Published : 22 May 2026, 05:55 PM
পুতিনের বেইজিং সফর কেবল দুটি দেশের মৈত্রীর নবায়ন নয়; এটি একটি নতুন ভূরাজনৈতিক ঘোষণাপত্র, যা পশ্চিমা-নির্মিত বিশ্বব্যবস্থাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে।
বেইজিংয়ের গ্রেট হলে যখন ভ্লাদিমির পুতিন ও শি জিনপিং মুখোমুখি বসলেন, তখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তের ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস এবং লন্ডনের কূটনৈতিক মহলে চাপা উদ্বেগ বিরাজ করছিল। কারণটি সহজ; দুই পরাশক্তির এই মিলন কেবল সৌজন্যমূলক নয়, এটি একটি সুচিন্তিত ভূরাজনৈতিক বার্তা।
মাত্র ছয় দিন আগে ডনাল্ড ট্রাম্প ঠিক একই হলে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় বৈঠক করেছিলেন। তারপরই পুতিনের আগমন, এই ধারাবাহিকতাটি কাকতালীয় নয়। চীন একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য-উত্তেজনা প্রশমিত করছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত বন্ধন গভীর করছে। এই দ্বিমুখী কূটনীতিই বেইজিংয়ের শক্তির প্রধান উৎস।
প্রায় ৪০টি চুক্তি এবং দুটি যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশিত হওয়ায় সংখ্যার বিচারে এই সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ। কিন্তু পুতিনের প্রকৃত অর্জন সংখ্যায় নয়, প্রতীকে। ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত রাশিয়া চীনকে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। গত বছর ২৪০ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং চলতি বছরের প্রথম চার মাসে আরও ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি; এই পরিসংখ্যান বলছে, পশ্চিমা বিচ্ছিন্নতার মুখে রাশিয়া মোটেই বিপর্যস্ত নয়।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যথার্থই বলেছেন, রাশিয়া-চীন সম্পর্ক আধুনিক বিশ্বে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের একটি মডেল—যা সমান অধিকার, পারস্পরিক সমর্থন এবং অকৃত্রিম বন্ধুত্বের ওপর নির্মিত।
এই সফরের অন্যতম সফল ফলাফল হলো 'পাওয়ার অব সাইবেরিয়া দ্বিতীয়' পাইপলাইন প্রকল্পে অগ্রগতির ইঙ্গিত। মঙ্গোলিয়া হয়ে রাশিয়া থেকে চীনে বছরে ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ইউরোপের বাজার হারানো রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে সমন্বয়ের যে অঙ্গীকার এখানে হয়েছে; তা কেবল দ্বিপাক্ষিক সুবিধার কথা বলে না, বরং একটি সমান্তরাল প্রযুক্তি-অর্থনীতি গড়ার স্বপ্নের কথাও জানান দেয়।
তবে দুই নেতার যৌথ ঘোষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার দালিলিক উপস্থাপনা। এটি কূটনৈতিক ভাষায় লেখা হলেও এর বার্তা মোটেই অস্পষ্ট নয়; বরং বিদ্যমান পশ্চিমা আধিপত্যের বিপরীতে একে একটি নীতিগত বিকল্প বলা যায়। এই বিকল্পের মূল ভিত্তি চারটি নীতি:
প্রথমত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার ভিত্তিতে বিশ্বকে উন্মুক্ত রাখা।
দ্বিতীয়ত, সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যেখানে কারও নিরাপত্তা অন্যের ক্ষতির বিনিময়ে অর্জিত হবে না।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও অধিক দেশের অংশগ্রহণ ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার।
চতুর্থত, সভ্যতার বৈচিত্র্য মেনে নিয়ে বিভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি ও সভ্যতার নিজস্ব পথ-পদ্ধতিকে সম্মান করা।
এই চারটি নীতির প্রতিটিই পরোক্ষভাবে পশ্চিমা নীতিরই সমালোচনা। যেমন, 'সমান নিরাপত্তার নীতি' ন্যাটো সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের অভিযোগকে বৈধতা দেয়। 'সভ্যতার বৈচিত্র্যের' আহ্বান মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের পশ্চিমা সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করে। আর 'আন্তর্জাতিক গণতন্ত্রীকরণের' দাবি জাতিসংঘ ও আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানে পশ্চিমা প্রভাবকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ট্রাম্পের উচ্চাভিলাষী 'গোল্ডেন ডোম' ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে যৌথ নিন্দা জানানোও এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র সীমিত রাখার শেষ কার্যকর চুক্তি 'নিউ স্টার্ট'-এর মেয়াদ গত ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়েছে, যার মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই পরিস্থিতিতে পুতিন ও শি-এর যৌথ উদ্বেগ প্রকাশ মূলত একটি পরিষ্কার সংকেত যে, পারমাণবিক ভারসাম্যের প্রশ্নে এই দুই দেশ এখন একই পথে হাঁটবে।
এই মেরুকরণের প্রভাব আফ্রিকা থেকে গ্লোবাল সাউথ পর্যন্ত বিস্তৃত। আফ্রিকার সার্বভৌমত্ব ও স্বায়ত্তশাসন নিয়ে রাশিয়া-চীনের যৌথ ঘোষণাটি ভূরাজনৈতিক বিচারে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ আফ্রিকা মহাদেশে পশ্চিমা উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মস্কো ও বেইজিং নিজেদের বিকল্প শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছে। কিন্তু এই 'স্বাধীনতার' আহ্বানটি কতটুকু আন্তরিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। সমালোচকদের মতে, রাশিয়ার ওয়াগনার গোষ্ঠী মালি থেকে সুদান পর্যন্ত সামরিক প্রভাব বিস্তার করছে, আর চীনের ঋণকূটনীতি কোনো কোনো আফ্রিকান দেশে নতুন নির্ভরতা তৈরি করছে; এই বাস্তবতাকে এড়ানোর কোনো উপায় নেই।
দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার মতো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় ভুক্তভোগী। একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব তাদের জন্য সত্যিকারের সুযোগ হতে পারে; কিন্তু কেবল তখনই, যদি নতুন শক্তিগুলোর আধিপত্য পুরোনো আধিপত্যের স্থান না নেয়।
তাহলে বিশ্ব কি সত্যিই দুই ব্লকে বিভক্ত হচ্ছে? স্নায়ুযুদ্ধের ছকে ভাবলে উত্তরটি 'হ্যাঁ' মনে হতে পারে, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা অনেক জটিল। আজ ভারত রাশিয়া থেকে তেল কিনছে, আবার একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বে আছে। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হয়েও রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ব্যবসা করছে। সৌদি আরব এবং উপসাগরীয় দেশগুলোও সরাসরি কোনো পক্ষ বেছে নিতে নারাজ। এই 'কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন'-ই হলো একবিংশ শতকের বহুমেরুকেন্দ্রিকতার প্রকৃত চরিত্র।
ওই কারণে নতুন মেরুকরণ পুরোনো স্নায়ুযুদ্ধের মতো স্পষ্ট রেখায় বিভক্ত নয়; এটি একটি জটিল ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি দেশ নিজের স্বার্থ ও সুবিধার সমীকরণে অবস্থান নির্ধারণ করছে।
রাশিয়া-চীন অক্ষ নিঃসন্দেহে শক্তিশালী হচ্ছে, কিন্তু এই অক্ষের অভ্যন্তরেও স্বার্থের ভিন্নতা রয়েছে। চীন চায় একটি স্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থা যেখানে তার বাণিজ্য ও প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়বে, আর রাশিয়া চায় পশ্চিমা চাপ থেকে মুক্তি এবং ইউরেশিয়ায় নিজের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার। এই দুই লক্ষ্য সবসময় একবিন্দুতে মেলে না।
বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এই ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের। বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে ছোট ও মাঝারি দেশগুলোর দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ে, একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থ আদায় করার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু একই সঙ্গে, দেশগুলোর প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
ভারত, চীন, রাশিয়া এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে একই সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষার যে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশ মোকাবেলা করছে, তা আগামী দিনে আরও জটিল হবে। সফল পররাষ্ট্রনীতির জন্য এখন প্রয়োজন স্পষ্ট জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ, নীতিগত দৃঢ়তা এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ অংশীদারিত্ব।
পুতিনের বেইজিং সফর মূলত বিশ্বরাজনীতির একটি স্ন্যাপশট, যেখানে দেখা যাচ্ছে দুই বৃহৎ শক্তি মিলে একটি বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার নকশা আঁকছে। এই নকশা কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো এই আহ্বানে কতটা সাড়া দেয়, পশ্চিমা বিশ্ব নিজেকে কতটা পুনর্গঠন করতে পারে এবং রাশিয়া-চীন অক্ষের অভ্যন্তরীণ স্বার্থের ফারাক কীভাবে সামলানো হয় তার ওপর।
ড্রাগন ও ভালুকের এই আলিঙ্গন উষ্ণ কতটা গভীর, সেটাই এখন দেখার বিষয়।