Published : 01 Mar 2026, 03:09 PM
সামাজিক মূল্যবোধ বৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে বই পড়ার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। গতানুগতিকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, পাঠক সংখ্যা দিনে দিনে কমে আসছে। এ শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী ঘটছে। তবে আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় পাঠকের হার অনেক বেশি কমছে বলে ধারণা করা হয়। সৃষ্ট বর্তমান পরিস্থিতিই তার জ্বলন্ত সাক্ষী। বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর এ বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিবেদন তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করেছে। এ এক অশনি সংকেত। তবে বই পড়া মানুষের সংখ্যা বাড়াতে আমরা কী দায়িত্ব পালন করছি, সে প্রশ্নও সমানভাবে সামনে চলে আসে।
পাঠক বৃদ্ধিতে কালের পরিক্রমায় সভ্যতার বিকাশ এবং প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উৎকর্ষের সঙ্গে বই শিল্প কতটুকু সময়োপযোগী করা হয়েছে, তা নিয়েও আছে হাজারো প্রশ্ন। আমাদের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি কীভাবে পাঠক তৈরির পথে প্রবল শক্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা নিয়ে গবেষণা ও সমূহ পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। বই পড়া নিয়ে ১০২টি দেশে ‘সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন’ ২০২৪ সালে একটি গবেষণা করে। এতে দেখা যায়, বই পড়ায় শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র; সেখানকার মানুষ বছরে গড়ে ১৭টি বই পড়েন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত। বাংলাদেশের অবস্থান অকহতব্য–৯৭তম। একজন বাংলাদেশি বছরে গড়ে বই পড়েন মাত্র তিনটি।
প্রতিবছর বাংলা একাডেমি অমর একুশে বইমেলার আয়োজন করে থাকে। প্রকাশকরা বলছেন, গত কয়েক বছরে বই বিক্রি কমেছে। প্রকাশনা শিল্প লোকসান গুণছে—এমন কথাও শোনা যায়। একটি পরিসংখ্যানের সঙ্গে আরেকটির মিল আছে। এই লোকসানের ভয়ে প্রথমে অনেক প্রকাশক এবারের বইমেলায় অংশ নিতেই চাননি। এর পেছনে যথেষ্ট যুক্তি দিয়েছেন তারা। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিক্ষার হার ৭৭.৯ শতাংশ। তার মানে প্রায় ২২ শতাংশ মানুষ অশিক্ষিত। এই ২২ শতাংশ মানুষ বইয়ের আলোর বাইরে। আর যারা সাক্ষরতা অর্জন করেছেন, তাদের সকলেরই বই পড়ার অভ্যাস থাকবে—এমন আশা করাটাও ভুল। এর কারণ আমাদের দারিদ্র্য।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের রিপোর্ট অনুসারে, বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার প্রায় ২১ শতাংশ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মানুষের কাছে বই পড়া বিষয়টি নিতান্তই ঐচ্ছিক, অনেকটা বিলাসিতা। ‘পাঠ্যবই’ নামক একটি শব্দ আছে আমাদের দেশে। শুনে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, স্কুলে পড়তে বাধ্য বইগুলো ছাড়া বাকি সব বই অপাঠ্য বা অপ্রয়োজনীয়। শিক্ষার্থীরা মনস্তাত্ত্বিকভাবে এভাবেই বেড়ে ওঠে। মূলত মনন বিকাশ, আত্মোন্নয়ন এবং জ্ঞানের প্রসার ঘটাতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের বই পড়া অত্যাবশ্যক। তাই কর্তৃপক্ষ শিক্ষা কারিকুলামে ‘পাঠ্যবই’ নামটি সংশোধনের বিবেচনা আনতে পারে।
আমাদের কাজ হচ্ছে যারা স্কুলে যাচ্ছে, তাদের বই পড়ার উপযোগী করে তৈরি করার মিশন হাতে নেওয়া। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণি-উপযোগী গল্প, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনিসহ আনন্দদায়ক বইয়ের জন্য একটি ছোট শেলফ থাকা দরকার। পাঠ্যবইয়ের বাইরে ক্লাস বিরতিতে যেসব বই তাদের হাসাবে, শেখাবে এবং ক্লাসের বইয়ের একঘেয়েমি কাটিয়ে বই পড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি করবে। হয়তো এর ফলাফল খুব দ্রুত পাওয়া যাবে না; তবুও সমৃদ্ধ, শিক্ষিত এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে এটি একটি সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত হতে পারে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাইলে খুব সহজেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক বই কিনে তা রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে। তবে আমাদের দেশে যেহেতু এই সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি, তাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিত এটিকে বাধ্যবাধকতায় আনা।
