বন্ধু পাতানোর রেসিপি
বেশি বয়সেও বন্ধু তৈরি করা যায়। তবে এজন্য প্রয়োজন মাত্র দুটি উপকরণ।
ইউটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ফ্রেন্ডশিপ রিসার্চ’-এর পরিচালক জেইমি ক্রেমস-এর বয়স তখন ২০। ২০০৮ সালের ঘটনা। এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তার ল্যাপটপটি ধার নিয়েছিল। তারপর ল্যাপটপটি ফেরত পাওয়ার পর, ক্রেমস সেখানে আবিষ্কার করেন, তার রুমমেট আর ওই বন্ধু মিলে জেইমিকে নিয়ে নানান কথা বলেছে।
কথাগুলো মোটেও ভালো ছিল না।
সিএনএন ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সেই দিনের কথা স্মরণ করে ক্রেমস বলেন, “আমি সত্যিই ভীষণ ভেঙে পড়েছিলাম। আর তখন থেকেই আমি এই বিষয়টি বুঝতে চেয়েছিলাম।”
কোন জিনিসটি দুজন বন্ধুকে অন্য একজন তৃতীয় বন্ধুর প্রতি এমন বেদনাদায়ক আচরণ করতে প্ররোচিত করতে পারে?
এই অভিজ্ঞতা ক্রেমসকে প্রাপ্তবয়স্কদের বন্ধুত্ব নিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে ও পড়াশোনা করতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন যে, “এই ক্ষেত্রটিতে মনোযোগ এবং অর্থায়ন— দুই দিক থেকেই ব্যাপকভাবে অবহেলিত। রোমান্টিক সম্পর্ক বা বিপরীতভাবে বৈষম্য ও কুসংস্কারের দিকে পরিচালিত করে- এমন সামাজিক আচরণের আড়ালে এটি ঢাকা পড়ে গেছে।”
“তবে আমি বলব যে, বন্ধুত্ব অনেক বেশি মানুষকে প্রভাবিত করে”, মন্তব্য করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্রিগাম ইয়াং ইউনিভার্সিটি’র মনস্তত্ত্ব এবং স্নায়ু বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. জুলিয়ান হোল্ট-লুনস্ট্যাডের একটি বিশ্লেষণ উল্লেখ করে ক্রেমস জানান, সামাজিক যোগাযোগের অভাব মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর দিনে ১৫টি সিগারেট খাওয়ার মতোই মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
আর গুগল সার্চ ট্রেন্ডের তথ্য উল্লেখ করে তিনি দেখান যে, “আমরা দিন দিন এই বিষয়ে আরও বেশি খারাপ অনুভব করছি।”
‘কীভাবে বন্ধু তৈরি করতে হয়’- এই অনুসন্ধানটি গত বসন্তে সর্বকালের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। আর কীভাবে সঙ্গী খুঁজে পাওয়া যায় বা প্রেমে পড়া যায়, সেই অনুসন্ধানের চেয়ে এটা অনেক বেশি এগিয়ে আছে।
তবে ক্রেমস এবং অন্যদের গবেষণা বলছে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য করার মতো অনেক কিছু রয়েছে।
ক্রেমস বলেন, “যদিও বন্ধুত্বকে একটি ম্যাজিক বা জাদু মনে হয়, তবুও এর মধ্যে কিছু শেখার মতো দক্ষতা বা যোগ্যতা জড়িয়ে রয়েছে। যদি এটি শেখাতে পারতাম, তবে মনে হয় আমরা একাকিত্বের মহামারী সমাধান করতে পারতাম।”
বন্ধুত্বের রেসিপি
অ্যারিজোনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ড্যানিয়েল ক্রুশকা এবং অন্যদের গবেষণার সূত্র ধরে ক্রেমস মন্তব্য করেন, “বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার পেছনে দুটি প্রধান উপাদান কাজ করে; ঘনঘন মিথস্ক্রিয়া বা আদান প্রদান এবং পারস্পরিক আকর্ষণ।”
প্রতি সপ্তাহে একই সময়ে, একটি কফি শপে বসে ডায়েরি লেখার মতো সাধারণ কাজ হলেও, একই জায়গায় একই মানুষের সঙ্গে বারবার উপস্থিত হওয়াই একটি সুন্দর শুরু করার জন্য যথেষ্ট।
“আর সমীকরণের এই অংশ আমাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা তুলনামূলকভাবে সহজ”, ক্রেমস উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, “আপনি যদি ঘনঘন মিথস্ক্রিয়া বা দেখা করার কাজটি করতে পারেন, তবে হয়ত সেখানে এমন কাউকেও পেয়ে যাবেন, যার সঙ্গে আপনার পারস্পরিক আকর্ষণ তৈরি হবে। একটি সুন্দর বন্ধুত্ব তৈরি করতে আপনার এই দুটি উপাদানেরই প্রয়োজন।”
যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথ কলেজের গবেষক ও সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জেনিস ম্যাককেব, এই দুটি বিষয়ে সর্বোচ্চ সফলতা আনতে, জায়গাটিকে ‘ফ্রেন্ডশিপ মার্কেটস’ বা বন্ধুত্বের বাজার হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “এটি মূলত এমন জায়গা যেখানে অনেক মানুষ নতুন বন্ধু তৈরির জন্য মানসিকভাবে উন্মুক্ত থাকে।”
মানুষ কীভাবে এবং কেন পরষ্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়, সেটা তা নিয়ে পড়াশোনা করান এই অধ্যাপক।
তার কথায়, “বন্ধুত্বের বাজার বিবেচনার ক্ষেত্রে আপনার নিজের পরিচয়ের বিভিন্ন দিকগুলো চিহ্নিত করা বিশেষভাবে সহায়ক, এমনকি যে বিষয়গুলো আপনি আশাও করেন না।”
তাই আপনি যদি নিজের নতুন কোনও পরিচয় অন্বেষণ করতে চান, তবে এমন জায়গাগুলো খুঁজুন যেখানে মানুষ নিয়মিত মিলিত হয় এবং একে অপরকে জানার সুযোগ পায়।”
বিশেষ করে যে জায়গাগুলোতে যোগাযোগের জন্য একটি নির্ধারিত সময় থাকে; যেমন—একটি রানিং ক্লাব বা দৌড়বিদদের দল যেখানে দৌড়ানোর পাশাপাশি গল্প করা যায়, অথবা ‘ইমপ্রোভ থিয়েটার’ বা আর্ট ক্লাস।
তিনি আরও যোগ করেন, “প্রবাসী বা বিদেশি কমিউনিটিগুলো ‘চমৎকার বন্ধুত্বের বাজার’-এর একটি বড় উদাহরণ।
প্রায়শই অন্য দেশে বসবাসকারী মানুষ স্থানীয়দের সঙ্গে বন্ধুত্বের আশা করেন, তবে তারা একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া অন্যান্য ‘বিদেশি’ ব্যক্তিদের মধ্যেও দৃঢ় বন্ধন খুঁজে পেতে পারেন, এমনকি তাদের আদি দেশ ভিন্ন হলেও।
ম্যাককেব বলেন, “আমার কাছে এখানে শিক্ষণীয় বিষয় হল, আপনি যখন কোনও নতুন পরিচয়ে স্থানান্তরিত হয়েছেন তখন সেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত না হলও খেয়াল করতে হবে। আর সেই একই পরিচয়ের অংশীদার অন্যান্য মানুষদের খুঁজে নিতে হবে। কারণ তারাও হয়ত সেই পরিচয়ের ভিত্তিতে আপনার সঙ্গে যুক্ত হতে মানসিকভাবে উন্মুক্ত থাকতে পারে।”
সাহায্য চান
গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ পরিচিতদের বন্ধুতে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে ছোটখাটো সাহায্য চাওয়া আসলে সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে।
“বর্তমানে আমাদের সাহায্য চাওয়ার প্রবণতা অনেক কমে গেছে। কারণ আমাদের ফোনে এখন এমন সব অ্যাপ রয়েছে যা আগে বন্ধুরা করত”, বলেন ক্রেমস।
“এসব অ্যাপের মাধ্যমে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেওয়া বা অসুস্থ হলে বাজার করে দেওয়া, বাচ্চাদের দেখাশোনা করা, ফোনে টেলিভিশন ইনস্টল করে দেওয়া বা আসবাবপত্র স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সাহায্য নেওয়া যায়”, বলেন তিনি।
তবে কাউকে কোনও কাজের জন্য অনুরোধ করলে, সেই ব্যক্তি যদি আপনাকে সাহায্য করে, তবে গবেষণায় দেখা গেছে যে, সে আসলে আপনাকে আরও বেশি পছন্দ করতে শুরু করে, ক্রেমস জানান।
তিনি স্বীকার করে বলেন, “আমরা আসলে কারও ওপর বোঝা হতে চাই না। তবে এটি এড়ানোর একটি উপায় হল, অন্য ব্যক্তির জায়গায় নিজিকে বসিয়ে চিন্তা করা। আমি যদি আমার কোনও বন্ধুর জন্য একটা ছোট সাহায্য করতে পারি, তবে নিজেকে অনন্য মনে হয়। আমার খুব ভালো লাগে, পুরো দিনটাই চমৎকার কাটে। ভেবে দেখুন, আপনি অন্য একজনকে সেই সুন্দর অনুভূতিটি উপহার দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন।”
