বিকল্প ন্যাপকিন: গবেষণায় পাট-কচুরিপানা ও কলা গাছের তন্তু

দেশে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারের নারীর প্রতি মাসে বাজারে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনা বিলাসিতার মতই। নারীর প্রয়োজনীয় পণ্যটি সহজলভ্য করার তাগিদে দেশে শুরু হয়েছে বিকল্প স্যানিটারি ন্যাপকিন বানানোর গবেষণা; আর তাতে সম্ভাবনা দেখাচ্ছে পাট, কচুরিপানা ও কলা গাছের তন্তু।

কাজী নাফিয়া রহমানবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 23 April 2021, 02:36 PM
Updated : 23 April 2021, 03:09 PM

গত এক দশকে আফ্রিকার কেনিয়া ও পাশের দেশ ভারতে বিশেষ করে কচুরিপানা ও কলা গাছের তন্তু দিয়ে তৈরি স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রচলিত দেশি-বিদেশি তুলা ও শোষক জেলের বিকল্প স্যানিটারি ন্যাপকিন বানানোর গবেষণা এখনই বাণিজ্যিক উৎপাদনে না গেলেও রয়েছে পরীক্ষামূলক ধাপে; চলছে মানোন্নয়নের চেষ্টা। দেশীয় এই গবেষণায় রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান; কাজ করছেন বেসরকারি উদ্যোক্তারাও।

কচুরিপানা নিয়ে নাজিবার ‘রিসার্জেন্স’

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্পে গিয়ে নারীদের পিরিয়ডে পুরনো কাপড় লুকিয়ে শুকানোর কথা জানতে পারেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএর শিক্ষার্থী নাজিবা নায়লা ওয়াফা ও তার তিন সহপাঠী। 

সামাজিক ব্যবসার সংগঠন রিসার্জেন্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নাজিবা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ভীষণ অস্বাস্থ্যকর লাগল বিষয়টা। তখন আমরা অনুভব করলাম এটা অনেক বড় একটা সমস্যা। আমরা আগে বুঝিওনি এটা এত বড় সমস্যা হতে পারে। আমরা তখন চাইলাম এইসব সুবিধাবঞ্চিত নারীদের স্বল্পমূল্যে কিছু দিতে, যেটা তারা দীর্ঘসময় ব্যবহার করতে পারবেন। পাশাপাশি পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর হবে না।”  

কচুরিপানা দিয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন বানানোর ধারণা কী করে পেলেন নাজিবার টিম?  

“আমরা অনেকগুলো গবেষণায় দেখলাম, কেনিয়ায় কচুরিপানা দিয়ে জানিপ্যাড তৈরি করা হয়। ওদের সাথে কথা বলে, কনসাল্ট করে এবং নানাভাবে এটা নিয়ে জেনে আমরা কচুরিপানা দিয়ে প্যাড তৈরির কাজ শুরু করে দিলাম।”

দেশে কচুরিপানা সহজলভ্য হওয়ায় কাজটা শুরু করায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন এই তরুণরা। কচুরিপানা শুকিয়ে ব্লেন্ডারে গুঁড়ো করে এর সাথে তুলা দিয়ে বানানো হল প্যাড। 

শুরুটা পরীক্ষামূলকভাবে হয়েছিল জানিয়ে নাজিবা বলেন, কচুরিপানা গুঁড়ো করার জন্য বাসায় তারা ব্লেন্ডার ব্যবহার করেছিলেন। পরে কিছু মেশিন ডিজাইন করেন, যা ব্লেন্ডারের মত কাজ করবে। এরপর পুরান ঢাকার ধোলাইখাল থেকে মেশিন বানিয়ে কয়েকজন নারীকে প্যাড বানানোর প্রশিক্ষণ দেন তারা। 

প্রথমে সাতজন ও পরে ১০ জন জেনেভা ক্যাম্পের নারীকর্মী দিয়েই বানানো হয় এই বিকল্প স্যানিটারি ন্যাপকিন।

