Published : 14 Jun 2026, 09:57 AM
কয়েকদিন আগের একটি ঘটনা আমাদের নাগরিক বিবেককে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। রাজধানীর একটি ফ্ল্যাটে কয়েক দিন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। প্রতিবেশীরা অতিষ্ঠ হয়ে যখন পুলিশে খবর দিলেন, তখন কেউ ভাবতেও পারেননি যে বন্ধ দরজার ওপাশে কী বিভীষিকা অপেক্ষা করছে।
পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে যে দৃশ্য দেখল, তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, বরং আমাদের পুরো সমাজের জন্য এক লজ্জার বিষয়। তারা দেখলেন, ৭৫ বছর বয়সী এক নারীর লাশ ঘরের কোণে পড়ে আছে। মৃত্যুর পরও তিনি ছিলেন অবহেলা ও অনাদরের শিকার। একই ছাদের নিচে পরিবারের অন্য সদস্যরা থাকা সত্ত্বেও তার মৃত্যু কারও নজরে পড়েনি।
প্রশ্ন জাগে, এটিকে আমরা ঠিক কী বলবো? স্রেফ অসচেতনতা, অবহেলা, নাকি মানসিক উদাসীনতা? আপনি যদি আজকের তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হয়ে থাকেন, তবে এই ঘটনাটি আপনার কাছে কেবল সংবাদ নয়, বরং বড় সতর্কবার্তা হওয়া উচিত। চারপাশের এই প্রবীণরা চোখের সামনে থেকেও কেন আমাদের কাছে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন, তা নিয়ে আজ ভাবার সময় এসেছে।
‘প্রবীণ নির্যাতন’ বলতে আমরা সাধারণত শারীরিক অত্যাচারের কথা ভাবি, কিন্তু এর পরিধি আরও বিস্তৃত। শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি মানসিক অত্যাচার বা অবহেলাও এ নির্যাতনের অংশ। বহু ক্ষেত্রেই এ ঘটনাগুলো ঘটে আমাদের অজানাতে বা দেখেও না দেখার ভান করার মধ্য দিয়ে।
এ অমানবিক প্রবণতা বন্ধ করতে ১৫ জুন তারিখটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস’ হিসেবে। চলতি বছর এ দিবসের জন্য মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ‘বিয়ন্ড অ্যাওয়ারনেস: মেকিং এলডার অ্যাবিউজ প্রিভেনশন ওয়ার্ক’। অর্থাৎ, শুধু সচেতনতা নয়, বরং সময় এসেছে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার। এর অর্থ হলো, প্রবীণদের প্রতি অবিচার হচ্ছে, এই তথ্যটি জানলেই আপনার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং এই পরিস্থিতি বদলাতে আপনাকে সরাসরি কাজে নামতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া তথ্যগুলো আমাদের জন্য মোটেও সুখকর নয়। তাদের মতে, বিশ্বের প্রতি ছয়জন প্রবীণের মধ্যে একজন কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। পরিসংখ্যান বলছে, এই হার চীনে ৩৬ শতাংশ এবং ভারতে ১৪ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আরও ভয়াবহ; এ দেশের অর্ধেকের বেশি প্রবীণ নিয়মিতভাবে মানসিক নির্যাতনের শিকার হন, যা সচরাচর বাইরের মানুষের নজরে আসে না।
উন্নত দেশগুলোতে যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা জাপানে প্রবীণ হওয়ার বয়সসীমা ধরা হয় ৬৫ বছর থেকে। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ৬০ বছর হলেই একজনকে প্রবীণ হিসেবে গণ্য করা হয়। মজার ব্যাপার হলো, জাপানের মতো দেশে যেখানে দীর্ঘায়ু মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি, সেখানে ১০ শতাংশ মানুষের বয়স বর্তমানে ৮০ বছর ছাড়িয়ে গেছে। ফলে সেখানে এই বয়সসীমা আরও বাড়ানোর জোর দাবি উঠছে।
কিন্তু স্রেফ আইনের কাগজে বয়স বাড়িয়ে দিলেই প্রবীণদের প্রতি সমাজের সম্মান বাড়ে? নাকি এটি আসলে রাষ্ট্র বা পরিবারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল মাত্র? বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ বছরে। পেনশন বা সামাজিক নিরাপত্তার চাপ সামলাতে ইউরোপ ও জাপানের মতো দেশগুলো প্রবীণের সংজ্ঞা ধীরে ধীরে ৭৫ বছরে নিয়ে যাচ্ছে। এই যে বয়সের হিসাব-নিকাশ আর অর্থনৈতিক সমীকরণ, এর মাঝে কি আমাদের প্রবীণ প্রজন্ম শেষ পর্যন্ত এক টুকরো ‘বোঝা’ হয়েই থেকে যাবেন? এই প্রশ্নটি আজ আপনাকে নিজেকেই করতে হবে।
