রোমান্টিক সম্পর্কে বিকল্পের গোলকধাঁধা
‘হয়ত এর চেয়েও চমৎকার মানুষ আছে’, এই মানসিকতার কারণে বর্তমান সম্পর্ক ভালো হলেও মানুষ বিকল্প খুঁজতে থাকে।
পরিচিত একটি প্রবাদ হল— ‘মরুভূমিতে প্রতিটি কাঁটাই হল গোলাপ।’ অর্থাৎ, যখন কোনও কিছুর অভাব থাকে, তখন সামান্য প্রাপ্তিও অনেক মূল্যবান মনে হয়।
তবে বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তি, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডেইটিং অ্যাপের যুগে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো।
মানুষ যেন এক অভাবনীয় রোমান্টিক প্রাচুর্য বা ‘রোমান্টিক অ্যাবানডেন্স’-এর যুগে বাস করছে, যেখানে শুধু একটি ‘সোয়াইপ’ করলেই নতুন সঙ্গী খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে, এত বেশি সুযোগ ভালোবাসার সম্ভাবনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে চিত্রটা আসলে উল্টো।
মনস্তত্ত্ব-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘সাইকোলজি টুডে’-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অতিরিক্ত বিকল্পের এই প্রাচুর্য প্রাথমিক পর্যায়ে সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার কাজটিকে সহজ করলেও, একটি দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘প্যারাডক্স অব অ্যাবানডেন্স’ বা প্রাচুর্যের কূটাভাস।
এই তথ্য জানিয়ে ইসরায়েলের হাইফা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন সভাপতি ও দর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপক ডা. অ্যারন বেন-জেভ, প্রতিবেদনে আরও বলেন, “মানুষের অবচেতন মন অতিরিক্ত ‘চয়েস’ বা বিকল্পের কারণে সম্পর্ক নষ্ট করে ফেলে।”
‘নিখুঁত মানুষ’ বনাম ‘উপযুক্ত সঙ্গী’ খোঁজার মানসিকতা
মনস্তত্ত্বের নিয়মে ক্রেতা বা প্রেমীদের মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়— ‘ম্যাক্সিমাইজার’ এবং ‘স্যাটিসফাইসার’।
ম্যাক্সিমাইজারেরা জীবনে ‘সবচেয়ে নিখুঁত’ উপাদানটি খুঁজতে চান। অন্য দিকে, স্যাটিসফাইসারেরা একটি ন্যূনতম উপযুক্ত ও মানানসই সামঞ্জস্য পেলেই সন্তুষ্ট হন।
ড. অ্যারন বেন-জেভের মতে, “আধুনিক ডেইটিং অ্যাপের অন্তহীন অপশন বা বিকল্প, মানুষকে অবচেতনভাবেই এক ক্ষতিকর ‘ম্যাক্সিমাইজিং মাইন্ডসেট’-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে মানুষ তার বর্তমান সঙ্গীর ভেতরের ভালো গুণগুলো উপভোগ করার পরিবর্তে, অন্যদের সঙ্গে তুলনা করা, চারপাশের মানুষ বা কাল্পনিক কোনও ‘নিখুঁত মানুষের’ সঙ্গে তুলনা করতে থাকে।
এই ক্রমাগত তুলনা মনের গভীর অনুশোচনা এবং অসন্তোষের উদ্রেক ঘটায়, যা একটি সুস্থ সম্পর্ককে অকালে ভেঙে দিতে পারে।”
‘না চলা পথের’ কাল্পনিক আকর্ষণ
যখন চারপাশে প্রচুর বিকল্প অনবরত চোখের সামনে ভাসতে থাকে, তখন একটি সুনির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ থাকাকে মানুষ ‘কমিটমেন্ট’ মনে করে না; বরং অবচেতনে মনে হতে থাকে সে বুঝি জীবনের বড় কোনও সুযোগ বা উত্তেজনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যাকে বলা হয় ‘ফোমো’ বা ‘ফিয়ার অফ মিসিং আউট’।
ফরাসি লেখিকা জর্জ স্যান্ডের একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে, “এই জীবনে একটাই সুখ, তা হল ভালোবাসানো এবং ভালোবাসতে পারা।”
তবে আধুনিক প্রেমিক বা প্রেমিকারা একটি ভালো সম্পর্কের মধ্যেও শান্তি পান না, কারণ তাদের মনে হতে থাকে- হয়ত এর চেয়েও চমৎকার কেউ একজন ঠিক পরের ‘সোয়াইপ’-এ অপেক্ষা করছে!