২০১৭ সালে জেনেভা ক্যাম্পে তিন মাস ও ২০১৮ সালে হাজারিবাগ বস্তিতে সাড়ে চার মাসের দুটি পাইলট প্রকল্প চালায় রিসার্জেন্সের তরুণ উদ্যোক্তারা। এই প্রকল্প দুটিতে আড়াই হাজার নারী তাদের মাসিকের দিনে কচুরিপানা দিয়ে বানানো প্যাড ব্যবহার করেন।

সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য রিসার্জেন্স থেকে নেওয়া এই উদ্যোগ নিয়ে ২০১৮ সালে গ্লোবাল স্টুডেন্ট এন্ট্রাপ্রেনিউর অ্যাওয়ার্ডের (জিএসইএ) বাংলাদেশ পর্বে বিজয়ী হন নাজিবা নায়লা ওয়াফা। 

তাদের বানানো এই বিকল্প স্যানিটারি ন্যাপকিনে ভালো সাড়া পাওয়ার কথা জানিয়ে নাজিবা বলেন, “কচুরিপানার লেয়ারগুলোর শোষণ ক্ষমতা অনেক বেশি, অনেকক্ষণ ব্যবহার করা যায় বলে নারীদের সুবিধা হয়। সাধারণ স্যানিটারি ন্যাপকিনের তুলনায় এটির খরচও কম।” 

উৎপাদনে তিন টাকা ব্যয় হওয়া এই প্যাড চার টাকায় নারীদের হাতে তুলে দেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে এই তরুণদের।

কচুরিপানা থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন বানানোর গবেষণায় এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ সমাধানে কাজ চলছে জানিয়ে নাজিবা বলেন, “এখন আমরা চাচ্ছি প্যাডটাকে একটু নরম করে আনতে। কারণ এটা কিছুটা রাফ হয়ে যায়। আমরা চাচ্ছি আরেকটু মসৃণ করে আনতে। প্যাড আটকে রাখার যে উৎসটা থাকে, সেটা আমরা বানাতে পারিনি। সেই কাজটাই এখন করছি।  

“সমস্যাটা হচ্ছে প্যাডটা লিকেজ হয়ে যায় মাঝে মাঝে। এর লেয়ারটা পেপারের মত হয়ে থাকে, খুব ইজিলি শেপ চেঞ্জ করা যায় না। এই কাজটার জন্য ভালো মেশিন দরকার। সেটা অনেক বেশি দামি।” 

পরীক্ষামূলকভাবে সফলতা লাভের পর এর বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার ইচ্ছার কথাও জানালেন নাজিবা ও তার দল। 

নাজিবা ও তার সহপাঠীরা বিভিন্ন স্কুলে সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারে উৎসাহিত করতে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালাচ্ছেন। 

নাজিবা বলেন, “ভেন্ডিং মেশিনের মাধ্যমে পাবলিক টয়লেটগুলোতে এই প্যাড রাখতে চাই আমরা। মূলত সুবিধাবঞ্চিত নারীদের কাছেই এটি পৌঁছে দিতে চাই।”

সোনালী আঁশের স্যানিটারি ন্যাপকিন

সুলভে পরিবেশ উপযোগী স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহ করতে পাট নিয়ে গবেষণা করে চলেছে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিজেআরআই) দুটি বিভাগ।

২০১৮ সাল থেকে পাট থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন বানানোর এই গবেষণা শুরু হয়েছিল বলে জানালেন টেস্টিং অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডাইজেশনের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সুইটি শাহিনূর।

স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপরের স্তরের মানোন্নয়নের কাজ করছেন তিনি ও তার সহযোগীরা; আর পাট থেকে শোষক তুলা উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানের রসায়ন বিভাগ।

সুইটি শাহিনূর বলেন, “বাজারে তুলার যে স্যানিটারি ন্যাপকিনগুলো পাওয়া যায়, তাতে সিনথেটিকের একটা লেয়ার দেওয়া হয়। কিন্তু আমরা সেটা পাটের সাথে অন্য একটি পলিমার দিয়ে তৈরি করতে চাচ্ছি।

