দাম্পত্য জীবনে ‘ফুড ডিভোর্স’ বলতে যা বোঝায়
শুনতে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার মতো মনে হলেও এর সঙ্গে দাম্পত্য বিচ্ছেদের কোনও সম্পর্ক নেই।
দুজন মানুষের পছন্দ, কাজের সময়, ক্ষুধার ধরন বা খাবারের অভ্যাস সব সময় এক হবে, এমনটা নয়।
অথচ দাম্পত্য জীবনে অনেক সময় ধরে নেওয়া হয়, প্রতিদিন একই সময়ে একই টেবিলে বসে খাওয়াই ভালো সম্পর্কের একটি চিহ্ন।
তবে আলাদা সময়ে খাওয়া বা নিজেদের পছন্দমতো খাবার বেছে নেওয়া সম্পর্কের জন্য খারাপ কিছু নাও হতে পারে। বরং খাবার নিয়ে অযথা চাপ ও বিরোধ কমলে, দুজনের মধ্যে অন্যভাবে সুন্দর সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই ধারণাকে বলা হচ্ছে ‘খাবারের বিচ্ছেদ’ বা 'ফুড ডিভোর্স'। নামটি শুনতে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার মতো মনে হলেও এর সঙ্গে দাম্পত্য বিচ্ছেদের কোনও সম্পর্ক নেই।
বরং এখানে বোঝানো হচ্ছে, দুজন মানুষ একই সম্পর্কে থেকেও খাবারের ক্ষেত্রে নিজেদের প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী স্বাধীনতা রাখবেন।
মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ব্রিটানি উলফোর্ড এই বিষয়ে জীবনযাপন-বিষয়ক ওয়েবসাইট রিয়েলসিম্পল-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “এই ধরনের ব্যবস্থায় প্রত্যেকে নিজের খাবারের প্রয়োজন নিজেই সামলান। কে কী খাবেন, কখন খাবেন, কীভাবে রান্না করবেন বা বাইরে থেকে খাবার আনবেন কি না—এ সব সিদ্ধান্ত নিজের মতো নেওয়া যায়।”
অন্যদিকে খাবার ও মানসিকতার সম্পর্ক নিয়ে কাজ করা মার্কিন পরামর্শক জেনি ইডেন বার্ক বলেন, “দাম্পত্য সম্পর্কে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাবার নিয়েও নিজেদের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। সবকিছু একসঙ্গে করতেই হবে, এমন ধারণা অনেক দম্পতির কাছে পুরানো।”
‘খাবারের বিচ্ছেদ’ আসলে কী
সহজভাবে বললে, ‘খাবারের বিচ্ছেদ’ হল এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে দম্পতি প্রতিদিনের খাবারকে সম্পর্কের বাধ্যতামূলক যৌথ কাজ হিসেবে দেখেন না।
একজন নিজের পছন্দের খাবার রান্না করতে পারেন, অন্যজন নিজের জন্য আলাদা খাবার তৈরি করতে পারেন। কেউ আগে খেতে পারেন, অন্যজন পরে। প্রয়োজনে দুজন আলাদা জায়গায় বসেও খেতে পারেন।
এর অর্থ এই নয় যে তারা একে অপরের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছেন। বরং খাবারের বিষয়টি নিয়ে অযথা চাপ কমিয়ে সম্পর্কের অন্য জায়গাগুলোতে সময় ও মনোযোগ দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য।
ব্রিটানি উলফোর্ডের মতে, “কাজ শেষে বাড়ি ফিরে আবার রান্না করা অনেকের কাছেই আনন্দের সময় নয়। বরং কে রান্না করবেন, কী রান্না হবে, কখন খাওয়া হবে— এসব নিয়ে চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে যে খাবারের সময়টিকে আনন্দের হওয়ার কথা, সেটিই বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
আলাদা খাওয়া কি সম্পর্কের জন্য খারাপ?
