ব্যস্ত জীবনে কমছে বন্ধু, বাড়ছে একাকিত্বের অভিশাপ
একাকিত্ব শরীরে প্রতিদিন ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সমান মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করে।
ডিজিটাল যোগাযোগ প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ এখন একে অপরের সঙ্গে চব্বিশ ঘণ্টাই যুক্ত থাকতে পারছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই লাইক, কমেন্ট আর ইনবক্সের ভিড়েও মানুষ ভেতর থেকে ক্রমেই একা এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
মনস্তত্ত্ব ও সমাজবিজ্ঞানীদের পরিভাষায় মানুষের এই নিঃসঙ্গতা এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুর অভাবকে বলা হচ্ছে ‘ফ্রেন্ডশিপ রিসেশন’ বা ‘বন্ধুত্বের মন্দা’।
জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট রিয়েলসিম্পল ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মনোবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রাপ্তবয়স্কদের এই নিঃসঙ্গতা কেবল কোনো সাময়িক মানসিক কষ্ট নয়; বরং এটি মানুষের গড় আয়ু কমিয়ে দেওয়ার মতো এক নীরব বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকট।
বন্ধুত্বের মন্দা বা ফ্রেন্ডশিপ রিসেশনের কারণ
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্লিসফুল মাইন্ডস সাইকিয়াট্রিক সার্ভিসেস’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ওমোটোলু আজে-ওমোকোরে প্রতিবেদনে বলেন, “চিকিৎসাকেন্দ্রে আসা রোগীদের মধ্যে অনেকেই একা না হলেও তীব্র একাকিত্ব অনুভব করেন।”
এই মনোবিদের মতে, কয়েক দশকের তুলনায় বর্তমান যুগে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার প্রধান কারণগুলো হল-
ব্যস্ত ক্যারিয়ার ও পারিবারিক দায়িত্ব: কঠিন পেশাগত জীবন, সন্তান বা পরিবারের যত্ন নেওয়ার ব্যস্ততা এবং ঘন ঘন বাসস্থান পরিবর্তনের কারণে মানুষ অজান্তেই বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ দূরে সরিয়ে দেয়।
মস্তিষ্কের ‘নো-ডু’ গ্যাপ: আচরণগত মার্কিন স্নায়ুবিজ্ঞানী ও ‘আনস্টপেবল ব্রেইন’ বইয়ের লেখক ডা. কায়রা বোবিনেট বলেন, “অনেকেই জানেন যে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিলে তাদের মন ভালো হবে। তবে অবচেতন মন তাদের সেই কাজটি করতে বাধা দেয়। অতীতে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া, অবহেলা পাওয়া বা বন্ধু দূরে চলে যাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে মস্তিষ্ক নতুন করে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে।
একাকিত্ব থেকে শারীরিক ক্ষতি
ইউএস সার্জন জেনারেলের দাপ্তরিক প্রতিবেদনে, একাকিত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে মহামারী স্তরের একটি মারাত্মক স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘এএনকে বিহেভিয়ারেল হেলথ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ‘সাইকিয়াট্রিক নার্স প্র্যাকটিশনার’ অ্যালিসা কিলিয়ন একটি চাঞ্চল্যকর বৈজ্ঞানিক সত্য প্রকাশ করে বলেন, "সামাজিক যোগাযোগের অভাব বা একাকিত্ব শরীরে প্রতিদিন ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সমান মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করে।"
বন্ধুত্বের অভাব মানুষকে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং ‘বার্নআউট’-এর হাত থেকে রক্ষা করার স্বাভাবিক বর্মটি কেড়ে নেয়।
এই মন্দা কাটিয়ে ওঠার উপায়
শরীরে একাকিত্বের বিষ ছড়িয়ে পড়ার আগেই সচেতনভাবে নিজের সামাজিক সম্পর্কগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি। এই সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা এর জন্য ৩টি সহজ উপায় জানিয়েছেন।
যোগাযোগের লক্ষ্যকে সহজ রাখা
অনেকেই সঠিক কোনো কারণ বা বড় কোনো পরিকল্পনা ছাড়া বন্ধুদের মেসেজ দিতে দ্বিধাবোধ করেন।
ডা. বোবিনেট বলেন, ‘কোনো বন্ধু যদি মেসেজের উত্তর দিতে দেরি করে বা না দেয়, তবে সেটিকে ব্যক্তিগত প্রত্যাখ্যান বা ‘রিজেকশন’ হিসেবে নেওয়া ভুল। প্রত্যাশার পারদ নামিয়ে স্রেফ একটি সাধারণ ‘হ্যালো’ বা ছোট টেক্সট পাঠানোর মাধ্যমেই দীর্ঘদিনের জমে থাকা বরফ গলানো সম্ভব।”
নড়াচড়ার সঙ্গে আড্ডার মেলবন্ধন
ব্যস্ত রুটিন থেকে আলাদা করে আড্ডার সময় বের করা কঠিন হলে, প্রতিদিনের রুটিন কাজের সঙ্গেই বন্ধুকে যুক্ত করা উপকারী।
যেমন- বিকেলের বা সন্ধ্যার হাঁটা, কাঁচাবাজারে যাওয়া বা ঘরের বাইরের খোলা জায়গায় বসে চা পানের মতো সহজ কাজে কোনো পুরানো বন্ধুকে সঙ্গী করে নিলে কোনো মানসিক চাপ ছাড়াই নিয়মিত আড্ডা হয়ে যায়।
পুনরাবৃত্তিমূলক রুটিন তৈরি করা
ওমোটোলু আজে-ওমোকোরের মতে, “বড় কোনো চমৎকার আয়োজনের চেয়ে ছোট, ধারাবাহিক মুহূর্তগুলো সম্পর্ককে বেশি মজবুত করে। তাই বন্ধুদের সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে বা মাসে অন্তত একটি নির্দিষ্ট দিনে আড্ডা, কোনো খেলাধুলা, বা হাঁটার গ্রুপ তৈরির মতো নিয়মিত কোনো চক্র বা রুটিন শুরু করা উচিত, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনের সামাজিক সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।”
আরও পড়ুন
