যে চাপ নীরবে ক্ষতি করছে অথচ টেরও পাচ্ছেন না
ব্যথা বা উপসর্গ নেই- অথচ হৃদযন্ত্র, কিডনি(বৃক্ক) আর মস্তিষ্ক হয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মাথা ঘোরে না, বুকে ব্যথা নেই, শরীরে তেমন কিছু অনুভব হচ্ছে না। তাহলে কী আর ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার?
অনেকেই এভাবে ভাবেন। আর এই ভাবনাটাই সবচেয়ে বড় বিপদ।
উচ্চ রক্তচাপ এমন একটি রোগ যেটা বছরের পর বছর কোনো সংকেত না দিয়ে শরীরের ভেতরে ক্ষতি করতে থাকে।
হৃদযন্ত্র দুর্বল হয়, কিডনি বা বৃক্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে, চোখের দৃষ্টিশক্তি কমতে পারে। আর রোগী কিছুই টের পান না।
চিকিৎসকেরা এ কারণেই উচ্চ রক্তচাপকে বলেন 'নীরব ঘাতক'। আর এই ঘাতককে ঠেকানোর একটাই পথ— নিয়মিত রক্তচাপ মাপা।
শুধু বয়স্কদের রোগ ভাবলে ভুল হবে
অনেকের মনে একটা ধারণা আছে— উচ্চ রক্তচাপ মানেই বয়স্কদের সমস্যা। পঞ্চাশের আগে এ নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো দরকার নেই।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলছেন, “এই ধারণাটা এখন আর ঠিক নেই। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ, জাঙ্ক ফুড, ধূমপান, মানসিক চাপ আর শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে তরুণদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপ দ্রুত বাড়ছে।”
তিরিশ বছর বয়সি একজন মানুষও উচ্চ রক্তচাপে ভুগতে পারেন। আর যেহেতু লক্ষণ নেই, তাই পরীক্ষা না করলে বোঝার উপায়ও নেই।
তাই এই চিকিৎসকের পরামর্শ হল- প্রাপ্তবয়স্ক সবার বছরে অন্তত একবার রক্তচাপ পরীক্ষা করানো উচিত। আর যাদের পরিবারে উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস পাশাপাশি যাদের ডায়াবেটিস বা স্থূলতা আছে, যারা ধূমপান করেন — তাদের আরও ঘন ঘন পরীক্ষা করানো দরকার।
ঘরে বসেই মাপা সম্ভব, তবে সঠিকভাবে
এখন রক্তচাপ মাপতে হাসপাতালে যেতে হয় না। ‘ডিজিটাল ব্লাড প্রেশার’ যন্ত্র এখন সহজলভ্য এবং দামও নাগালের মধ্যে। ঘরে বসেই নিয়মিত মাপা যায়।
তবে একটু সতর্কতা দরকার। সব ডিজিটাল যন্ত্র সমান নির্ভুল নয়। ভালো মানের যন্ত্র ব্যবহার করতে হবে। মাঝে মাঝে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে ‘ম্যানুয়াল’ পদ্ধতিতে মাপিয়ে দুটো রিডিং মিলিয়ে দেখতে হবে।
যদি দুটোর মধ্যে বড় ফারাক থাকে, বুঝতে হবে যন্ত্রে সমস্যা আছে।
রক্তচাপ মাপার সময়ও কিছু নিয়ম মানা দরকার। মাপার আগে পাঁচ মিনিট চুপচাপ বসে থাকতে হবে। কথাও বলা যাবে না। পা মাটিতে সমান রাখতে হবে। আর বাম হাত রাখতে হবে হৃদপিণ্ড বরাবর।
একদিনে একবার না মেপে, দুতিনবার মেপে গড় বের করে নিতে হবে।
ধরা পড়লে ঘাবড়াবেন না, বরং শুরু করুন
উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়লে অনেকে মনমরা হয়ে যান, ভাবেন সারাজীবন ওষুধ খেতে হবে। তবে এই ভয়টা অনেক ক্ষেত্রেই অকারণ।
ডা. আফসানা বলছেন, “উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি হল- জীবনধারার পরিবর্তন। ওষুধ লাগবে কি-না, সেটা পরের কথা। লবণ গ্রহণ কমাতে হবে। প্রতিদিনের রান্নায় যতটুকু লবণ পড়ে তার বাইরে আলাদা করে লবণ খাওয়া যাবে না। প্রক্রিয়াজাত খাবার, প্যাকেটের চিপস, আচার— এগুলোতে লুকানো লবণ প্রচুর। সুষম খাবার খান, শাকসবজি ও ফল বাড়ান। প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা হাঁটুন। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ধূমপান বন্ধ করুন। মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন।”
এই অভ্যাসগুলো যদি সত্যিকার অর্থে মেনে চলা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই রক্তচাপ স্বাভাবিক পর্যায়ে আসে।
তবে চিকিৎসক যদি ওষুধ দেন, সেটা নিজের মনে বন্ধ করবেন না। রক্তচাপ স্বাভাবিক দেখাচ্ছে বলে ওষুধ বাদ দিলে আবার বেড়ে যেতে পারে। বরং ওষুধ সঠিকভাবে নিয়মিত খাওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত ‘ফলোআপে’ থাকতে হবে।
শুধু রক্তচাপ নয়, আরও কিছু পরীক্ষাও দরকার
উচ্চ রক্তচাপ যেসব অঙ্গের ক্ষতি করে, সেগুলোর অবস্থাও নিয়মিত দেখা দরকার।
ডা. আফসানা বলেন, “কিডনি বা বৃক্কের কার্যকারিতা পরীক্ষা করাতে হবে। প্রস্রাবে আমিষ আছে কি-না দেখুন— এটা কিডনি ক্ষতির প্রাথমিক লক্ষণ। চোখ পরীক্ষা করান, কারণ উচ্চ রক্তচাপ চোখের রক্তনালিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। হৃদযন্ত্রের সুস্থতাও নিয়মিত যাচাই করুন।”
এই পরীক্ষাগুলো ভয় পাওয়ার জন্য নয়, বরং সময়মতো সমস্যা ধরতে পারলে সমাধানও সময় মতো করা যায়।
একা লড়াই করা যায় না
“পরিবারের বয়স্ক সদস্য নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছেন কি না, সেটা খেয়াল রাখুন। বাবা বা মায়ের রক্তচাপ মাপার মেশিন কিনে দিতে পারেন। তাদের কম লবণের খাবার রান্না করতে সাহায্য করা আর হাঁটতে নিয়ে যাওয়া উপকারী হবে”- পরামর্শ দেন ডা. আফসানা।
কোনো ব্যথা না থাকলেই যে সব ঠিক আছে, এটা ভাবার সুযোগ উচ্চ রক্তচাপ দেয় না। আজই একটা কাজ করুন — পরিবারের সবার রক্তচাপ মাপান।
আরও পড়ুন
