০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

রান্নায় সিলিন্ডার গ্যাসের খরচ অর্ধেক হবে যে নিয়মে

আগুনের শিখা হলুদ হওয়া মানে গ্যাস খরচ হচ্ছে বেশি, কারণটা জেনে নিন।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 24 Aug 2026, 04:52 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:53 PM

বর্তমান সময়ে পারিবারিক বাজেট বা মাসিক গৃহস্থালি খরচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রান্নার এলপিজি বা সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যয় এক বড় চিন্তার কারণ। অনেকেই খেয়াল করেন না যে, রান্নাঘরে অবচেতনে করা কিছু সাধারণ ভুল প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মূল্যবান জ্বালানি অপচয় করে।

জ্বালানি ও ফলিত রসায়ন বিজ্ঞানীদের মতে, সিলিন্ডার গ্যাস দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার পেছনে সিলিন্ডারের ত্রুটি নয়, বরং রান্নার ভুল পদ্ধতিই প্রধানত দায়ী।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি গবেষণা সংস্থার বিশেষজ্ঞদের মতে, রান্নার অভ্যাসে সামান্য কিছু বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন আনলে প্রতিটি সিলিন্ডারের স্থায়িত্ব অন্তত ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব, যা মাসিক খরচ অনেকটাই কমিয়ে আনে।

গ্যাসের অপচয় রুখতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. নূরুল ইসলাম এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘এনার্জি স্টার’ (Energy Star) কর্মসূচির গবেষকেরা সিলিন্ডার গ্যাস সাশ্রয়ের ৫টি প্রধান বৈজ্ঞানিক নিয়ম এবং তার উৎসগুলো বিস্তারিত আলোচনা করেছেন [১]:

নীল শিখার বিজ্ঞান ও বার্নার পরিচ্ছন্নতা

যুক্তরাষ্ট্রের ‘এনার্জি স্টার’ কর্মসূচির গবেষকেরা ব্যাখ্যা করেছেন যে, রান্নার সময় চুলার আগুনের শিখার রং সবসময় লক্ষ্য করা উচিত।

সাশ্রয় হওয়ার কারণ: চুলার আগুন সম্পূর্ণ ‘নীল’ হওয়ার অর্থ হল, গ্যাস শতভাগ পুড়ছে এবং সর্বোচ্চ তাপ উৎপন্ন করছে। তবে শিখার রং যদি হলুদ বা লালচে হয়, তবে বুঝতে হবে বার্নারের ছিদ্রে ময়লা বা কার্বন জমে অক্সিজেন সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

হলুদ শিখা মানে অর্ধেক গ্যাস অপচয় হয়ে ধোঁয়া তৈরি করছে। তাই প্রতি মাসে অন্তত একবার চুলার বার্নার খুলে ভালো করে পরিষ্কার করা গ্যাস সাশ্রয়ের প্রথম প্রধান নিয়ম।

ঢাকনা ব্যবহার ও প্রেসার কুকারের জাদুকরী ক্ষমতা

বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জার্নাল অফ ক্লিনার প্রোডাকশন’-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকনা ছাড়া রান্না করলে বাতাসে সাধারণের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি তাপ অপচয় হয়।

সাশ্রয় হওয়ার কারণ: যেকোনো খাবার সেদ্ধ বা রান্নার সময় কড়াই বা পাতিল সবসময় শক্ত ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দেওয়া উচিত। এর চেয়েও কার্যকর হল, রান্নায় প্রেসার কুকার ব্যবহার করা।

প্রেসার কুকারের অভ্যন্তরীণ উচ্চ বায়ুচাপের কারণে পানি ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে অনেক বেশি তাপমাত্রায় ফোটে, যা রান্নার সময়কে প্রায় ৭০ শতাংশ কমিয়ে দেয় এবং সিলিন্ডার গ্যাস সাশ্রয় করে।

ভেজা পাতিল বর্জন ও বরফ গলানোর নিয়ম

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয় বা ‘ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি’- ব্যবহাকারিদের নির্দেশিকায় রান্নার পাত্রের বাহ্যিক আর্দ্রতা নিয়ে এই নির্দেশনা দেওয়া আছে।

সাশ্রয় হওয়ার কারণ: অনেকেই ধোয়া ভেজা পাতিল সরাসরি চুলার ওপর বসিয়ে দেন। বিজ্ঞান বলছে, পাতিলের বাইরের পানিটুকু বাষ্পীভূত করতেই চুলা প্রথম কয়েক মিনিট অতিরিক্ত গ্যাস পুড়িয়ে ফেলে।

তাই কড়াই বা পাতিল চুলার দেওয়ার আগে তোয়ালে দিয়ে ভালো করে মুছে সম্পূর্ণ শুষ্ক করে নেওয়া উচিত।

একইভাবে, ফ্রিজ থেকে বের করা বরফায়ীত মাছ বা মাংস সরাসরি চিলিং বা রান্না না করে, রান্নার অন্তত ১ ঘণ্টা আগে সাধারণ ঘরের তাপমাত্রার পানিতে রেখে বরফ পুরোপুরি গলিয়ে রান্না করলে গ্যাস অনেক কম খরচ হয়।

পাত্রের সঠিক মাপ ও চুলার মাঝারি আঁচ

আবাসন ও রান্নাঘর সজ্জা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘আর্কিটেকচারাল ডাইজেস্ট’-এর প্রতিবেদনে ডিজাইনাররা পাত্রের আকারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

সাশ্রয় হওয়ার কারণ: ছোট বার্নারে অতিরিক্ত বড় পাতিল বা বড় বার্নারে খুব ছোট কড়াই বসালে আগুনের শিখা পাত্রের চারপাশ দিয়ে বাইরে বাতাসে উবে যায়, যা পাতিলের তলদেশে বিন্দুমাত্র তাপ দেয় না।

পাত্রের তলদেশ যেন চুলার বার্নারের চেয়ে সামান্য বড় হয়, তা নিশ্চিত করা উচিত। এছাড়া, রান্নার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ‘হাই স্পিড’ বা তীব্র আঁচে চুলা না জ্বালিয়ে, বলক আসার পরপরই চুলার আঁচ মাঝারি বা নিচু করে দেওয়া উচিত।

কারণ অতিরিক্ত তাপ খাবার দ্রুত সেদ্ধ করে না, শুধু পানি বাষ্প করে গ্যাস অপচয় করে।

সব উপকরণ একবারে গোছানো

‘আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অফ ফ্যামিলি অ্যান্ড কনজিউমার সায়েন্সেস’-এর ‘ফ্যামিলি অ্যান্ড কনজিউমার সায়েন্সেস রিসার্চ জার্নাল’-এ প্রকাশিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, রান্নাঘরে অগোছালো আচরণের কারণে প্রায় ২০ শতাংস গ্যাস অপচয় হয়।

সাশ্রয় হওয়ার কারণ: চুলা জ্বালিয়ে রেখে মাঝখানে পেঁয়াজ কাটা, মসলা খোঁজা বা ফ্রিজ থেকে সবজি বের করা হল ভুল অভ্যাস। একে বলা হয় সময়ের অপচয়, যা চুলার গ্যাসকে অনর্থক পুড়িয়ে ফেলে।

রান্নার সমস্ত উপাদান, মসলা এবং পানি, টেবিলে একবারে গুছিয়ে নিয়ে তবেই চুলা জ্বালানো উচিত। এতে রান্নার ধারাবাহিকতা সচল এবং গ্যাসের অপচয় কমে।

পরামর্শ

রান্নার এই ছোট ছোট বৈজ্ঞানিক নিয়মগুলো মেনে চলার পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে সিলিন্ডারের রেগুলেটর, পাইপ এবং হোস পাইপের সংযোগস্থলে সাবানের ফেনা দিয়ে কোনো গ্যাস লিকেজ হচ্ছে কি-না, তা পরীক্ষা করা সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

আরও পড়ুন

ওয়াশিং মেশিনে যদি হয় দুর্গন্ধ

বৈদ্যুতিক চুলা কোনটি কিনবেন- ইন্ডাকশন নাকি ইনফ্রারেড?

গ্যাসের চুলার বিকল্প ইন্ডাকশন চুলার যত্ন ও ব্যবহার

যেসব যন্ত্র কখনও মাল্টিপ্লাগে ব্যবহার উচিত নয়