Published : 11 Feb 2026, 11:35 PM
সাড়ে তিন দশক পর আবার ভোট দিতে যাচ্ছেন তিনি। বিকেলবেলা এক বড় ভাই বলছিলেন এমনটা। কথায় কথায় উঠে এল তার জীবনের প্রথম ভোট দেওয়ার স্মৃতি—১৯৯১ সালের নির্বাচন। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সক্রিয়ভাবে যুক্ত বাম রাজনীতির সঙ্গে। সেই সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যে আসনের ভোটার ছিলেন তিনি, সেখানকার সিপিবির প্রার্থী ভোটের দু-চার দিন আগে কারো সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করেই আওয়ামী লীগকে সমর্থন জানিয়ে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। শেষ পর্যন্ত আমার ওই ভাইটি আওয়ামী লীগকেই ভোট দেন।
এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে পেশাগত কারণে নিজের ভোটকেন্দ্র থেকে দূরে ছিলেন। আওয়ামী লীগ-বিএনপির দ্বিমেরুকেন্দ্রিক রাজনীতিও তাকে ভোট দেওয়ার প্রেরণা দিতে পারেনি। তাই ২০০৮ সালে ঢাকায় থাকার পরও ভোট দেওয়ার আগ্রহ বোধ করেননি। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে তো তার মতো মানুষের ভোট দেওয়ার প্রশ্নই আসেনি।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর এবার তিনি ভোট দেবেন। তিনি এখন ঢাকার যে আসনের ভোটার, সেই বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে রীতিমতো একটি হত্যা মামলা রয়েছে। জেনেশুনে এমন প্রার্থীকে কেন ভোট দেবেন, তা রসিকতা করলেন নাকি আক্ষেপ—বোঝা দুরূহ। বললেন, ভোট দেবেন ‘জামায়াতের ঠেলায়’।
রাত পোহালেই নির্বাচন। এই নির্বাচন ঘিরে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। কোন দল ক্ষমতায় যাবে, কে সরকার গঠন করবে, ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের প্রভাব কতটা থাকবে, নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে—এসব প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে বিএনপি বেশ আশাবাদী। অবশ্য জামায়াতে ইসলামীও জয়ের ব্যাপারে জোরালো এবং বেশ বিশ্বাসযোগ্য প্রচারণা চালাতে সক্ষম হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে গত বছর ১৯ জুলাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত জাতীয় সমাবেশ থেকে জামায়অতে ইসলামী তাদের বিরাট উপস্থিতির জানান দিতে শুরু করেছে। হয়তো এখন নির্বাচনি প্রচারণায় সুবিধাও পেয়েছে তারা। তবে আমার চেনা-জানা মানুষজনের সঙ্গে যতটুকু যোগাযোগ ও আলাপ-আলোচনা হয়েছে, তাতে মনে হয়েছে, ‘জামায়াত ক্ষমতার দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছে’—এই ধারণা তাদের আতঙ্কিত করেছে। ফলে যাদের ভোট দিতে যাওয়ার কথা ছিল না, তাদের অনেকেই অবশেষে ভোট দিতে যাচ্ছেন। ‘নো বোট, নো ভোট’—নৌকা নেই তো ভোটও নেই, আওয়ামী লীগের এই আহ্বান দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর কতটুকু প্রভাব ফেলেছে, এটা জানার কৌতূহল ছিল।
তাই ফোনে কথা বললাম রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনের এক সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে। এই মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্ম। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের একতরফা নির্বাচন বানচাল করতে মিঠাপুকুর অচল করে দিয়েছিল জামায়াত ও বিএনপি। এখন ওখানে সেই সময়কার মিত্র দুই দল মুখোমুখি। মজার বিষয় হলো, বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলের প্রার্থীর নামই গোলাম রব্বানী। পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী জামায়াতের রব্বানীর বিজয় কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। অথচ এলাকার সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে আমার বন্ধুটি জানায়, গত দু-তিন দিনে মিঠাপুকুরের চিত্র বদলে গেছে।
