Published : 30 May 2026, 11:34 PM
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্তে গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য জড়ো হওয়া লোকজনকে সাময়িক আশ্রয় দিতে তিনটি অস্থায়ী কেন্দ্র স্থাপন করেছে রাজ্য সরকার।
তাদের বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার আগে নথিপত্র যাচাই করা হবে বলে তথ্য দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
শনিবার দ্য টেলিগ্রাফের খবরে বলা হয়, যেসব ‘বাংলাদেশি’ এতদিন পশ্চিমবঙ্গে অবৈধভাবে বসবাস করছিলেন এবং এখন নিজেদের দেশে ফিরে যেতে চান, তাদের থাকার সুবিধার জন্য উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর চ্যানেলের কাছে অস্থায়ী কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০ জন ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ দেশে ফেরার উদ্দেশে হাকিমপুর সীমান্তে পৌঁছেছেন। তবে তাদের নথিপত্র যাচাই করার পরই কেবল বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

বিধানসভা নির্বাচনে অভাবনীয় জয়ের মাধ্যমে মে মাসের শুরুতে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পরপরই ‘বিতর্কিত’ নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) কার্যকরের ঘোষণা দেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কাউকে বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহ হলেই সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
পাশাপাশি ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ ফেরত পাঠানোর আগে রাখার জন্য রাজ্যের প্রতিটি জেলায় ‘আটক শিবির’ গড়ে তোলা হয়।
রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের কারণে এরইমধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে।
ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে, এরইমধ্যে বেশ কিছু মানুষ স্বেচ্ছায় রাজ্য ছাড়তে বাংলাদেশ সংলগ্ন সীমান্তগুলোতে জড়ো হয়েছেন।
এর আগে বিবিসির খবরে বলা হয়, বৃহস্পতিবার ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, যারা ভারতে অবৈধপথে এসেছিলেন, তারা যদি ‘স্বেচ্ছায়’ ফিরে যেতে চান, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হবে না। তবে ওই ঘোষণার আগেই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য অনেক মানুষ প্রতিদিন হাজির হচ্ছেন সাতক্ষীরা আর পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্ত অঞ্চলে।
রাজ্য সরকারের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়, উত্তর ২৪ পরগনার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে হাকিমপুরে বিএসএফ চেকপোস্টের কাছে কয়েক ডজন নথিপত্র না থাকা ‘অভিবাসী’ বাংলাদেশে ফিরে যেতে জড়ো হয়েছেন। তাদের সবাইকে বসিরহাটের ‘আটক শিবিরগুলোতে’ পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের বরাত দিয়ে দ্য টেলিগ্রাফের শনিবারের খবরে বলা হয়, শুধু প্রকৃত বাংলাদেশিরাই যেন সীমান্ত পার হতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন পুঙ্খানুপুঙ্খ শারীরিক ও নথিপত্র যাচাই প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। যারা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বাংলাদেশি পরিচয় নিশ্চিত করতে পারছেন না, উচ্চতর কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত তাদের ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ আটকে রাখা হচ্ছে।
খবরে বলা হয়, দুদিন আগে পুলিশ সূত্রের বরাতে বলা হয়েছিল ৭০ জন বাংলাদেশিকে এরইমধ্যে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে শুক্রবার উত্তর ২৪ পরগনা জেলার একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুশব্যাক বা বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।
ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ জন বাংলাদেশিকে আটকে রেখেছি, যারা তাদের দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছুক। তাদের নথিপত্র যাচাইয়ের কাজ এখনও চলছে এবং এতে সময় লাগবে। তাদের হাকিমপুর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে স্বরূপনগরের তিনটি পৃথক হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছে।”
দ্য টেলিগ্রাফের ভাষ্য, জ্যেষ্ঠ ওই পুলিশ কর্মকর্তার দাবিটি ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের গত বৃহস্পতিবারের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টের সূত্র ধরে অমিত শাহ বলেছিলেন, রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর শত শত অনুপ্রবেশকারী পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে বাংলাদেশের দিকে চলে যাচ্ছে।
এদিকে স্বরূপনগরের অস্থায়ী হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে জেলা প্রশাসন নারী ও শিশুসহ আটক করাদের জন্য বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে বলেও খবরে দাবি করা হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের বরাতে খবরে বলা হয়, রাজ্য সরকার বিএসএফ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ফিরে যেতে চাওয়া প্রতিটি ব্যক্তির পরিচয় যাচাইয়ের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে।
গত কয়েক দিনে ‘আটক ব্যক্তিদের’ সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় উত্তর ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন প্রথমে তেঁতুলিয়ার একটি মোটেলকে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা ‘আটক শিবিরে’ রূপান্তর করে। পরে আরও দুটি ‘আটক শিবির’ খুলতে বাধ্য হয় তারা।
সীমান্তে জড়ো হওয়াদের ‘বাংলাদেশি’ দাবি করে ইংরেজি সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, গত শুক্রবার তারা বলেছিলেন সরকারি অভিযানের ভয়ই তাদের ভারত ছাড়ার একমাত্র কারণ নয়। অনেকের অভিযোগ, সরকারের অনুপ্রবেশবিরোধী অভিযানের পর বাড়িওয়ালারা আর তাদের আশ্রয় দিতে রাজি হচ্ছেন না।
পশ্চিমবঙ্গে গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত এক তরুণী টেলিগ্রাফকে বলেন, “আমি আমার স্বামীর সঙ্গে বিরাটিতে একটি ভাড়া বাসায় থাকতাম। কিন্তু বাড়ির মালিক আমাদের ঘর খালি করে দিতে বলেন। অন্যথায় আমাকে আইনি সমস্যায় পড়তে হতে পারে। আমরা থাকার জন্য অন্য জায়গা খোঁজার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সবাই আধার কার্ড এবং ভোটার কার্ড চাচ্ছিল, যা আমরা দিতে পারিনি।
“একপর্যায়ে তারা বুঝতে পারে আমরা বাংলাদেশি এবং আমাদের ঘর ভাড়া দিতে অস্বীকার করে। আমাদের অনেকের সাথেই এমনটা ঘটেছে, যা আমাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে।”
আরও পড়ুন-
পশ্চিমবঙ্গে ‘আটক শিবির’ থেকে ৩৮৬ জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রস্তুতি, সীমান্তে আতঙ্কিতদের ভিড়