Published : 23 May 2026, 08:57 PM
ভারতে বিজেপি শাসন যত শক্তপোক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজনটাও তত স্পষ্ট ও দৃঢ় হচ্ছে। বজরং দল, আরএসএস, বিজেপিসহ উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো এক সময় যে রাজনীতি শুরু করেছিল, এখন তা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে। গরুর মাংস খাওয়া, ধর্মীয় আচার পালন, পোশাক, নাম সবকিছুই এখন সন্দেহের উপাদান। কখনও ‘জিহাদি’, কখনও ‘পাকিস্তানের এজেন্ট’, কখনও ‘দেশবিরোধী’—এমন নানা তকমা লাগিয়ে মুসলমানদের কোণঠাসা করার এক দীর্ঘ সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গত দেড় দশকে দৃশ্যমান হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই বিভাজনের রাজনীতি এখন আর কেবল বক্তৃতা বা টেলিভিশন বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই; তা রাস্তায় নেমে এসেছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে শুধু গরুর মাংস রাখার সন্দেহে মানুষকে পিটিয়ে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। ২০১৫ সালে উত্তরপ্রদেশের দাদরিতে মোহাম্মদ আখলাককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল তার ফ্রিজে গরুর মাংস আছে, এই গুজব ছড়িয়ে। সেটি আদৌ গরুর মাংস ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ছিল। কিন্তু ততক্ষণে একজন মানুষ মারা গেছেন। ২০১৭ সালে রাজস্থানের আলওয়ারে দুগ্ধ খামারি পেহলু খানকে গরু পাচারের অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, যদিও তার কাছে বৈধ কাগজপত্র ছিল। ঝাড়খণ্ডে আলিমুদ্দিন আনসারি, তাবরেজ আনসারি—এমন বহু নাম ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে রক্তাক্ত স্মৃতি হয়ে আছে। এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো এমন এক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় নাগরিক পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে।
ভারতের বহু রাজ্যে আগে থেকেই গরু জবাই সীমিত বা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর এই আইনগুলো আরও কঠোর হতে শুরু করে। ২০১৪ সালের পর উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, আসামসহ বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্যে গো-হত্যাবিরোধী আইন কঠোর করা হয়। ২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রে আইন কঠোর করার পর শাস্তি আরও বাড়ানোর আলোচনা চলে। গুজরাটে তো গরু জবাইয়ের সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে উন্নীত করা হয়। ২০১৭ সালে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রণালয় ‘দ্য প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলটি টু অ্যানিমেলস রুলস’ জারি করে পশুবাজারে জবাইয়ের উদ্দেশ্যে গবাদিপশু কেনাবেচার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হলে শেষ পর্যন্ত আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল।
এখন সেই একই রাজনীতির ছায়া পশ্চিমবঙ্গেও দৃশ্যমান। দীর্ঘকাল ধরে যে পশ্চিমবঙ্গকে গান, সিনেমা, সাহিত্য, শিল্প ও ধর্মীয় সহাবস্থানের এক উদার ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হতো, সেখানে বিজেপি সরকার গঠনের পর গরু ও মহিষ জবাইয়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ নতুন করে ‘গরু-বিতর্কে’ আগুন জ্বালিয়েছে। কোরবানির ঈদের ঠিক আগে ১৯৫০ সালের ‘পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন’ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের এই উদ্যোগকে অনেকে নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না, একে দেখা হচ্ছে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে।
সরকার অবশ্য দাবি করছে, এটি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে করা হয়েছে। কিন্তু রাজনীতিতে ‘সময়’ খুব বড় বিষয়। ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ কৌশলে এভাবেই ধর্মীয় মেরুকরণ করা হয়। সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না চাপিয়ে এমন এক প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করা হয়, যাতে মানুষ আইনি ভয়ে নিজেরাই গুটিয়ে যায়।
