছে, সেই অভ্যুত্থান বৈষম্যবিরোধিতার কারণে ব্যাপকতা পেয়েছে। বৈষম্য ও শোষণের জাঁতাকলে দেশে যে সাম্যহীনতার কাঠামো তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে, সেই কাঠামো ভাঙার আকুলতা থেকে অভ্যুত্থানের সূত্রপাত। ফলে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের দায় কেবল নির্বাচন অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সেই নির্বাচনের ভেতর দিয়ে জনগণের জীবনে তাত্ত্বিক ও বাস্তবসম্মত ন্যায়ের প্রবাহ ফিরিয়ে আনার দিকনির্দেশনা স্থির করে দেওয়াও তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। এই দুটিই মূলত বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যপরিধি।
এই সরকারই প্রথমবারের মত এমন কাজের দায়িত্ব পায়নি। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এই রকম অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার সূত্রপাত হয়েছিল। সেই সরকার মাত্র তিন মাসে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করার উদাহরণ রেখে গেছে।
অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে দায়িত্ব দেওয়ার সময় সবার আগে যে প্রশ্ন সামনে আসে, সেটি হল অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে গেলে কতটা সময় লাগতে পারে? প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আমার যখন সাক্ষাৎ হয়, তখন তিনিও জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই কাজটা করতে গেলে কত দিন সময় লাগতে পারে? আমি তাকে সাহাবুদ্দীন আহমদ সরকারের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলাম।
শুধু নির্বাচনই নয়, সংস্কারের ভিত্তিও স্থাপন করা হয়েছিল সাহাবুদ্দীন আহমদের ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। অধ্যাপক রেহমান সোবহানের নেতৃত্বে গঠিত টাস্কফোর্স ১১টি বিষয়ে ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণের সুপারিশ দিয়েছিল তখন।
যদি সাহাবুদ্দীন আহমদ সরকারের তিন মাস সময় লাগে, তাহলে বর্তমান বাস্তবতায় ছয় বা নয় মাস যথেষ্ট হওয়া উচিত। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সেই সীমা অতিক্রম করেছে বেশ আগে। এখন সংস্কার ও ঐকমত্যের নামে সময়ক্ষেপণ করে চলছে, নির্বাচনের একটা দিনক্ষণ বললেও বৈষম্যবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের বৈষম্য, শোষণ ও সাম্যহীনতার অর্গল ভাঙার অঙ্গীকার নিয়ে কোনো বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই যথেষ্ট হতে পারে। যেমন জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ। শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী ন্যূনতম মজুরি হওয়া উচিত ৩০ হাজার টাকা। এটি কার্যকর করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক নির্দেশনার বাইরে অন্য কিছুর প্রয়োজন নেই। মুক্তিযুদ্ধের পরেও সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, সেটা কি ১/৪, ১/৫ নাকি ১/৬? আমি তখন ডাকসুর ভিপি হিসেবে সেই আলোচনায় যোগ দিয়েছিলাম। পরে দেখেছি, সেই সবের কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি।
অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর না করে বৈষম্যবিরোধী অভ্যুত্থানের চেতনার প্রতি সম্মান দেখানো যায় না; বরং দেখা যাচ্ছে, দারিদ্র্য উৎপাদনের যে কাঠামো আগের সরকারগুলো তৈরি করে গেছে, সেটি এখন আরও মজবুত হচ্ছে। সরকারি হিসাবেই দেখা যায়, দরিদ্র মানুষের অনুপাত বেড়েছে। অর্থনীতি যদি লুটপাট ও সম্পদকেন্দ্রিক ধারায় পরিচালিত হয়, তাহলে তার পরিণতি হয় স্বৈরতন্ত্রে এবং তা থেকেই জন্ম নেয় ফ্যাসিবাদী প্রবণতা। যে অর্থনীতি স্বৈরতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখে, সেই অর্থনীতি বজায় রেখে গণতন্ত্রের ফুল ফোটানো সম্ভব নয়।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অবাধ নির্বাচনের ব্যাপারে একের পর এক অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। সরকার ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু জনগণের সন্দেহ কাটেনি। ইতিহাস বলে, অনির্বাচিত সরকার থেকে যারা লাভবান হয়, তারাই প্রায়শই সেই অবস্থাকে দীর্ঘায়িত করার কৌশল নেয়। এবারও সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যেভাবে আওয়ামী লীগ করেছিল। তখন আওয়ামী লীগের লোকজন স্লোগান দিত, ‘চিরদিন দরকার/ আওয়ামী লীগের সরকার’।
সংস্কারের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বিতর্ক বাড়ানো হচ্ছে—এক কক্ষ নাকি দুই কক্ষ, গণভোট নাকি অন্য পথ। এসব প্রশ্নের ভেতর দিয়ে আলোচনাটাকে দীর্ঘ করে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা হস্তান্তরের মূল উদ্দেশ্য অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সরকার সংস্কারের নামে যত দিন ক্ষমতা উপভোগ করা যায়, সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন আয়োজনে সরকারের দীর্ঘসূত্রতা উগ্রবাদী, ধর্মভিত্তিক ও ডানপন্থী শক্তিগুলোকে তাদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ দিচ্ছে। যদিও জনসাধারণের সমর্থন তারা পাবে না, তবু প্রশাসনের ভেতরে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে তারা রাজনৈতিক সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী এই কাজটা করছে।
জামায়াতে ইসলামী এখন অন্যান্য ধর্মভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে জোট করার যে চেষ্টা শুরু করেছে, আমি মনে করি, এটা হচ্ছে জামায়াতের ভাঁওতাবাজি। জামায়াত একটা নিষিদ্ধ সংগঠন, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে আত্মসমর্পণ করেছে, সেখানে লেখা আছে, তারা সেনা, নৌবাহিনীসহ সকল বাহিনী, সহযোগী বাহিনীসহ আত্মসমর্পণ করেছে। পাকিস্তানের সহযোগী বাহিনীগুলোর সমন্বয়ের নাম হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যেমন এই দেশে কোনো তৎপরতা চালানোর অধিকার রাখে না, তেমনি রাখে না জামায়াতে ইসলামীও।
খুবই পরিতাপের বিষয়, এই জামায়াতকে নিয়ে আওয়ামী লীগও খেলেছে, বিএনপিও খেলেছে। জামায়াত খুবই সুচতুরভাবে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে। বিভিন্ন জায়গায়, রন্ধ্রে রন্ধে তারা অনুপ্রবেশ করেছে। শিবিরের ছেলেরা টাকা দিয়ে ছাত্রলীগে ঢুকেছিল, সেগুলো তো এখন সামনে আসছে। যখন ছাত্র ইউনিয়নসহ অন্যান্য সংগ্রামী সংগঠন হাসিনার ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তখন শিবিরের ছেলেরা ছাত্রলীগের ভেতরে ঘাপটি মেরে ছিল, অভ্যুত্থানের সময়ও হয়তো হামলাকারীদের দলে ছিল তাদের অনেকে। তারা ধর্মীয় অনুভূতি কাজে লাগিয়ে পরকালের ভয় দেখিয়ে রাজনীতি করে। এটা একটা ভয়ংকর শক্তি। এটাকে যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করতে হবে।
এ রকম পরিস্থিতির বর্ণনা পাওয়া যায় ইতালির কমিউনিস্ট নেতা আন্তোনিও গ্রামসির জেলখানা থেকে লেখা চিঠিতে। তখনকার ইতালির পরিস্থিতি সম্পর্কে গ্রামসি বলেছিলেন, ‘আমাদের সংকটের মর্মবাণী সেই জায়গায় নিহিত, যা থেকে বলতে হয়—পুরনো ব্যবস্থা আর দেশ চালাতে পারছে না।’ আজকের বাংলাদেশেও যেন সেই সংকট উপস্থিত। পুরনো শাসনব্যবস্থা ব্যর্থ, কিন্তু নতুন শক্তি এখনো নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করতে পারেনি। সেই শূন্যতার জায়গাটা ‘বাম প্রগতিশীল’রা নেবে বলে আশা করি আমি। আর যদি তারা ব্যর্থ হয়, তবে এটা কিন্তু সাম্প্রদায়িক এবং উগ্র ডানপন্থীদের হাতে যাবে। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে, বাম প্রগতিশীল চিন্তায় যারা পথ চলে। শুধু বাম নয়, সৎ-দেশপ্রেমিক, প্রগতিবাদী রাজনৈতিক দল শুধু নয়; বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে, ব্যক্তি আছে, গোষ্ঠী আছে; প্রত্যেকের কাঁধে এই প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পথে দেশকে পরিচালনা করার দায়িত্ব বর্তেছে। আর এটা করা না গেলে দেশ চলে যাবে উগ্র ডান ও সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে। ফলে এখানে অবহেলা করা মানে কিন্তু অগোচরে ডানপন্থীদের সুযোগ করে দেওয়া। এটা হল ‘রাজনৈতিক অপরাধ’। প্রগতিশীল চিন্তা যারা ধারণ করেন, যারা দেশকে শোষণমুক্তির দিকে এগিয়ে নিতে চান, তাদের এই ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ করা চলবে না। তাহলে কী করতে হবে? প্রগতিশীলদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মানুষ কিন্তু ইতোমধ্যে আওয়াজ তুলছে, ‘নৌকা-লাঙ্গল-দাঁড়িপাল্লা- ধানের শীষ/ সব সাপেরই দাঁতে বিষ’।
মানুষ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর শাসন দেখেছে। যদিও জামায়াত বলার চেষ্টা করে, তাদের শাসন দেখা হয়নি। জামায়াতকেও তো আমরা দেখেছি। জামায়াতের নেতারা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে মন্ত্রী হয়েছিলেন। পাকিস্তান আমলেও তাদের দেখেছি। মুক্তিযুদ্ধে তাদের রূপ দেখেছি, তারা গণহত্যা করেছে। ফলে তারা যে বলে, তাদের শাসন দেখা হয়নি, এটা সর্বৈব মিথ্যা।
এখন বাম শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটা ‘গ্র্যান্ড কোয়ালিশন’ করতে হবে। যেটাকে আমি বলব ‘রামধনু কোয়ালিশন’ বা ‘রেইনবো কোয়ালিশন’। এখন সময়ের দাবি হচ্ছে ‘নয়া যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করা। এই যুক্তফ্রন্টকে নিয়ে একটা লড়াইয়ে নামতে হবে। সেই লড়াইটা ওপরে বসে ঠিক করার দরকার নেই। সেটা নিচে থেকে ঠিক করতে হবে। সবাইকে নিয়ে একটা জাতীয় সম্মেলন করে, সবার মতামতে একটা ‘চার্টার’ তৈরি করতে হবে। সুস্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে আমাদের পরিচালিত হতে হবে। সেটা যদি প্রথম ধাপেই না হয়, দ্বিতীয় ধাপে হবে। আমরা বিরোধী দলে থাকব, তেমন ভাবনাও নিতে হবে। আমরা অতীতে নানা রকম বিপদের সম্মুখীন হয়েছি। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে পদক্ষেপ নিতে হবে। নিজেদের রাজনৈতিক দলকে যেমন শক্তিশালী করতে হবে, সেই সঙ্গে নয়া যুক্তফ্রন্টকেও শক্তিশালী করতে হবে।
এখন আসলে আমাদের সামনে লড়াই দুইটা—একটা সাম্প্রদায়িক ডানপন্থী শক্তির বিরুদ্ধে, আরেকটা ভাত-কাপড়ের। এই দুই লড়াই সমানতালে চালিয়ে যেতে হবে। এর মধ্যে কোন লড়াইটা আগে করব, তা নিয়ে দ্বিধায় থাকলে একটা বড় ভুল হয়ে যাবে। সাম্প্রদায়িক ডানপন্থী শক্তিকে যেমন প্রতিহত করতে হবে, মানুষের ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তার জন্যও সমানতালে লড়াই জারি রাখতে হবে।
আমি তো ছাত্রনেতা ছিলাম। স্বাধীন বাংলাদেশের ডাকসুতে প্রথম ভিপি হয়েছি। অনেক ছাত্র আন্দোলনে সামনে ছিলাম। ছাত্ররা এই দেশে অনেক আন্দোলনে বিজয় এনেছে। কিন্তু সেই বিজয় ধরে রাখতে পারেনি। ছাত্র আন্দোলনের এটা হল শক্তি, আবার এটাই দুর্বলতা। এবারও জুলাই অভ্যুত্থানের বিজয় ‘ষোলোআনা ব্যর্থ’ হওয়ার শঙ্কা দেখতে পাচ্ছি। আরেকটা গণ-অভ্যুথান অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ছে।