Published : 06 May 2026, 06:03 PM
সকালে উঠে আধ ঘণ্টা হাঁটছেন। মাসের পর মাস। তবে ওজন সেই একই জায়গায়। হতাশ হয়ে মনে হচ্ছে, হাঁটায় কাজ হচ্ছে না।
তবে সমস্যাটা হাঁটার নয় — সমস্যাটা হাঁটার পদ্ধতিতে।
পার্কে সহজে হেঁটে বেড়ানো আর উদ্দেশ্যমূলক ব্যায়াম হিসেবে হাঁটা— দুটো দেখতে এক হলেও শরীরের জন্য এক নয়।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “সঠিকভাবে হাঁটলে এটা দারুণ কার্যকর ব্যায়াম হতে পারে। শুধু জানতে হবে কীভাবে একই সময়ে বেশি ক্যালরি পোড়ানো যায়।”
হাঁটায় কত ক্যালরি পোড়ে
স্বাভাবিক গতিতে এক ঘণ্টা হাঁটলে একজন গড় মানুষ প্রায় ২৫০ ক্যালরি পোড়াতে পারেন। তবে এই সংখ্যাটা বাড়ানো সম্ভব। কীভাবে হাঁটছেন, কোথায় হাঁটছেন, কতটা চাপ নিচ্ছেন শরীর— এগুলোর ওপর নির্ভর করে।
এই চিকিৎসক উদাহারণ দেন, “একটা তুলনা দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। ৬০ কেজি ওজনের একজন মানুষ ৪৫ মিনিট বাসা মোছার কাজ করলে ১৮০ থেকে ২০০ ক্যালরি পোড়ান। সেই একই সময় পরিকল্পিতভাবে হাঁটলে আরও বেশি পোড়ানো সম্ভব।”
তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল- ‘ডায়েট’ বা খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ না করে শুধু হেঁটে ওজন কমানো প্রায় অসম্ভব।
হাঁটা সবচেয়ে ভালো কাজ করে সঠিক খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে করতে পারলে।
ধীরে হাঁটা বন্ধ করা— গতি বাড়লেই ক্যালরি বাড়ে
পার্কে বেড়ানোর মতো করে হাঁটলে ব্যায়াম হয় না বললেই চলে। সেটা শরীরের জন্য ভালো, তবে ক্যালরি পোড়ানোর হিসাবে বেশি কার্যকর নয়।
হার্ভার্ড হেল্থ অনুযায়ী, ১৫৫ পাউন্ড বা ৭০ কেজি ওজনের একজন ব্যক্তি ঘণ্টায় চার মাইল বা ৬ কি.মি. গতিতে হাঁটলে ৩০ মিনিটে ১৭৪ ক্যালরি খরচ করতে সক্ষম।
এই গতিতে হাঁটলে হৃদযন্ত্র, ফুসফুস ও পেশি সবই কাজে লাগে — এবং এই ধরনের ব্যায়ামই সবচেয়ে বেশি ক্যালরি পোড়ায়।
কীভাবে বুঝবেন সঠিক গতিতে হাঁটছেন? একটা সহজ নিয়ম হল— হাঁটার সময় কথা বলতে পারবেন, কিন্তু গান গাইতে পারবেন না। শ্বাস একটু ঘন হবে, তবে হাঁফিয়ে উঠবেন না।
এটাই সেই মাঝারি মাত্রা যেটা সবচেয়ে কার্যকর।
ঢালু পথ বেছে নেওয়া
সমতল রাস্তায় হাঁটা আর একটু উঁচু-নিচু পথে হাঁটা— এই দুটোর ক্যালরি পোড়ানোর পার্থক্য চমকে দেওয়ার মতো।
২০১৩ সালে ‘পিএমসি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘তিউনুসিয়ান রিসার্চ ল্যাবরেটরি’, ইতালির ‘ইউনিভার্সিটি অফ তোর ভের্গাতা’, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাম্পবেল ইউনিভার্সিটি’সহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে, সমতল পৃষ্ঠে দৌড়ানোর তুলনায় দুই থেকে সাত শতাংশ ঢালু জায়গায় দৌড়ালে হৃদস্পন্দন প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যায়।
কারণটা সহজ— ওপরের দিকে উঠতে পায়ের পেশিগুলো বেশি কাজ করে, হৃদস্পন্দন বাড়ে। একই সময়ে অনেক বেশি পরিশ্রম হয়।
ঢাকায় বা অন্য শহরে সমতল জায়গায় থাকলে ব্রিজের ওপর দিয়ে হাঁটা যেতে পারে। ওভারপাসের সিঁড়ি ব্যবহার করা, বা ট্রেডমিলে উঁচু করে জোরে হাঁটা উপকারী হবে।
হাতকে কাজে লাগান, শরীরকে চাপে ফেলা
হাঁটার সময় অনেকে হাত দুলিয়ে আরামে হাঁটেন। একটু পরিবর্তন করতে হবে। হাত সামনে-পেছনে জোরে পাম্প করুন। এতে বুক ও কাঁধের পেশিও কাজে লাগে, ক্যালরি খরচ বাড়ে।
আরেকটা উপায় হল অসমান বা শক্ত পথে হাঁটা। বালিতে হাঁটলে, ঘাসের ওপর হাঁটলে বা বাতাসের বিপরীতে হাঁটলে শরীরকে বেশি কাজ করতে হয়।
দশ হাজার কদম — সংখ্যাটার পেছনে আসল গবেষণা কী বলছে
দিনে দশ হাজার কদম হাঁটুন। এই পরামর্শ এখন সবখানে। তবে এই সংখ্যাটা এল কোথা থেকে?
‘ওবেসিটি জার্নালে’ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘমেয়াদে ওজন কমাতে পেরেছেন, তারা ৬, ১২ এবং ১৮ মাস ধরে নিয়মিত দিনে দশ হাজার কদম হেঁটেছেন। মানে শুধু সংখ্যাটা নয়, ধারাবাহিকতাটাই আসল।
একমাস হেঁটে বাদ দিলে কাজ হবে না। নিয়মিত হাঁটার অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তন আনে।
আবার ‘পোল্যান্ডের মেডিকেল ইউনিভার্সিটি অব লজ’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিন’য়ের একটি দল তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে, ৬০ বছরের নিচে যাদের বয়স, প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ হাঁটেন, তারাই সবচেয়ে বেশি উপকার পেয়েছেন।
আর সেটা দৈনিক পাঁচ হাজার পদক্ষেপ।
হাঁটাকে বেড়ানো থেকে ব্যায়ামে বদলান
হাঁটা সহজ বলে অনেকে এটাকে গুরুত্ব দেন না। তবে সঠিকভাবে হাঁটলে এটা দৌড়ানোর কাছাকাছি কার্যকর হতে পারে। আর হাঁটু বা গোড়ালিতে চাপ অনেক কম পড়ে।
দূরত্ব বাড়ানো, গতি বাড়ানো, ঢালু পথ বেছে নেওয়া, শরীরকে একটু বেশি কাজে লাগানো— এই চারটা পরিবর্তন করলে একই সময়ে অনেক বেশি ক্যালরি পোড়ানো সম্ভব।
আরও পড়ুন