বাজার করতে গিয়ে বেশি পণ্য কেনা হয় যে কারণে
কফি পান করে বাজারে গেলেও অতিরিক্ত কেনাকাটা হতে পারে।
আধুনিক ‘সুপারশপ’ বা মুদি দোকানে কেনাকাটা করতে গিয়ে সুনির্দিষ্ট তালিকা থাকার পরও বাজেটের বাইরে অতিরিক্ত পণ্য কিনে ফেলা হয় অনেক সময়।
অনেকেই এটিকে সাধারণ অসচেতনতা বা দুর্বল ইচ্ছাশক্তি মনে করলেও, মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে- এর পেছনে মনস্তাত্ত্বিক এবং পারিপার্শ্বিক প্রলোভন কাজ করে।
জীবনধারা ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক ওয়েবসাইট রিয়েলসিম্পল-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কেনাকাটা করার সময় মানসিক, আবেগীয় এবং শারীরিক অবস্থা খরচ করার প্রবণতাকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে।
ক্ষুধার্ত অবস্থায় কেনাকাটা করা
খালি পেটে বা ক্ষুধার্ত অবস্থায় বাজারে যাওয়া অতিরিক্ত কেনাকাটার অন্যতম কারণ।
যুক্তরাষ্টের ক্যালিফোর্নিয়ার স্বাস্থ্য-সেবা প্রতিষ্ঠান ‘কাইজার পার্মানেন্ট’-এর মনোবিদ ডা. জ্যাকি শিয়ালস প্রতিবেদনে বলেন, “পেট খালি থাকলে মস্তিষ্ক তাত্ক্ষণিক তৃপ্তি বা শক্তির সন্ধান করে। ফলে অবচেতন মন শরীরের আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘সেল্ফ-রেগুলেশন’ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
যে কারণে পুষ্টিকর বা প্রয়োজনীয় তালিকার বাইরে গিয়ে চোখের সামনে থাকা যেকোনো মুখরোচক ও উচ্চ ক্যালোরির খাবার ট্রলিতে তোলার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়।”
অপ্রতুলতার মানসিকতা
করোনা মহামারীর সময় দোকানের খালি তাক দেখার অভিজ্ঞতা বা অতীতে জীবনের কোনও পর্যায়ে খাদ্য বা আর্থিক নিরাপত্তার অভাব মানুষের মনে একটি দীর্ঘস্থায়ী ‘স্কার্সিটি মাইন্ডসেট’ বা অপ্রতুলতার মানসিকতা তৈরি করে।
মার্কিন আচরণ বিজ্ঞানী কিভা হ্যানচাক এই বিষয়ে বলেন, “এটি মানুষের অবচেতন মনে ‘ভবিষ্যতের অভাব এড়াতে ‘এখনই অতিরিক্ত মজুত কর’— এমন বার্তা পাঠায়। এই মানসিকতা অনেক সময় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হতে পারে, যেখানে অতিরিক্ত খাবার বা জিনিস ঘরে রাখাকে অবচেতনেই নিরাপত্তার প্রতীক মনে করা হয়।”
ছাড় বা ডিসকাউন্টের ফাঁদে পড়া
কিভা হ্যানচাকের মতে, “যখন কোনও পণ্যের গায়ে আসল মূল্যের পাশে ‘ছাড়ের মূল্য’ লেখা থাকে, তখন মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসল বা উচ্চ মূল্যটিকে নোঙর হিসেবে ধরে নেয়। এই ডিসকাউন্ট বা মূল্য ছাড়ের প্রস্তাবটিকে অবচেতন মন একটি বড় ‘বিজয়’ বা সাশ্রয় মনে করে।”
ফলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কিনে মানুষ মনে করে সে টাকা বাঁচিয়েছে, যা আসলে অহেতুক খরচ বাড়ায়।
ক্যাফিন বা কফির প্রভাব
শপিং করতে যাওয়ার ঠিক আগে কফি বা এনার্জি ড্রিংকস পানের অভ্যাস কেনাকাটার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
‘জার্নাল অফ মার্কেটিং’-এ প্রকাশিত, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা-সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের করা গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যাফিন মানুষের শরীরে ‘ডোপামিন’ বা আনন্দলাভের হরমোনের নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয় এবং মস্তিষ্ককে তীব্রভাবে পুরস্কার-মুখী করে তোলে।
এই অতিরিক্ত উদ্দীপনা ও ‘এনার্জি’র কারণে মানুষ অনেক বেশি আবেগপ্রবণ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, যা অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার প্রবণতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
মানসিক চাপ বা উদ্বেগ
কোনও ব্যক্তি যদি মানসিক চাপ, ক্লান্তি, একাকিত্ব বা বিষণ্ণতার মধ্য দিয়ে যান, তবে সুপারশপের ট্রলিতে নানান চকচকে চকলেট, দামি স্ন্যাকস বা মোমবাতির মতো বিলাসী পণ্য তোলার সময় মস্তিষ্ক এক ধরনের তাত্ক্ষণিক আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে।
মানসিক অস্থিরতার দিনে একটি বাজার ভর্তি ট্রলি মনে এক ধরনের কাল্পনিক নিয়ন্ত্রণ, নিশ্চয়তা এবং সুরক্ষার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, যা সাময়িকভাবে চাপ কমাতে সাহায্য করে।
ডোপামিনের তাত্ক্ষণিক আনন্দ
ডা. জ্যাকি শিয়ালস বলেন, “খাবারের জিনিস কেনার সময় মস্তিষ্ক, আগাম খাওয়ার আনন্দের কথা চিন্তা করে ডোপামিন হরমোন নিঃসরণ করে। এই তাত্ক্ষণিক মনস্তাত্ত্বিক তৃপ্তি দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক বাজেট বা ঘরে থাকা খাবারের অপচয়ের মতো যৌক্তিক চিন্তাগুলোকে সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেয়। ফলে মানুষ ক্ষণিকের ভালো লাগার জন্য প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি পণ্য কিনে বাড়ি ফেরে।”
ফ্রিজ বা রান্নাঘর আগে পরখ না করা
বাজারে যাওয়ার আগে ফ্রিজ বা রান্নাঘর ভালোভাবে পরখ না করা একটি বড় ভুল।
ঘরে কোন কোন উপাদান বা মসলা কতটুকু অবশিষ্ট আছে, সেটা না জানার কারণে প্রতিনিয়ত একই জিনিস বারবার কেনা হয়ে যায়।
এই অসচেতনতার ফলে রান্নাঘরে একই ধরনের পণ্যের স্তূপ তৈরি হয়, যা মাস শেষে টাকা নষ্ট করার পাশাপাশি সরাসরি খাবারের অপচয় ঘটায়।