“রসায়ন বিভাগ যে পাল্পের কাজ করছে, সেটা আমরা প্যাডের ভেতরে দেব। তারপর এর ওপরে যে লেয়ারটা রক্ত শোষণ করে নেয়, লিক করতে দেয় না, সেটা দেওয়া হবে।”

এর আগেও  পাটজাত স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে কাজ করেছিল ঢাকার শেরে বাংলা নগরের  পাট ও পাটচাষ সংক্রান্ত এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তবে কিছু ত্রুটির কারণে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানালেন সুইটি শাহিনূর।

“আমরা মেশিন ক্রয় করা অবস্থাতেই আছি। দামটা কমানোর চেষ্টা আছে। পুরোটা মেশিনে করে বাণিজ্যিক উৎপাদন করলে খরচ কমে যায়। কিন্তু আমরা ল্যাবে কাজ করায় খরচটা বেশি আসছে।”

পাট থেকে পাল্প তৈরিতে ল্যাবেই সাত থেকে আট টাকা খরচ পড়ে যাওয়ায় এখন এই খরচ কমিয়ে আনা নিয়ে কাজ চলছে বলে জানালেন এই বিজ্ঞানী।

তার ভাষ্যে, নারীকে মাসিকের দিনে বিকল্প স্যানিটারি ন্যাপকিন দিতে এই গবেষণায় ‘সহযোগিতার অভাব’ হচ্ছে মূল সমস্যা।

“পাট দিয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরিতে আসলে আগ্রহ দেখায় না অনেকেই। কিন্তু দেশীয় একটি পণ্য দিয়ে তৈরি করা গেলে সেটার ব্যবহার যেমন হত, দামটাও কমানো যেত।”

কলা গাছের তন্তু থেকে শিখা প্যাড

কলা গাছের বাকল মিহি করে পিষে এরপর রস ফেলে দিয়ে এই কাঁথ চুলায় জ্বাল দিতে হয়। জ্বাল দেওয়া ওই কাঁথ  রোদে শুকিয়ে ব্লেন্ড করে নেওয়া হয়। এর সঙ্গে পাল্প উড ব্যবহার করে উপরে ফ্লানেল কটন দিয়ে বানানো হয় স্যানিটারি ন্যাপকিন।

মৌলভীবাজারের চা বাগান এলাকার নারীদের মাসিক দিনের নানা জটিলতা জেনে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কলা গাছের তন্তু দিয়ে এই স্যানিটারি ন্যাপকিনের উদ্ভাবক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন থেকে স্নাতকোত্তর করা  মোহন রবিদাস।

বছর খানেক এই গবেষণায় শ্রম ও সময় ব্যয় শেষে এ বছর অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে প্যাডের ট্রায়াল শুরু করেছেন চা বাগানে বেড়ে ওঠা এই যুবক। তিনি এর  নাম দিয়েছেন ‘শিখা প্যাড’। 

চা বাগানের নারীদের স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়ে মোহন রবিদাস বলেন, “তিন-চার বছর আগে লক্ষ্য করলাম যে, চা বাগান এলাকার অনেক নারী মারা যাচ্ছেন, পুরুষের তুলনায় সংখ্যাটা অনেক বেশি। বিষয়টা আমাকে অনেক ভাবিয়েছে।

“মৃতদের পরিবার ও ডাক্তারদের সাথে কথা বলে জানতে পারি, জরায়ু ক্যান্সার ও মাসিকজনিত অন্যান্য জটিলতায় তারা মারা যাচ্ছেন।  এছাড়াও এখানকার নারীরা খুবই মানবেতর জীবন-যাপন করেন, তাদের বেতনও খুব কম। সচেতনতার অভাবে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করা তো দূরের কথা, এটা সম্পর্কে তারা জানেনই না। তখন থেকেই তাদের সচেতন করতে কাজ শুরু করি।”

মাসিকে চা বাগানের নারীরা যে সুরক্ষা নিত, তা স্বাস্থ্যকর না হওয়ায় মোহন শুরুতে প্রচলিত স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ শুরু করেন বলে জানান। শুরুতে ভালো সাড়া মিললেও পরে অনেক নারীই বাজারের প্যাড ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না বলে জানান। কাপড়ই তাদের কাছে বেশি আরামদায়ক ও লম্বা সময় ব্যহারের উপযোগী বলে জানান চা বাগানের নারীরা।