এই কাল্পনিক মোহের পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ হাতের কাছের বাস্তব ও উপযুক্ত সঙ্গীর ‘রিলেশনাল ভ্যালু’ বা পারস্পরিক বোঝাপড়ার মূল্য বুঝতে ব্যর্থ হয়।
বিকল্প ভাবা ও সম্পর্কের অবমূল্যায়ন
মার্কিন অভিনেত্রী মে ওয়েস্ট একবার রসিকতা করে বলেছিলেন, “বৃষ্টির দিনের জন্য একজন বয়ফ্রেন্ড বাঁচিয়ে রাখ, আর আরেকটি রাখ, যদি বৃষ্টি না হয়!”
বর্তমান যুগে এই ‘ব্যাকআপ স্ট্র্যাটেজি’ বা বিকল্প মজুত রাখার প্রবণতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
২০২৪ ও ২০২৬ সালে ‘সেক্সুয়ালিটি অ্যান্ড কালচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একাধিক সমাজবৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, ‘পলিঅ্যামোরাস’ বা বহুমুখী সম্পর্কে জড়ানো মানুষ সাময়িক যৌন তৃপ্তি পেলেও দীর্ঘমেয়াদে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা ও একাকিত্বে ভোগেন।
যখনই কোনও সম্পর্কে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি বা খটমট দেখা দেয়, তখন সেই সমস্যা সমাধান করার বা সম্পর্কে মানসিক শ্রম বিনিয়োগ করার চেষ্টা বন্ধ করে দেয়; কারণ অবচেতন মন জানে যে, তার কাছে ‘ব্যাকআপ অপশন বা প্রতিস্থাপনের পথ খোলা রয়েছে।
ফলে সম্পর্কের গভীরতা ও নির্ভরযোগ্যতা তৈরি হতে পারে না।
প্রতিশ্রুতির অভাব ও ‘লেস ইজ মোর’ নীতি
২০০৩ সালে প্রকাশিত, যুক্তরাষ্ট্রের পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ও মনোবিজ্ঞানের দুই গবেষক বেনজামিন লি এবং ক্রিস্টোফার আর. অ্যাগনিউ-এর গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে ডা. বেন-জেভ জানান, একটি সম্পর্কের প্রতি মানুষের প্রতিশ্রুতি বা কমিটমেন্ট মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
সম্পর্কের সন্তুষ্টি, সম্পর্ক ভাঙার সামাজিক বা ব্যক্তিগত মূল্য এবং বাইরে থাকা বিকল্পের মান।
“আশার কথা হল, গবেষণায় দেখা গেছে যদি দুজনই একে অপরের প্রতি শতভাগ সন্তুষ্ট থাকেন, তবে বাইরে চমৎকার বিকল্প থাকলেও সেগুলো মনের কাছে আকর্ষণীয় লাগে না। তবে যখনই সামান্য অসন্তুষ্টি দেখা দেয়, তখনই অতিরিক্ত অপশনের উপস্থিতি মানুষকে সম্পর্ক থেকে দ্রুত পালাতে প্ররোচিত করে”, বলেন এই মনোবিদ।
এই সংকট কাটাতে বিশেষজ্ঞরা ‘লেস ইজ মোর’ বা অল্পতেই সুখী হওয়ার নীতি অনুসরণের পরামর্শ দেন।
রোমান্টিক বিকল্পের সংখ্যাকে নিজের ইচ্ছায় সীমিত করে, যেকোনও একজন সুনির্দিষ্ট মানুষের ওপর সম্পূর্ণ মনোযোগ ও মানসিক শক্তি বিনিয়োগ করাই হতে পারে আধুনিক যান্ত্রিক জীবনে গভীর, অর্থবহ এবং দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসা খুঁজে পাওয়ার কৌশল।