“ঠিক একইভাবে, কোনও কথোপকথনের সময় নিজের মনের একটু দুর্বলতা বা সততার গল্প প্রকাশ করলে সেটা পারস্পরিক বিশ্বাস বাড়াতে একই রকম প্রভাব ফেলে”, বলেন ড. অ্যালিসন নাগেল।
তিনি ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক এবং ‘কানেকশন প্রজেক্ট’-এর পরিচালক, যা কিশোর ও তরুণদের মধ্যে একাকিত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা দূর করতে কাজ করে।
নাগেল সিএনএন-কে বলেন, “প্রচুর গবেষণায় দেখা গেছে যে, আত্ম-প্রকাশই অন্য পক্ষকে আত্ম-প্রকাশে উদ্বুদ্ধ করে। যারা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন, অন্যরা তাদের বেশি পছন্দ করে এবং তাদের বেশি বিশ্বস্ত বলে মনে করে।”
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করছেন নাকি কেবল সাধারণ আড্ডা দিচ্ছেন, সেটা মূল্যায়নের জন্য নাগেল একটি নির্দেশিকা দিয়েছেন।
তিনি নিজেকে প্রশ্ন করতে বলেন যে, “বাসে দেখা হওয়া কোনও অপরিচিত মানুষের সঙ্গেও আপনি এই একই তথ্য শেয়ার করতেন কি না।”
তিনি বলেন, “যদি না করতেন, তবে বুঝতে হবে আপনি সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুটা দুর্বলতা প্রকাশের স্তরে প্রবেশ করছেন।”
নাগেল আরও যোগ করেন যে, “সম্পর্কের সীমানা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই মুহূর্তে সম্পর্কটি আপনাকে যতটুকু দিতে পারে, তার চেয়ে বেশি প্রত্যাশা না করেই আন্তরিক হতে পারেন। ধীরে এবং স্থিরভাবে এগিয়ে যাওয়াই সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিরাপদ পদ্ধতি।”
নিখুঁত সময়ের জন্য অপেক্ষা না করা
বিষয়টি আসলে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ক্রেমস বলেন, “কোনও বন্ধুর সঙ্গে জমিয়ে গল্প করার জন্য পুরো দুই ঘণ্টার একটি নিখুঁত ফ্রি সময়ের জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকবেন না। বরং সেটি ফোন দিয়েই শুরু করা যায়।”
তার কথায়, “মনের গভীর থেকে যুক্ত হওয়া সেই ৫ মিনিটের আন্তরিক কথোপকথন, মাসের পর মাস ধরে করতে চাওয়া দীর্ঘ ফোনালাপের পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।”
“আর যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হলে, হাতছাড়া করবেন না”, মন্তব্য করেন তিনি।
নাগেল একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “ধরুন, ছোটবেলায় আপনার ফুফু বা খালার হাতের রান্না করা একটি বিশেষ খাবার তৈরি করতে চান। এখন আপনি কি ফুফুকে ফোন করে রেসিপিটি নেবেন এবং তার সঙ্গে এক মিনিট গল্প করবেন? নাকি গুগলে সার্চ করে রেসিপি দেখে চেষ্টা করবেন?”
গুগল সার্চের মতো এই ছোট ছোট বিষয়গুলো আসলে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বন্ধনগুলোকে শক্তিশালী হতে বাধা দেয়। তবে মনে রাখতে হবে, এই সামাজিক যোগাযোগের সুফলই বহুগুণ হয়ে ফিরে আসে।
ক্রেমস বলেন, “এটি মানুষের মানসিক চাপ ভালোভাবে সামলানো এবং উন্নত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত, যে কারণে মানুষ কম অসুস্থ হয়।”
তিনি কিছু গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে জানান, বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ও ভালো বন্ধুত্ব স্মৃতিভ্রম বা ডিমেনশা’র ঝুঁকি এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দেয় এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ হ্রাস করে।
ক্রেমস নিজের বক্তব্যের ইতি টেনে বলেন, “বন্ধুত্ব যদি কোনও ল্যাবরেটরির ওষুধ হত, তবে এটি হত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি প্রেসক্রিপশন করা চিকিৎসাগত মেডিসিন।”