“যেহেতু তারা দীর্ঘদিন কাপড় ব্যবহারে অভ্যস্ত, তাই তাদেরকে কাপড়ের তৈরি কোনো প্যাড দেওয়ার জন্য আমি চেষ্টা চালাচ্ছিলাম।”

শিখা প্যাড উদ্ভাবনের পর এখন পর্যন্ত আড়াইশ জন নারীকে ট্রায়ালের জন্য দেওয়া হয়েছে। এভাবে প্রতি মাসে আড়াইশ জন নারীকে এই প্যাড ব্যবহারের জন্য দেওয়া হবে বলেও জানান মোহন।

তিনি বলেন, “শিখা প্যাড এখন ট্রায়াল পর্যায়ে আছে। আমরা মেয়েদের দিচ্ছি এবং তারা আমাদের ফিডব্যাক দিচ্ছে। সেই অনুযায়ী এর মানোন্নয়নের কাজ করছি।”

গ্রাম এলাকার ও চা বাগানের সুবিধাবঞ্চিত নারীরাই এখন পর্যন্ত তার ‘টার্গেট ইউজার’। শিখা প্যাড বানাতে গিয়ে পাঁচটি মেডিকেল ক্যাম্প থেকে বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছিলেন মোহন রবিদাস।

৭০, ১০০ এবং ১৫০ টাকা- তিন ধরনের দামে শিখা প্যাডের প্যাকেট বিতরণ করা হচ্ছে । প্রতিটি প্যাকেটে তিনটি করে প্যাড থাকছে। দুটি ছয় ঘণ্টা পর পর দিনে ব্যবহারের জন্য এবং একটি রাতের জন্য। আর ১৫০ টাকার প্যাডটির উপরের অংশে ব্যাম্বো ফেব্রিক ব্যবহার করা হয়েছে, যেটির শোষণ ক্ষমতা অনেক বেশি। স্বচ্ছল ও কর্মজীবীদের জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে।

মোহন রবিদাসের শিখা প্যাড ধুয়ে পুনরায় পরা যায়। এভাবে অন্তত ৬ থেকে ৭ মাস তা ব্যবহার করা যাবে বলে আশা এই উদ্যোক্তার।

এখনও বাণিজ্যিক বিপণনে না গেলেও সরকারি সহায়তা পেলে বাণিজ্যিক উৎপাদন যাবেন বলে জানান এর উদ্ভাবক।

তবে এজন্য অনুমোদন নিতে হবে বলে জানাচ্ছে পণ্যের মান নির্ধারণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই) ।

এই সংস্থার উপ-পরিচালক (পাট ও বস্ত্র) নিলুফা হক বলেন, “কচুরিপানা বা কলা গাছের তন্তু এগুলো আমাদের স্টান্ডার্ডের মধ্যে নেই। তবে এগুলো ওনারা আলাদাভাবে মার্কেটিং করতে পারবেন। কিন্তু মার্কেটিং করার আগে আমাদের এখানে আসতে হবে, টেস্টিংয়ের জন্য।”

স্যানিটারি ন্যাপকিন বাজারজাত করতে অনুমোদন আবশ্যক জানিয়ে বিএসটিআইয়ের ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারের সহকারী পরিচালক ও প্রধান কাউছার আহমেদ খান বলেন, “১৮১টি পণ্যের ক্ষেত্রে বিক্রয় ও বিপণনে যেতে হলে আমাদের অনুমোদন লাগবে। পণ্যের নাম যদি স্যানিটারি ন্যাপকিন হয়, সেক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের সার্টিফিকেশন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।”

কলার তন্তু দিয়ে নিজের বানানো স্যানিটারি ন্যাপকিন বাজারজাতে অনুমোদন পেতে বিএসটিআইয়ে নমুনা জমা দিয়ে রেখেছেন বলে জানিয়েছেন মোহন রবিদাস।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক