০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

যে কারণে বন্ধুর চাইতে শত্রুর নাম বেশি মনে থাকে

শক্রকে মনে রাখার বিষয়টা আদিম যুগ থেকেই মানুষের শরীরে গেঁধে গেছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Oct 2026, 05:40 PM

Updated : 08 Oct 2026, 05:40 PM

সামাজিক সম্পর্কের বৃত্তে নানান ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। কেউ পরম ভালোবাসায় বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়, আবার কেউ অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ বা প্রতারণার মাধ্যমে মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে।

তবে একটি বিষয় খেয়াল করলে দেখা যায়, বহু বছর আগের কোনও বন্ধুর মিষ্টি ব্যবহার অবচেতন মন সহজে ভুলে গেলেও, কারও দেওয়া আঘাত বা তার চেহারা স্মৃতিতে আজীবন স্পষ্ট ও অমলিন থাকে।

অনেকেই একে নিজের ভেতরের ক্ষোভ বা সংকীর্ণতা মনে করলেও, মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে এর পেছনে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়বিক কারণ।

মনস্তত্ত্ব-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘সাইকোলজি টুডে’-তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্নায়ুবিজ্ঞানীরা জানান, মস্তিষ্ক প্রাকৃতিকভাবেই সৌহার্দ্য বা বন্ধুত্বের চেয়ে বৈরিতা ও শত্রুতাকে বড় মাইলফলক হিসেবে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন স্মরণে রাখে।

আদিমতম আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি: আদিম সময়ে যখন মানুষ গুহায় বসবাস করত, তখন বেঁচে থাকার জন্য ‘কে বন্ধু’ তা জানার চেয়ে ‘কে শত্রু বা বিপজ্জনক’ সেটা আগেভাগে অনুমান করা জীবন রক্ষার জন্য বেশি জরুরি ছিল।

এই বিষয়ে মার্কিন সমাজসেবী, লেখক, গবেষক ও হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর সাবেক অধ্যাপক উইলিয়াম এ. হ্যাসেলটাইন বলেন, “এই আদিমতম আত্মরক্ষার তাগিদ আজও মানুষের জিনের মধ্যে রয়ে গেছে। মস্তিষ্ক প্রাকৃতিকভাবেই নেতিবাচক অভিজ্ঞতা বা শত্রুদের একটি ‘হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে ভবিষ্যতে একই ধরনের বিপদ বা আঘাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে অবচেতন মন সেই ক্ষতিকর মানুষের স্মৃতিকে নিখুঁত ও স্থায়ীভাবে মস্তিষ্কে ধরে রাখে।”

অ্যামিগডালা ও কর্টিসলের তীব্র রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া: যখন কোনও ব্যক্তি কোনও শত্রু বা ক্ষতিকর মানুষের মুখোমুখি হয়, তখন মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী কেন্দ্র ‘অ্যামিগডালা’ তীব্রভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে শরীরে স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’ এবং ‘অ্যাড্রেনালিন’-এর নিঃসরণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

“চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, তীব্র আবেগের মুহূর্তে নিঃসৃত এই হরমোনগুলো মস্তিষ্কের স্মৃতি সংরক্ষণ কেন্দ্র ‘হিপোক্যাম্পাস’-কে অত্যন্ত শক্তিশালী সংকেত পাঠায়। এই তীব্র রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে শত্রুর চেহারা, কণ্ঠস্বর বা তার করা অপমানের ঘটনাটি মস্তিষ্কে পাথরের দাগের মতো স্থায়ী হয়ে যায়, যা সাধারণ কোনও ভালো লাগার স্মৃতির ক্ষেত্রে ঘটে না”, ব্যাখ্যা করেন উইলিয়াম এ. হ্যাসেলটাইন।

নেতিবাচক পক্ষপাত: মনস্তত্ত্বের একটি পরিচিত আচরণগত বৈশিষ্ট্য হল ‘নেগেটিভিটি বায়েস’ বা ‘নেতিবাচক পক্ষপাত’। এর মূল কথা হল, মানুষ ইতিবাচক বা ভালো বিষয়ের চেয়ে নেতিবাচক বা খারাপ ঘটনাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়।

উইলিয়াম এ. হ্যাসেলটাইন বলেন, “১০টি ভালো প্রশংসা মনকে যতটুকু প্রফুল্ল করতে পারে, ১টি তীব্র সমালোচনা বা অপমান তার চেয়ে বহুগুণ বেশি মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।”

শত্রুরা যেহেতু মানুষের আত্মসম্মান ও সামাজিক মর্যাদাকে আঘাত করে, তাই মস্তিষ্ক একে একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় মনে করে অনবরত ‘রিওয়াইন্ড’ করতে থাকে, যা অবচেতনেই শত্রুর স্মৃতিকে দীর্ঘায়ু করে রাখে।

দীর্ঘমেয়াদী ক্ষোভের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মুক্তির উপায়

মস্তিষ্কের এই স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা আদিম যুগে উপকারী হলেও, বর্তমান আধুনিক জীবনে বছরের পর বছর ধরে শত্রুর প্রতি ক্ষোভ বা ঘৃণা পুষে রাখা মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

উইলিয়াম এ. হ্যাসেলটাইন বলেন, “অনবরত শত্রুর কথা চিন্তা করলে শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র সবসময় উত্তেজিত থাকে, যা উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, অনিদ্রা এবং দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।”

পুরানো খবর:

স্মরণশক্তির শত্রু কোমল পানীয়
বন্ধুদের মাঝে অবহেলিত কি-না, বোঝার রয়েছে উপায়
বন্ধু পাতানোর রেসিপি