Published : 04 Oct 2025, 04:41 PM
সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও আন্তঃসম্পর্ক জীবনের মান ও দীর্ঘায়ু বাড়ায়। আর এগুলো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে দায়িত্বহীনতা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ কিংবা অযথা দূরত্ব তৈরি করার প্রবণতাও আছে অনেকের মাঝে।
ফলে সমাজে একাকিত্বের প্রবণতা ভয়ঙ্কর আকারে দেখা দিচ্ছে।
একাকিত্বের মহামারী
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘গ্যালপ’ জরিপে প্রতি পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন জানিয়েছেন যে- তারা আগের দিন বেশিরভাগ সময় একাকিত্ব অনুভব করেছেন।
অথচ গবেষণা বলছে, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মানসিক চাপ কমায়, আনন্দ বাড়ায় এবং মানুষকে দীর্ঘায়ু করে তোলে। তবে সেই সম্পর্ক রক্ষা করার জন্য যত্নশীলতা ও দায়িত্ববোধ অনেকের মধ্যেই কমে যাচ্ছে।
যে কোনো অনুষ্ঠান থেকে দূরত্ব বাড়ানো
বিয়ের অনুষ্ঠান, ‘হাউজ-ওয়ার্মিং’, নববর্ষ বা জন্মদিন— সব ক্ষেত্রেই আয়োজনকারী হয়ত বন্ধুর অনুপস্থিতির যন্ত্রণা অনুভব করেন।
অনেক অতিথি পূর্বঘোষণা দিয়েও উপস্থিত হন না। আবার কেউ কেউ শেষ মুহূর্তে বাতিল করেন তুচ্ছ কারণে। এতে তৈরি হয় মানসিক হতাশা।
শিকাগো-ভিত্তিক আলোকচিত্রী র্যাচেল লাভলি সিএনএন ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ প্রসঙ্গে বলেন, “সবাই চায় একটি শক্তিশালী সামাজিক পরিমণ্ডল বা ‘ভিলেজ’। তবে খুব কম মানুষই ‘ভিলেজার’য়ের ভূমিকা নিতে চায়।”
ছোট ছোট সহযোগিতা, যেমন— অসুস্থ বন্ধুকে খাবার দিয়ে আসা, কারও জন্য ডাক সংগ্রহ করা, বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়া— এগুলো একসময় সামাজিক জীবনের স্বাভাবিক অংশ ছিল। এখন সেই সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে।
দায়িত্ব, কর্তব্য ও বন্ধুত্ব
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নারী-সম্পর্ক-বিষয়ক স্বাস্থ্যশিক্ষক ড্যানিয়েল বায়ার্ড জ্যাকসন একই প্র্রতিবেদনে বলেন, “অবশ্যই কর্তব্য, দায়িত্ব, প্রতিশ্রুতি, অসুবিধা কিংবা সময় দেওয়া— এসব শব্দ হয়ত খুব আকর্ষণীয় শোনায় না। তবে এগুলো ছাড়া গভীর ও সুস্থ সম্পর্ক তৈরি সম্ভব নয়।”
অন্যদিকে, ‘ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড’য়ের মনোবিজ্ঞানী ডা. মারিসা জি. ফ্রাঙ্কো উল্লেখ করেন, “বন্ধুর অনুষ্ঠানে উপস্থিত না হওয়ার বৈধ কারণ হতে পারে জরুরি অবস্থা বা বিশেষ পরিস্থিতি। তবে শুধুমাত্র মন খারাপ কিংবা সামান্য অজুহাত কোনো বৈধ কারণ নয়।”
সম্পর্ক রক্ষায় ‘হ্যাঁ’ বলার আগে ভাবুন
ড্যানিয়েল বায়ার্ড জ্যাকসন এবং ডা. মারিসা ফ্রাঙ্কো- দুজনেই মনে করেন, কোনো অনুষ্ঠানে ‘হ্যাঁ’ বলার আগে ভেবে দেখা জরুরি।
যদি জানেন যে কর্মব্যস্ততার কারণে শেষমেশ যেতে পারবেন না, তবে আগে থেকেই না বলা উত্তম। প্রতিশ্রুতি ভেঙে শেষ মুহূর্তে বাতিল করা বন্ধুত্বে আঘাত হানে।
একইসঙ্গে তারা বলেন, “সময় ব্যবস্থাপনার অভাবও বড় সমস্যা। প্রতিনিয়ত কাজ ফেলে রেখে দেরি করা, ডাবল-বুকিং করা বা ব্যক্তিগত অনুভূতিকে সবসময় অগ্রাধিকার দেওয়াই অনেক বন্ধুত্বের ক্ষতি করছে।”
বন্ধুত্বে পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব
কোনো বন্ধুর বাসা বদলানোর সময় সাহায্য করা হয়ত কষ্টকর মনে হতে পারে।
তবে ড্যানিয়েল বায়ার্ড জ্যাকসন ব্যাখ্যা দেন, “এটি কেবল শারীরিক শ্রম নয়, বরং একসঙ্গে নতুন অধ্যায়ের সূচনাকে ভাগ করে নেওয়া। এতে সম্পর্ক আরও মজবুত হয়।”
গবেষণাও বলছে, অন্যকে সাহায্য করার মাধ্যমে মানুষ নিজের মধ্যেও তৃপ্তি, আত্মসম্মান ও জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পায়। দীর্ঘায়ুর সঙ্গেও এই অভ্যাসের যোগ রয়েছে।
‘না’ বলা বনাম ‘সৎ’ভাবে বলা
অনেকেই শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠানে যেতে না পারলে ‘নো ওয়রিজ’ বা ‘চিন্তার কিছু নাই’ বলে বিষয়টিকে এড়িয়ে যান।
তবে মনোবিজ্ঞানী ফ্রাঙ্কো মনে করিয়ে দেন, এটি আসলে ভুল বার্তা দেয়। এতে বন্ধুরা ধরে নেয় তাদের আচরণে কোনো সমস্যা নেই। অথচ খোলাখুলি জানানো উচিত যে এমন আচরণ কষ্ট দিয়েছে।
সীমারেখা নাকি স্বার্থপরতা?
বর্তমানে অনেকেই নিজেদের সীমারেখা বা ‘বাউন্ডারি’ আঁকার কথা বলেন।
কিন্তু ডা. ফ্রাঙ্কোর মতে, “যদি সবসময় নিজের সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেন এবং মনে করেন যে কোনো সময় বাতিল করলেও আবার আমন্ত্রণ পাবেন— সেটি কোনো সীমারেখা নয়, বরং নিছক স্বার্থপরতা।”
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার পথ
আরও পড়ুন