আমাদের দেশে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ নামে একটি আইন আছে। এ আইন অনুযায়ী সন্তানকে তার পিতামাতার দেখাশোনা করতে হবে এবং তা না করলে জরিমানা বা জেল হতে পারে। কিন্তু যদি বাস্তব পরিস্থিতির দিকে তাকাই, তবে দেখবো এ আইনটি কেবল কাগজের দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বাস্তব কাজে এর প্রয়োগ সামান্যই।
বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার গড় বয়স মাত্র ২৬ বছর, যা আমাদের জন্য একটি বিশাল ‘জনসংখ্যার বোনাস’ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। কিন্তু মনে রাখা জরুরি যে, ২০৫০ সাল নাগাদ এই বিপুল তরুণ সমাজ যখন প্রবীণ হবে, তখন প্রবীণদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১৯ শতাংশে পৌঁছাবে। এখনকার তরুণ হিসেবে আপনি যদি আজ প্রবীণদের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ তৈরি করতে না পারেন, তবে সেই ভবিষ্যতের শূন্যতা আপনাকেই গ্রাস করবে।
প্রবীণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইতিহাসটি বেশ পুরনো, যা ১৯৭৫ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক অ্যালেক্স বেকারের হাত ধরে শুরু হয়েছিল। পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হওয়ার পরও কেন এই নির্যাতন আমাদের সমাজের এক নীরব মহামারী হয়ে আছে, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। প্রতিবেশী দেশগুলোতে এ বিষয়ে একাধিক সমীক্ষা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ থাকলেও, আমাদের দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জরুরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার বিশেষ তোড়জোড় লক্ষ্য করা যায় না।
প্রযুক্তির এই আধুনিক যুগে আমরা হয়তো ভাবতে পারি যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কি একা প্রবীণদের সঙ্গী হতে পারবে? ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলাদেশের একাকী প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে অনেক গবেষক মনে করছেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন গবেষণা বলছে, জেনারেটিভ এআই এবং অ্যাম্বিয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তি স্বাস্থ্যসেবা ও নিত্যদিনের খোঁজখবর নেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি আমাদের দেশের প্রবীণরা পরিবারের সঙ্গে থেকেও এআই চালিত যন্ত্রের বা মেশিন অটোনমির মাধ্যমে পুনর্বাসন সেবা নিতে ‘আগ্রহী বলে’ গবেষণায় উঠে এসেছে।
একবার কল্পনা করুন, একজন প্রবীণের হাতে থাকা স্মার্ট ওয়াচ তার হার্টের সমস্যার আগেই সতর্কবার্তা দিচ্ছে, ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট তাকে সঠিক সময়ে ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, কিংবা সিসিটিভির মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো অস্বাভাবিক পতন বা দুর্ঘটনা শনাক্ত করে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসক ও পরিবারকে জানিয়ে দিচ্ছে। দৃশ্যটি বেশ আশাব্যঞ্জক মনে হলেও, এখানে বড় একটি নৈতিক প্রশ্ন থেকে যায়। সত্যিই কি প্রযুক্তি সন্তানের ভালোবাসা, হাতের স্পর্শ কিংবা পরম মমতায় করা একটি ফোনকলের বিকল্প হতে পারে? যন্ত্র হয়তো সেবা দেবে, কিন্তু হৃদয়ের উষ্ণতা দেওয়ার ক্ষমতা কি তার আছে?
বিশ্বব্যাপী প্রবীণদের জনসংখ্যার দিকে তাকালে আমরা একটি বড় বৈষম্য দেখতে পাবো। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি জনসংখ্যার প্রায় ৫৫ শতাংশই নারী, আর ৮০ বছরের বেশি এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫ শতাংশে। অর্থাৎ প্রবীণদের মধ্যে নারীদের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, নারী প্রবীণরা নির্যাতনের ঝুঁকিতে পুরুষদের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি থাকেন।
স্পেনের রেড ক্রস ২০২৪ সালে একটি গবেষণায় দেখেছে যে, নির্যাতিত প্রবীণদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই ছিলেন নারী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও স্পষ্ট জানিয়েছে যে, প্রবীণ নারী এবং প্রতিবন্ধী নারীরাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে থাকেন। কেন এমন হয়, তা একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়। আর্থিক পরনির্ভরশীলতা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব, এবং বিধবা অবস্থায় একদম একা হয়ে যাওয়া এর অন্যতম কারণ।
এমনকি আমাদের সমাজের কিছু জায়গায় আজও বিধবা নারীদের ‘ডাইনি’ বা ‘অভিশপ্ত’ বলে নির্যাতনের মতো মধ্যযুগীয় কুসংস্কার টিকে আছে। নারী প্রবীণদের এই যে দ্বৈত লড়াই, শারীরিক সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক অবহেলা, তা অনুভব করার মতো সংবেদনশীলতা আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গড়ে ওঠা খুব জরুরি।
যে আজ তরুণ, প্রকৃতির নিয়মে সেও একদিন প্রবীণ হবে। তাই একটি মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্যের জন্য প্রস্তুতি এখন থেকেই শুরু করা উচিত। আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ ‘বার্ধক্যকালীন তহবিল’ হিসেবে সঞ্চয় করা থেকে শুরু করে নিয়মিত শারীরিক চর্চা, হাঁটাচলা ও মেডিটেশন আপনার ভবিষ্যৎ জীবনকে অনেক সহজ করতে পারে। আধুনিক এই সময়ে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা একটি বড় ব্যাধি। তাই বন্ধু, সহকর্মী ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং একটি শক্তিশালী সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরি করা প্রয়োজন।
স্থাবর সম্পত্তি বা জমি নিয়ে সন্তানদের মধ্যে দ্বন্দ্ব অনেক সময় প্রবীণদের নিঃস্ব করে দেয়, তাই আইনি জটিলতা এড়াতে সম্পত্তির সঠিক ব্যবস্থাপনা ও উইল আগেভাগেই সেরে রাখা আপনার জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে। পাশাপাশি, প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে সবসময় আপডেটেড রাখা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা বা টেলিমেডিসিন অ্যাপগুলোর ব্যবহার শিখে রাখা আগামীর পথকে মসৃণ করবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের মর্যাদা ও আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং অবসরের পর নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য কোনো না কোনো সৃজনশীল শখ বজায় রাখা।
গত এক বছরে আমাদের দেশে প্রবীণদের লাশ উদ্ধারের যে চিত্র গণমাধ্যমে এসেছে, তা কোনো ভয়ানক সিনেমার দৃশ্যের চেয়ে কম নয়। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর বাংলাদেশে অনেক প্রবীণ নিখোঁজ হন অথবা নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যাওয়ার পর দুর্গন্ধ বের হলে সমাজ তাদের অস্তিত্ব টের পায়। আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি, সমাজের চোখের সামনে দাঁড়িয়েও তারা কেন এভাবে ‘অদৃশ্য’ হয়ে থাকছেন?
সবশেষে, সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে আপনার সামনে আজ এক বড় প্রশ্ন রেখে যেতে চাই, আমরা কি আমাদের বৃদ্ধ মা-বাবাদের হোটেলের ‘চেকআউট টাইম’ পার হওয়া অতিথির মতো ভাবছি? প্রবীণরা আমাদের সমাজের বোঝা নন, বরং তারা আমাদের ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। তাদের একাকিত্ব ও কষ্টের জন্য আমাদের যান্ত্রিক জীবনযাত্রা কোনো অজুহাত হতে পারে না। এখনই সময় ঘুরে দাঁড়ানোর এবং প্রবীণদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে ফেলার।