আসনটিতে মোট ভোটার প্রায় ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৪ জন। আমার বন্ধুর হিসাব অনুযায়ী, ওখানে জামায়াতের ৭০ থেকে ৮০ হাজার ভোটের একটা ব্যাংক আছে, যা জামায়াতে ইসলামীর মতো সাংগঠনিক কাঠামোবদ্ধ একটি দলের জন্য বিশাল বড় সংখ্যা। বিএনপির ৫০ হাজারের কিছুটা বেশি হতে পারে। আওয়ামী লীগের ভোট এক লাখের কম নয়। আওয়ামী লীগের ভোট এত বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বন্ধুটি বলল, এখানে হিন্দু ও আদিবাসী মিলিয়ে ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার।
মিঠাপুকুরের বন্ধুটি আরও বলল, আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয়রা এখনো এলাকাছাড়া। তবে আওয়ামী লীগ সমর্থক সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিএনপির রব্বানী বেশ নিরাপত্তার বোধ তৈরি করতে পেরেছেন গত কয়েক দিনে। তাই শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগের ভোটাররা তার পক্ষে ভোট দিতে যাবে বলে মনে হচ্ছে। হিন্দু এবং আদিবাসীদেরও যদি কেন্দ্রে নিয়ে যেতে পারে বিএনপি, তাহলে নিশ্চিত জয়ের এই আসনটিও হারাতে পারে জামায়াতে ইসলামী।
বরিশাল বিভাগে পিরোজপুর-১ ও পিরোজপুর-২ আসনে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর দুই ছেলে—মাসুদ সাঈদী ও শামীম সাঈদী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। পিরোজপুর-১ আসনে মাসুদ সাঈদী ও বিএনপির আলমগীর হোসেনের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে সাধারণ মানুষের ধারণা। ওই আসনে হিন্দু ও মুসলিম ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান। হিন্দু ভোটারদের বড় অংশ আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। ফলে তারা যেদিকে ঝুঁকবেন, সেই প্রার্থীই নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে স্থানীয়দের ধারণা।
পটুয়াখালী-২ আসনের চিত্রও প্রায় একই রকম। সেখানে ভোটের সমীকরণ অনেকটাই নির্ভর করছে সংখ্যালঘু ও ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকের চূড়ান্ত অবস্থানের ওপর। চট্টগ্রাম, সিলেটের কয়েকটি আসন ও দিনাজপুর-৩ আসনে একই অবস্থা।
গত কয়েক দিন ধরে পত্রিকার পাতায় জামায়াতের নির্বাচনি আসন সংক্রান্ত খবর নজরে রাখছিলাম। বিশেষ করে কোন কোন আসনে তারা জিততে পারে, সেই হিসাব-নিকাশ। পাশাপাশি ছাত্র-রাজনীতিতে যুক্ত থাকার সুবাদে সারাদেশে আমার ব্যক্তিগত যোগাযোগও নেহাত কম নয়। সবকিছু মিলিয়ে যে চিত্রটি ভেসে উঠছে, তাতে খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে জামায়াতের অবস্থান অন্যান্য বিভাগের তুলনায় তুলনামূলকভাবে ভালো।
তবে আজকের বাস্তবতায় সেই অবস্থান অনেকটাই পাল্টে গেছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ, গণঅভ্যুত্থানের পর গত দেড় বছর ধরে জামায়াতের কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অনেক দল, মত, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর ক্ষোভ, নিন্দা, সমালোচনা ও পর্যালোচনা চলছে। এমনকি ইসলামী অন্যান্য দল, সাধারণ আলেম সমাজ, সুফিবাদী-মারেফতী সম্প্রদায়, আদিবাসী ও হিন্দু সম্প্রদায়, বাউল ও সংগীতশিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী থেকে শুরু করে দেশের নারী সমাজ ইতোমধ্যে তাদের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানিয়েছে এবং জনগণকেও সে বিষয়ে সতর্ক থাকার কথা বলছে তারা।
অন্যদিকে, সারাদেশে বিএনপির কার্যক্রম নিয়ে যতটা না নেতিবাচক ধারণা বাস্তবে তৈরি হয়েছে, তার চেয়ে শতগুণ বেশি সেই ধারণা প্রচার করেছে জামায়াত ও তাদের অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা। বিভিন্ন এলাকায় এ কারণে আওয়ামী লীগের একটি অংশ বিএনপির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, সেই সব আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অনেকেই এখন বিএনপির প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনে যদি আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটাররা বিএনপির পক্ষে ঝুঁকে পড়েন এবং ভোট দেন, তাহলে বিএনপি বড় ব্যবধানে জয়ী হবে।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজের প্রগতি, মুক্তচিন্তা, নারী অধিকার, শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির সব ক্ষেত্রেই জামায়াতের রাজনৈতিক বিরোধিতা এই সব মানুষকে বিএনপির প্রতি আগ্রহী করছে। ভোটে তারা যদি ‘মন্দের ভালো’কে ভোট দিতে যায় তাহলে বিএনপিকে ঠেকিয়ে রাখা একেবারেই অসম্ভব।
