Published : 18 Dec 2025, 12:05 AM
নতুন প্রজন্মকে প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে পৃথিবীজুড়েই নানা উদ্যোগ চলছে। তবে এই সব আয়োজনের ভিড়ে ‘ওয়ার্ল্ড রোবট অলিম্পিয়াড’ (ডব্লিউআরও) আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কারণ এটি কেবল রোবট বানানোর প্রতিযোগিতা নয়, এখানে প্রতিযোগীদের ভাবতে হয় সমস্যার গভীরে গিয়ে। কোন সমস্যা সমাধান করবে রোবটটি, সেটিকে আরও কার্যকর কীভাবে করা যায়, নতুন কী যোগ করা সম্ভব।
এই প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের শেখায় নকল নয়, নিজস্ব চিন্তা দিয়ে কিছু তৈরি করার সাহস। সৃজনশীলতা আর উদ্ভাবনী শক্তির এই আন্তর্জাতিক মঞ্চের ২২তম আসর অনুষ্ঠিত হয় গত ২৬ থেকে ২৮ নভেম্বর, সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে এলাকায়।
এবার বাংলাদেশ থেকে অংশ নেয় মোট নয়টি দল। তাদের মধ্যেই ছিল ‘টিম লেইজিগো’। এই দলের তিন তরুণ শিক্ষার্থী সিঙ্গাপুরে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে কিছু সহযোগিতার জন্য। এই তিন তরুণ হলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু নাফিস মোহাম্মদ নূর, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম এবং বর্তমানে হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট ইউনিভার্সিটি অফ টেকনলজি অ্যান্ড ইকোনমিকসে অধ্যয়নরত ইকবাল সামিন পৃথুল।

তাদের সঙ্গে কথা বলেই বুঝেছিলাম, তাদের বাজেট খুবই সীমিত, কিন্তু স্বপ্নের পরিধি সীমাহীন। অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় করপোরেট বা প্রাতিষ্ঠানিক স্পনসর পাওয়া খুব স্বাভাবিক বিষয়। অথচ অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, বাংলাদেশের নয়টি দলের কেউই কোনো আনুষ্ঠানিক স্পনসর পায়নি। দুঃখিনী দেশের এই বাস্তবতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু তাদের কথা শুনে মনে হলো, একজন দেশি ভাই হিসেবে, বড় ভাই হিসেবে এই স্বপ্নবাজ তরুণদের পাশে দাঁড়ানো আমার দায়িত্ব।
বাসায় ফিরে বিষয়টি গিন্নি মিতুকে বলতেই সে সঙ্গে সঙ্গে আগ্রহ দেখাল। বাংলাদেশ থেকে যখনই কেউ চিকিৎসা বা অন্য প্রয়োজনে আসে, আমরা দুজনেই সাধ্যমতো সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। সেই ধারাবাহিকতায় প্রতিযোগিতা চলাকালীন সময় এই তিন তরুণকে আমাদের বাসায় থাকার ব্যবস্থা করে দিই। যাতায়াতসহ যতটুকু লজিস্টিক সহায়তা সম্ভব ছিল, সেটুকু করার চেষ্টা করেছি।
কেন করেছি? কারণ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মানে শুধু একটি ভৌগোলিক মানচিত্র নয়। ভবিষ্যৎ মানে এই ছেলেমেয়েগুলো। এই তরুণ প্রজন্ম। এই কদিন তাদের খুব কাছ থেকে দেখার, শোনার এবং বোঝার এক বিরল সুযোগ হয়েছিল। তারা কেউ সেলিব্রিটি নয়, কেউ প্রচারের আলো চায় না। কিন্তু তারা নিঃশব্দে যে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করছে, তা হয়তো একদিন ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠবে।

নূরকে দেখে প্রথম দিনই মনে হয়েছিল, সে যেন জন্মগত একজন প্রকৌশলী। কোনো সমস্যা দেখলেই তার চোখে এক ধরনের আলো জ্বলে ওঠে। তার ভেতর থেকে বারবার উঠে আসে এই আত্মবিশ্বাসী বাক্যটি, “এটা ঠিক করা যাবে।” তার প্রতিটি কথায় রয়েছে যুক্তি আর সম্ভাবনার ছাপ। রাকিবুলের মধ্যে আমি দেখেছি শৃঙ্খলা আর নির্ভুল চিন্তাভাবনার এক চমৎকার সমন্বয়। কাজের প্রতিটি ধাপে তার মনোযোগ, হিসাব আর পরিকল্পনা আমাকে মুগ্ধ করেছে।
আর পৃথুল, সে যেন কোনো সীমানা মানে না। তার চিন্তায় দেশ আছে, কিন্তু সংকীর্ণতা নেই। সে এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা বিশ্বকে চেনে, জানে, বুঝে, কিন্তু নিজের শিকড় ভুলে যায় না।
এই তিনজন শুধু ওয়ার্ল্ড রোবট অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়নি। তারা বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। আবু নাফিসের নেতৃত্বে ‘টিম লেইজিগো’ ফিউচার ইঞ্জিনিয়ার্স ক্যাটাগরিতে বিশ্বের ৬৪টি দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেছে। এটি কোনো ছোট অর্জন নয়। এটি প্রমাণ করে, আমরা পারি। নূর, রাকিবুল ও পৃথুল যে দলে ছিলেন, তারা পুরস্কারের জন্য নয়, তারা লড়াই করেছে একটি প্রজন্মের হয়ে।

বাংলাদেশ নিয়ে নেতিবাচক কথা আমি বহুবার শুনেছি। ‘দেশে কিছু হবে না’, ‘এখান থেকে ভালো কিছু বের হয় না’, এমন মন্তব্য আমাদের চারপাশে অহরহ। কিন্তু এই তরুণদের সঙ্গে কয়েকদিন কাটিয়ে আমার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে। আমাদের সমস্যা আছে, নিঃসন্দেহে। কিন্তু আমাদের মানুষগুলো অসাধারণ। তাদের চোখে আমি লোভ দেখিনি, দেখেছি কৌতূহল। দেখেছি শেখার আগ্রহ। দেখেছি ভবিষ্যৎ গড়ার এক তীব্র ক্ষুধা।
রোবোটিক্স কেবল একটি প্রতিযোগিতার নাম নয়। এটি আমাদের আগামী শিল্পব্যবস্থা, স্বাস্থ্যখাত, পরিবহন ব্যবস্থা, এমনকি কৃষির ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই তরুণরা শুধু রোবট বানাচ্ছে না, তারা বাংলাদেশকে নতুনভাবে কল্পনা করছে। একজন শিক্ষার্থী যখন রাত জেগে কোড লেখে, সেন্সরের ত্রুটি ধরতে চেষ্টা করে, কিংবা কোনো মেকানিজম ঠিক করতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হয়, তখন সে আসলে একটি দেশের স্বপ্নকে আবার জাগিয়ে তোলে।
এই তিন তরুণের সঙ্গে সময় কাটানো আমার জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। তাদের কথায় আমি ভবিষ্যৎ দেখেছি। তাদের চোখে আমি বাংলাদেশের মানচিত্র দেখেছি একটি উন্নত দেশের রঙে আঁকা। এই ধরনের কিশোর ও তরুণদের পাশে দাঁড়ানো কোনো দান নয়, বিনিয়োগ। ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ। কারণ তারা শুধু নিজেদের গড়ে তুলছে না, গড়ে তুলছে আমাদের দেশ।