উন্নত দেশগুলোতে পরিবার থেকেই বই পাঠের অভ্যাস গড়ে ওঠে। আমাদের দেশে আগেকার দিনে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত ও সচেতন পরিবারে পত্রিকা রাখার পাশাপাশি বইও সংগ্রহ করা হতো নির্মল বিনোদনের বিশেষ অংশ হিসেবে। বর্তমানে পরিবারগুলোতে টেলিভিশন, স্মার্টফোন থাকলেও অনেক শিক্ষিত পরিবারে নিয়মিত একটি পত্রিকা রাখা হয় না। অধিকাংশ পরিবারে নেই ছোট একটা বুকশেলফ পর্যন্ত। এখানেই আমাদের দীনতা। এটিই বর্তমান পারিবারিক জ্ঞানচর্চার প্রকৃতি। মা-বাবা কিংবা বড়দের বই পড়ার অভ্যাস পরিবারে ছোটদের বইয়ের প্রতি আকর্ষণ বা আগ্রহ সৃষ্টি করতে অন্যতম সহায়ক। কারণ ছোটবেলার অভ্যাসই পরিণত বয়সে সময় কাটানোর অন্যতম মাধ্যম এবং নস্টালজিয়া।
আশির দশক থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে প্রায় গ্রাম, পাড়া ও মহল্লায় পাঠাগার ছিল চোখে পড়ার মতো। মফস্বল এলাকাতেও পাঠাগারগুলোতে নিয়মিত পত্রিকা আসত। থাকত ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনেক বই। শিক্ষিত, সুধীজন ও তরুণদের বিকেলের অবসর সময় কাটত পাঠাগারে। কালের বিবর্তনে আজ পাঠাগারের সেই আলো নিভে গেছে। মূলত পাঠকশূন্যতায় পাঠাগারগুলো প্রায় বন্ধের দ্বারপ্রান্তে। অধিকাংশ ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগুলো আধুনিকায়ন হয়নি।
বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট এবং সর্বশেষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একজন মানুষের বই পড়ার সময়টুকু ব্ল্যাকমেইল করে নিয়েছে। এই প্রযুক্তি যে গবেষণা বা বই পড়ায় সর্বতোভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা নয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, গুগল সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে ভারতীয় একজন প্রতি সপ্তাহে ১০ ঘণ্টা ৪২ মিনিট সময় বই পড়া বা তথ্য সংগ্রহে ব্যবহার করেন। আর বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে এই গবেষণার ফলাফল একেবারে তলানিতে। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ এই প্রযুক্তিতে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে রিলস, টিকটক ও কন্টেন্ট দেখে সময় অতিবাহিত করে, যার অধিকাংশ হলো ফানি ও ভিত্তিহীন। এ ছাড়া এগুলো অপপ্রচার ও গুজবের অন্যতম উৎস।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের অধীন ঢাকা ছাড়াও জেলা পর্যায়ে ৭১টি গণগ্রন্থাগার রয়েছে। এছাড়া রয়েছে বিভিন্নভাবে নির্মিত পাবলিক লাইব্রেরি। বর্তমানে এগুলোতে পাঠক নেই বললেই চলে। বিশ্লেষকদের মতে, এগুলোতে আধুনিকায়নের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষকে কাজে লাগিয়ে ডিজিটাল ফরম্যাটে ‘ই-বুক’ সার্ভিস চালু করা সময়ের দাবি। গণগ্রন্থাগারের ওয়েবসাইটে স্বল্পসংখ্যক বইয়ের ই-ফরম্যাট থাকলেও সব বইয়ের নেই। বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটের উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডারও গণগ্রন্থাগারে পাঠকবিমুখ করার অন্যতম কারণ।
আবার শহরকেন্দ্রিক যারা গ্রন্থাগার বা লাইব্রেরিতে যান, তাদের অধিকাংশই বিসিএস ও অন্যান্য চাকরির পড়াশোনা করার উদ্দেশ্যে যান। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লাইব্রেরিও বিসিএস প্রস্তুতির কারখানায় পরিণত হয়েছে। এটি নিয়ে বেশ কথা হচ্ছে, কিন্তু কোনো উপায় নেই। অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমাদের পড়াশোনার মূল উদ্দেশ্য একটি ভালো চাকরি পাওয়া। এটি নিখাদ বাস্তবতা। এই প্রেক্ষাপটে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের স্লোগান হারিয়ে গেছে। সে জন্য চাকরির বই গলধকরণ করতে বাধ্য থাকে চাকরি পাওয়ার আগপর্যন্ত। আর দর্শন, সাহিত্য ও অন্যান্য বই পড়ার অনভ্যাসের কারণে কিংবা কর্মক্ষেত্রে বই পড়ার পরিবেশ অথবা সমর্থনের অভাবে পরে আর বই পড়া হয় না। যার কারণে এক সময় অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলেও দূরদর্শিতা ও জ্ঞানচর্চার ঘাটতিতে থাকি আমরা। এক্ষেত্রে শিক্ষা পদ্ধতি, চাকরি পরীক্ষার ধরন পরিবর্তন এবং কর্মক্ষেত্রে বই পড়া কার্যক্রমকে দাপ্তরিকভাবে সমর্থন করা হতে পারে অন্যতম পাঠাভ্যাস আন্দোলন। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কর্তৃক ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির কার্যক্রমকে আরও বেগবান করা অত্যন্ত জরুরি।
আমেরিকা, ইউরোপ কিংবা জাপানে প্রতিটি পাবলিক প্লেস যেমন—ট্রাম, রেল, বাস, সুপারশপ ইত্যাদিতে আলাদা বই কর্নার থাকে। একটু সময় পেলেই তারা বই পড়ায় সময় কাটান। আমাদের দেশে এই ব্যবস্থা নেই। আমাদের দেশে মেট্রোরেল ও দূরপাল্লার ট্রেন রয়েছে; আরও আছে দূরপাল্লার বিলাসবহুল বাস। সেগুলোতে আমরা এই পদক্ষেপ নিতে পারি। বর্তমান প্রজন্মকে বইমুখী করতে গতানুগতিক ধারার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উৎকর্ষকে কাজে লাগানো সময়ের দাবি। এটিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া অত্যাবশ্যক। এছাড়া মানসম্মত লেখা এবং লেখক তৈরিতেও প্রয়োজন ছোটবেলা থেকে বই পড়ার অভ্যাস। প্রয়োজন লেখালেখির সঙ্গে সম্পৃক্তদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা।