Published : 02 Jan 2025, 01:20 PM
স্বাস্থ্যকর খাবার তেলের নামের ক্ষেত্রে প্রথমেই মাথায় আসে খাওয়ার অলিভ অয়েল’য়ের কথা।
তবে এই তেল দিয়ে দৈনন্দিন সাধারণ খাবার রান্নার কথা কেউ হয়ত চিন্তা করেন না। বরং বিশ্বের আরও অনেক দেশের মতো এখানেও সাধারণ রান্নায় সয়াবিন তেলেই বেছে নেওয়া হয়।
রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই বিষয়ে ‘অলিভ অয়েল অ্যান্ড ভিনেগার লাভার্স কুকবুক’য়ের লেখক এমিলি লাইকোপোলাস বলেন, “যেহেতু জলপাই থেকে অলিভ অয়েল বা জলপাইয়ের তেল উৎপন্ন করা হয় সেহেতু একে বলা হয় ফলের তেল। আর সয়াবিন তেল হল উদ্ভিজ্জ তেল, কারণ এটা তৈরি করা হয় সয়াবিন শষ্য থেকে।”
কানাডাতে জন্ম নেওয়া এই রেসিপি বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, “জলপাইয়ের তেল উৎপন্ন করা হয় আর সয়াবিন তেল তৈরি করা হয়- এভাবে বলার কারণ হল এই দুই তেলের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।”
প্রস্তুতকরণ প্রক্রিয়া
লাইকোপোলাস বলেন, “ভার্জিন অলিভ অয়েল (ভিওও) এবং এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল (ইভিওও)- অনেকটা টাটকা ফলের রস বলা যেতে পারে।”
এই তেল উৎপন্ন করতে কোনো তাপ প্রয়োগ করা হয় না এবং মেশানো হয় না কোনো রাসায়নিক।
ভিওও এবং ইভিওও উৎপন্ন করা হয় জলপাই থেকে যান্ত্রিকভাবে নিষ্কাষিত করার মাধ্যমে। ফলে স্বাদ ও পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ন থাকে। আর একটি মাত্র উপাদান অর্থাৎ শুধুমাত্র জলাপাই ব্যবহার করে এই তেল উৎপন্ন করা হয়।
অন্যদিকে, উদ্ভিজ্জ তেল হল অতিমাত্রায় প্র্রক্রিয়াজাত।
লাইকোপোলাস ব্যাখ্যা করেন, “উদ্ভিজ্জ তেল অবশ্যই রাসায়নিক ভাবে নিষ্কাষিত করে পরিশোধনের মাধ্যমে মানবদেহের জন্য ভোজ্য উপযোগী করা হয়।”
তাই বলা হয় উদ্ভিজ্জ তেল হল অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার। আর এই পদ্ধতি আজকের না, অন্তত ২শ’ বছর আগের- জানান তিনি।
পুষ্টিগুণ
অলিভ অয়েল’য়ের নানান পুষ্টি উপকারিতা নিয়ে গোপন কিছু নেই। স্পেনের ‘ইউনিভার্সিটি অফ পাবলো দে ওলাভি’র বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় ৩১টি ভোজ্য তেলের সাথে পুষ্টিগুণের বিচারে ভিওও তালিকার শীর্ষস্থানে জায়গা করে নেয়।
উচ্চমাত্রায় মনোআনস্যাচুরেইটেড ফ্যাটি অ্যাসিডস (এমইউএফএ’স) সমৃদ্ধ, যা অনেক ধরনের স্বাস্থ্যকর চবির উৎস। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ‘পলেফেনলস’ মিলে অলিভ অয়েল থেকে। যা নানান ধরনের রোগ হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, মাখন ও মার্জারিন’য়ের তুলনায় উদ্ভিজ্জ তেলকে হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হিসেবে চিহ্নত করা হয়। সয়াবিন তেলে তুলনামূলকভাবে কোলেস্টেরলের মাত্রা কম, যা হৃদরোগ হওয়ার ঝুঁকি কমায়। তবে অলিভ অয়েল’য়ের মতো পুষ্টিকর নয়।
স্মোক পয়েন্ট
লাইকোপোলাস বলেন, “নামের মধ্যেই বিষয়টার ব্যাখ্যা রয়েছে। মানে হল কোন তেল কত মাত্রার তাপে ধোঁয়া তৈরি করে।”
বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ কারণ ধোঁয়া ওঠা শুরু করলেই তেল ভাঙা শুরু করে, এই প্রক্রিয়াতে উৎপাদিত হয় ক্ষতিকর উপাদান।
‘নর্থ আমেরিকান অলিভ অয়েল অ্যাসোসিয়েশন’য়ের তথ্যানুসারে ইভিওও’য়ের স্মোক পয়েন্ট হল ৩৫০ থেকে ৪১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট।
অন্যদিকে উদ্ভিজ্জ তেলের স্মোক পয়েন্ট বেশি, ৪৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে। যে কারণে কম তাপ-সহ মাঝারি ও বেশি তাপে রান্নার জন্যও উপযোগী।
তাই বলে কী অলিভ অয়েল সাধারণ রান্নায় ব্যবহার করা যাবে না?
সাধারণত সালাদে বা কাঁচা পরিবেশন করা হয় এমন খাবারে মেশানোর জন্য রাখা হয় অলিভ অয়েল। ভাজাপোড়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার হয় না।
তবে ফ্লোরিডা’র ‘অলিভ অয়েল অফ দ্য ওয়ার্ল্ড ইন নর্থ পাম বিচ’য়ের কর্ণধার এবং অলিভ অয়েল বিশেষজ্ঞ এর্সিলিয়া মোরেনো একই প্রতিবেদনে বলেন, “অবশ্যই অলিভ অয়েল দিয়ে সাধারণ রান্না করা যায়।”
সতে বা সবজি হালকা ভাজা, রোস্ট করার কাছে সহজেই অলিভ অয়েল ব্যবহার যোগ্য। পাশাপাশি ডুবো তেলে ভাজা খাবার তৈরির জন্যও এই তেল ব্যবহার করা যায়। আর ভাজা পোড়ায় ব্যবহার করলে স্বাদও বাড়ে।
অলিভ অয়েলে ভাজার জন্য সঠিক তাপমাত্রা থাকা উচিত হবে ৩২৫ ও ৩৭৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট।
প্রচলিত আছে যে, অলিভ অয়েল দিয়ে কম তাপে রান্না করতে হয়। কারণ এর স্মোক পয়েন্ট কম। ফলে অতি তাপে এই তেলের গুণ নষ্ট হয়ে যায়।
লাইকোপোলাস বলেন, “এটা হইল অলিভ অয়েল নিয়ে ছড়িয়ে থাকা একমাত্র গুজব, যা সঠিক নয়। কারণ এই তেল উচ্চ তাপামাত্রাতেও ব্যবহার করা যায়।”
এর তাপ সহ্য করার ক্ষমতা ৪০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত যায়।
তাই উদ্ভিজ্জ তেলের পরিবর্তে অলিভ অয়েল সহজেই যেমন ব্যবহার করা সম্ভব তেমনি আলাদা স্বাদ ও অতিরিক্ত পুষ্টিগুণ পেতে সাহায্য করবে।
বেইকিংয়ে অলিভ অয়েল ব্যবহার করা যায় কী?
মোরেনো বলেন, “একশতভাগ যায়। যে কোনো রেসিপি অনুসরণ করুন না কোনো, কেক বিস্কুট এই ধরনের বেইক করা খাবার তৈরিতে সহজেই অলিভ অয়েল ব্যবহার করতে পারেন যে কেউ।”
আর এই তেলের একক স্বাদ ও গন্ধ খাবারে দেবে আলাদা ভাব।
কোন তেল ভালো?
মোরেনো বলেন, “সেরা হল এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল, ইভিওও। এটা রাসায়নিক বা তাপ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয় না। ফলে পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ন থাকে, ব্যবহার করা যায় যে কোনো রেসিপিতে।
আর রান্নায় ব্যবহারের পরিমাণটা হল ১:১। অর্থাৎ রান্নায় এক কাপ উদ্ভিজ্জ বা সয়াবিন তেল ব্যবহার করলে, এক কাপ পরিমাণ অলিভ অয়েল-ই ব্যবহার করতে হবে। তবে অনেক রান্নাতেই চাইলে কম পরিমাণেও ব্যবহার করা যায়। কারণ এর উচ্চ স্বাদ ও গন্ধ অল্প পরিমাণে ব্যবহার করলেও কাজ হয় ভালো।
আরও পড়ুন
খাওয়ার অলিভ অয়েলের মান পরীক্ষা করার উপায়