শুধু আলাদা সময়ে বা আলাদা খাবার খাওয়াকে সম্পর্কের সমস্যার লক্ষণ হিসেবে দেখেন না, ব্রিটানি উলফোর্ড।
তার মতে, “প্রত্যেকে নিজের খাবারের দায়িত্ব নিলে দুজনই নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী খেতে পারেন। একই সঙ্গে বাজার করা, রান্না করা বা খাবারের পরিকল্পনার দায়িত্বও একজনের ওপর একতরফাভাবে পড়ে না।”
তবে আলাদা খাওয়া যদি দুজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার প্রবণতার অংশ হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ, অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া এবং একসঙ্গে সময় কাটানোর ছোট ছোট অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।
খাবারের টেবিল এসবের একটি মাধ্যম হতে পারে, তবে একমাত্র মাধ্যম নয়।
অর্থাৎ একসঙ্গে খাওয়া বন্ধ করলেই সম্পর্ক দুর্বল হবে, এমন নয়। বরং দুজন মানুষ একে অপরের জন্য সময় রাখছেন কি-না, কথা বলছেন কি-না এবং একে অপরের জীবনে মনোযোগ দিচ্ছেন কি-না, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
খাবারের টেবিল ছাড়াও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়
দুজনের কাজের সময় যদি আলাদা হয়, তাহলে সকালের এক কাপ চা বা কফির সময় একসঙ্গে বসা যেতে পারে। রাতে ঘুমানোর আগে কিছুক্ষণ গল্প করা, পাশাপাশি হাঁটতে যাওয়া বা দিনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলাও সম্পর্কের জন্য অর্থপূর্ণ সময় হতে পারে।
এমনকি দুজন আলাদা সময়ে রাতের খাবার খেলেও সপ্তাহে এক বা দুই দিন একই টেবিলে বসার ব্যবস্থা করা যায়। দুজনের খাবার আলাদা হলেও সমস্যা নেই।
মূল বিষয় হতে পারে সেই সময়টিতে একে অপরের সঙ্গে মনোযোগ দিয়ে থাকা।
ব্রিটানি উলফোর্ড মনে করেন, “বাধ্যতামূলকভাবে সপ্তাহের সাত দিন একসঙ্গে তাড়াহুড়ো করে খাওয়ার চেয়ে সপ্তাহে দুদিন মনোযোগ দিয়ে একসঙ্গে খাওয়া বেশি অর্থপূর্ণ হতে পারে। সেই সময় মোবাইল ফোন, টেলিভিশন বা অন্য কোনও যন্ত্র দূরে রেখে শুধু দুজনের কথাবার্তায় মন দেওয়া যায়।”
পুরানো অভ্যাস বদলানোও স্বাভাবিক
পরিবারের রীতিনীতি সব সময় একই থাকে না। সন্তান বড় হয়, চাকরি বদলায়, কাজের সময় পরিবর্তিত হয় এবং পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনও বদলে যায়। ফলে আগে যে নিয়মটি ভালোভাবে চলছিল, কয়েক বছর পর সেটি হয়তো আর বাস্তবসম্মত থাকে না।
তাই কোনও দিন একসঙ্গে খাওয়া, কোনও দিন আলাদা সময়ে খাওয়া— দুটিই একই সম্পর্কের মধ্যে সম্ভব।
একসঙ্গে থাকার মানে সবকিছু একসঙ্গে করা নয়
দাম্পত্য সম্পর্কে দুজনের সব পছন্দ একই হওয়া জরুরি নয়। একজন হয়ত ভাত ও মাছ খেতে পছন্দ করেন, অন্যজন হয়ত হালকা খাবার পছন্দ করেন।
একজন সন্ধ্যায় খেতে চান, অন্যজন রাতে দেরিতে। একজন রান্না করতে ভালোবাসেন, অন্যজন রান্নার বদলে অন্য কাজে সময় দিতে স্বচ্ছন্দ।
এই পার্থক্যগুলোকে সবসময় সমস্যা হিসেবে দেখলে প্রতিদিনের জীবন অযথা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বরং কোথায় দুজনের মিল প্রয়োজন আর কোথায় ব্যক্তিগত স্বাধীনতা দেওয়া যায়, সেটি বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