বাস্তবতা হলো, ভারতের ১৮ কোটিরও বেশি মুসলমান ছাড়াও বহু অমুসলিম নিয়মিত গরুর মাংস খান। তাছাড়া, ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মাংস রপ্তানিকারক দেশ এবং এই শিল্পের সঙ্গে কোটি কোটি মানুষের রুটি-রুজি জড়িত। কিন্তু ওই দেশেই এখন গরুর মাংসকে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার বানানো হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রহসন হলো, এই রাজনীতির কারণে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন সাধারণ হিন্দু কৃষক ও খামারিরা। ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গরু শুধু ধর্মীয় প্রতীক নয়, এটি গ্রামীণ উপার্জনের মূল ভিত্তি। গরুর দুধ বিক্রি করে কোটি কোটি পরিবার চলে। একটি গাভী যখন দুধ দেওয়া বন্ধ করে, তখন কৃষক সেটি বিক্রি করে ওই টাকা দিয়ে নতুন গাভী কেনেন। কিন্তু বিক্রির পথ বন্ধ হলে পুরো অর্থনৈতিক চক্র ভেঙে পড়তে পারে।
আজ ভারতের বহু রাজ্যে ঠিক এই সংকটই তৈরি হয়েছে। সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে বাংলাদেশে গরু পাঠানো প্রায় বন্ধ। দেশের ভেতরেও তথাকথিত ‘গো-রক্ষক’ বাহিনীর হামলার ভয়ে পরিবহনকারীরা পশুবাহী ট্রাক চালাতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে বৃদ্ধ ও অনুৎপাদক গরুগুলো আর বিক্রি করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে কৃষকেরা রাতের অন্ধকারে সেসব গরু রাস্তায় ছেড়ে দিচ্ছেন। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানজুড়ে লাখ লাখ বেওয়ারিশ গরু এখন ফসলের মাঠ নষ্ট করছে, আর কৃষকদের রাত জেগে মাঠ পাহারা দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ, ধর্মের আবেগে তৈরি নীতি শেষ পর্যন্ত খোদ হিন্দু কৃষকদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারা’র প্রবাদটি যেন ভারতের বর্তমান গো-রাজনীতির সঙ্গেই সবচেয়ে ভালো মেলে।
এখানে আরেকটি ঐতিহাসিক সত্য মনে রাখা প্রয়োজন। আজ যে গরুকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি করা হচ্ছে, বহু ইতিহাসবিদ ও গবেষকের মতে, প্রাচীন ভারতে গো-মাংস ভোজন পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল না। ড. বি. আর. আম্বেদকর, ডি. এন. ঝা, পি. ভি. কানে কিংবা রোমিলা থাপারের মতো গবেষকেরা বৈদিক সাহিত্য, ধর্মশাস্ত্র ও ঐতিহাসিক দলিল বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের খাদ্যসংস্কৃতি ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার পরিবর্তন ঘটেছে।
গবেষকদের একাংশের মতে, ভারতে বৌদ্ধধর্মের উত্থান এবং অহিংসার দর্শন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর, ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ নিজেদের সামাজিক ও ধর্মীয় কৌশল পাল্টাতে শুরু করে। জীবের প্রতি বৌদ্ধদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি যখন আমজনতার মন জয় করে নিচ্ছিল, তখন বৌদ্ধদের ওই জনসমর্থন ঠেকাতেই গরুকে পবিত্রতার প্রতীকে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৮৮২ সালে আর্য সমাজের ‘গো-হত্যা নিবারণী আন্দোলন’ থেকে শুরু করে আধুনিক কালের ‘গোরক্ষা’ রাজনীতি ধীরে ধীরে ধর্মীয় আবেগকে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করে।
অথচ সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে এমনভাবে প্রচার চালানো হয়েছে, যেন গো-মাংস হিন্দুদের কাছে চিরকালই নিষিদ্ধ ও বর্জনীয় ছিল। বাস্তবে ইতিহাস এত সরল নয়। কিন্তু রাজনীতির প্রয়োজনে ইতিহাসকে সরল বানাতে হয়; কারণ ইতিহাস জটিল হলে বিভাজনের ব্যবসা চালানো যায় না।
একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তৃণমূল কংগ্রেসের নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। দুর্নীতি, সিন্ডিকেট বা রাজনৈতিক সহিংসতার মতো ভুরি ভুরি অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সত্য যে, তারা অন্তত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা ভারসাম্য নীতি বজায় রাখত। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে গরুর মাংস বিক্রি, খাওয়া কিংবা কোরবানি বড় কোনো রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠেনি। কলকাতার নিউমার্কেট থেকে শুরু করে ফুটপাতের কাবাবের দোকান সব জায়গাতেই গরুর মাংস ছিল সহজলভ্য।
কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর ওই চেনা পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এরই মধ্যে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগ উঠেছে; কোথাও কোথাও বুলডোজার দিয়ে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বিজেপি-শাসিত অন্যান্য রাজ্যের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ ধরে নিচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গও ওই একই পথে হাঁটছে।
ভারতের শক্তি ছিল তার বহুত্ববাদ। শত ভাষা, শত ধর্ম, শত সংস্কৃতির মানুষকে এক ছাতার নিচে ধরে রাখার যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতা ভারত দেখিয়েছিল, তা পৃথিবীর কাছে এক অনন্য উদাহরণ ছিল। বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালের পর ধীরে ধীরে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় পরিচয়নির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়েছে—এটি বাস্তবতা। কিন্তু ভারত দীর্ঘদিন ধরে অসাম্প্রদায়িক, বহুত্ববাদী এবং সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার একটি মডেল হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল, সেটি আর নেই।
উদ্বেগের জায়গাটা ঠিক এখানেই। ভারত যদি ক্রমশ বিভাজনের রাজনীতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এবং ধর্মীয় পরিচয়ই যদি নাগরিকত্বের প্রধান মাপকাঠি হয়ে ওঠে, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় আর কোনো নৈতিক ভারসাম্য অবশিষ্ট থাকছে না। কারণ ভারত শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, এটি এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিরও একটি মানদণ্ড।
ধর্ম ও রাজনীতি থাকার কথা ছিল মানুষের কল্যাণের জন্য। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, সস্তা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য ধর্মকে নির্মমভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি আউড়ে সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক ধরে রেখেছিল, আর বিজেপি এখন মুসলিমবিরোধী আবেগ উসকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভোটকে সংঘবদ্ধ করছে। আর এই দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সাধারণ মানুষ আজ দ্বিধাবিভক্ত।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, এই রাজনীতি সমাজে এক স্থায়ী অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি করছে। আগে যে মুসলমান ছিলেন একজন প্রতিবেশী, সহকর্মী কিংবা পরম বন্ধু; এখন তাকে ‘অন্য কেউ’ বা ‘পর’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একইভাবে একজন হিন্দুকেও কোথাও কোথাও ‘শত্রুপক্ষের প্রতিনিধি’ হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে। আর এই বিভাজনের রাজনীতির মূল অস্ত্র বানানো হয়েছে গরুকে। গরুকে ‘মা’ বলা বা পূজা করার আড়ালে মূলত একটি বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই কাজ করছে।
এই প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের একটি বিখ্যাত ঘটনার কথা মনে পড়ে। একবার এক ‘গোরক্ষিণী সভা’র সদস্য তার কাছে চাঁদা চাইতে এসে তর্ক জুড়ে দিলেন, মানুষ বড়, নাকি গরু বড়? একপর্যায়ে ওই ভক্ত উত্তেজিত হয়ে বললেন, “গরু আমাদের মা, আমরা তার সন্তান।” বিবেকানন্দ তখন হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, “সে আর বড় মুখ করে বলতে হবে না। এতক্ষণ কথা শুনেই তা বেশ বুঝতে পেরেছি।”
বিবেকানন্দের এই ব্যঙ্গের ভেতরে এক গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। যে সমাজে মানুষের চেয়ে কোনো প্রতীক বড় হয়ে ওঠে, সেখানে মানবতা হারাতে বাধ্য। গরুকে ভালোবাসা বা ধর্ম পালন করা কোনো অপরাধ নয়; অপরাধ তখনই শুরু হয়, যখন গরু মানুষ হত্যার অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়, যখন ধর্ম পরিণত হয় রাজনৈতিক অস্ত্রে, আর প্রতিবেশীকে নাগরিক না ভেবে শত্রু হিসেবে দেখতে শেখানো হয়।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিভেদের রাজনীতি দিয়ে সাময়িক জয় পাওয়া যায়, কিন্তু সমাজকে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত থেকে রক্ষা করা যায় না। ভারত যদি সত্যিই তার বহুত্ববাদী আত্মাকে হারিয়ে ফেলে, তবে তা শুধু ভারতের নিজের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই এক অশনিসংকেত।