জামায়াতের নির্বাচনি ইতিহাস পরিসংখ্যান দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, ১৯৯১ সালে তারা পেয়েছিল ১৮টি আসন (ভোটের ১২.১৩ শতাংশ), ১৯৯৬ সালে ৩টি আসন (৮.৬১ শতাংশ), ২০০১ সালে ১৭টি আসন (৪.২৮ শতাংশ) এবং ২০০৮ সালে মাত্র ২টি আসন (৪.৬ শতাংশ)।
স্বাধীন বাংলাদেশে এবারের আগে যে ১২টি সংসদ নির্বাচন হয়েছে, তার মধ্যে মাত্র তিনটি ছাড়া সবগুলোই কমবেশি বিতর্কিত। বিতর্কের শুরু ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিয়েই। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়কালকে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের এক স্থিতিশীল পর্যায় বলা যায়। এই সময়ে অনুষ্ঠিত পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন তিনটি টুকটাক বিতর্ক বাদে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। অন্যান্য দলের মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৮৮, জাতীয় পার্টি ৩৫, সিপিবি ৫, বাকশাল ৫, জাসদ (সিরাজ) ১, ইসলামী ঐক্যজোট ১, ওয়ার্কার্স পার্টি ১, এনডিপি ১, গণতন্ত্রী পার্টি ১, ন্যাপ (মোজাফফর) ১ ও অন্যান্য দল ৩টি আসন পায়। বিএনপির প্রাপ্ত ভোট ছিল ৩০.৮১ শতাংশ, আওয়ামী লীগের ৩০.০৮ শতাংশ।
সাংবিধানিকভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৯৬ সালের ১২ জুন, সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ৮১টি দল। বিজয়ী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পায় ১৪৬টি, বিএনপি ১১৬টি, জাতীয় পার্টি ৩২টি, জামায়াতে ইসলামী ৩টি আসন। আওয়ামী লীগ ৩৭.৪৪ শতাংশ এবং বিএনপি ৩৩.৬০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল।
২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ৫৪টি দল। বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পায় ১৯৩টি আসন। আওয়ামী লীগ ৬২টি, জামায়াতে ইসলামী ১৭টি, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যফ্রন্ট ১৪টি আসন। বিএনপি ওই নির্বাচনে ৪০.৯৭ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগ ৪০.১৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিল।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এই নির্বাচনটি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তবে এরপর আওয়ামী লীগের অধীনে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচন বিতর্কের অতীত ইতিহাস ছাড়িয়ে যায়। ওই তিনটি নির্বাচনের একটিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী অংশ নিয়েছিল, সেটি ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নিবন্ধন না থাকার কারণে ওই নির্বাচনে জামায়াত বিএনপির সঙ্গে জোটভুক্ত হয়ে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করলেও কোনো আসনে জয়লাভ করতে পারেনি। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোর একটি, যা আওয়ামী লীগের ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত।
গ্রহণযোগ্য বিগত নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা এবং ভোটের সমীকরণ থেকে বোঝা যায়, জামায়াত বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে স্থায়ীভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি, অন্তত এবারের আগে তো নয়ই। জামায়াতের ইতিহাসভিত্তিক গড় ভোটের হার প্রায় ৭.৪ শতাংশ। রাত পোহালে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তাতে যদি এই গড় অনুপাত তিন গুণ বাড়িয়ে ধরি, তাও হবে মাত্র ২০ শতাংশের কিছুটা বেশি, যা কোনো নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। তবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে এবং প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে আসন বণ্টন নিশ্চিত করা গেলে সংসদের উচ্চকক্ষে জামায়াতে ইসলামী শক্তিশালী দলে পরিণত হবে এবং বাংলাদেশ প্রবেশ করবে নতুন সংসদীয় রীতিতে।