Published : 15 Jun 2026, 04:05 AM
রোমান সাম্রাজ্যের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে দিগ্বিজয়ী সেনাবাহিনী, গ্ল্যাডিয়েটরদের রক্তক্ষয়ী লড়াই আর স্থাপত্যের বিস্ময়কর সব নিদর্শন। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতিদের জীবন ছিল অকল্পনীয় সব নাটকীয়তা, ঝুঁকি আর অদ্ভুত খামখেয়ালিতে ভরপুর।
কেউ কেউ যেমন কয়েক সপ্তাহ মাত্র ক্ষমতায় টিকে ছিলেন, আবার কেউ কেউ নিজ দেহরক্ষী বা পরিবারের সদস্যদের হাতেই প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু এসবের বাইরেও ছিল তাদের ব্যক্তিগত পাগলামি। সন্তানকে নির্বাসনে পাঠানো থেকে শুরু করে প্রস্রাবের ওপর কর বসানো, কিংবা অতিরিক্ত পনির খেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া।
আজ আমরা আলোচনা করব ইতিহাসের সেইসব রোমান সম্রাটদের নিয়ে, যাদের শাসনকাল যতটা না বীরত্বের জন্য, তার চেয়ে বেশি পরিচিত তাদের অদ্ভুত সব কর্মকাণ্ডের জন্য।
১. সম্রাট অগাস্টাস: নৈতিকতার লড়াই ও নিজের হাতের লেখার বাতিক
খ্রিস্টপূর্ব ১৮ অব্দে সম্রাট অগাস্টাস রোমান সমাজে এক বিশাল পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন। তিনি প্রবর্তন করেন ‘জুলিয়ান লজ’ বা জুলিয়ান আইন। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রাচীন রোমান ঐতিহ্য ও নৈতিকতা ফিরিয়ে আনা। প্রথমবারের মতো রোমান ইতিহাসে ব্যভিচারকে ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির পরিবর্তে একটি রাষ্ট্রীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলো, যার শাস্তি ছিল নির্বাসন এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা।
কিন্তু ইতিহাসের পরিহাস এই যে, এই আইনের সবচেয়ে বড় শিকার হলেন অগাস্টাসের নিজের একমাত্র কন্যা জুলিয়া। জুলিয়ার সামাজিক জীবন ছিল জৌলুসপূর্ণ এবং তৎকালীন নৈতিকতার মানদণ্ডে অসংযত। সুয়েটোনিয়াস এবং ক্যাসিয়াস ডিওর মতো ঐতিহাসিকদের মতে, যখন জুলিয়ার ব্যভিচার প্রমাণিত হলো, তখন অগাস্টাস তাকে লোকলজ্জার ভয়ে পান্তাদেরিয়া নামক একটি জনশূন্য দ্বীপে নির্বাসিত করেন।
পাঁচ বছর পর তাকে মূল ভূখণ্ডে ফেরার অনুমতি দেওয়া হলেও অগাস্টাস তাকে কখনো ক্ষমা করেননি। জুলিয়ার বিশ্বস্ত দাসী ফোবি যখন লজ্জায় আত্মহত্যা করেন, তখন অগাস্টাস আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আমি যদি ফোবির বাবা হতাম, তবেই বোধহয় ভালো হতো।”
অগাস্টাসের নিয়ন্ত্রণ করার ইচ্ছা কেবল পরিবারের সদস্যদের নৈতিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি চাইতেন তার উত্তরাধিকারীরা এমনকি তার মতো করে হাতের লেখাও শিখুক। ঐতিহাসিক সুয়েটোনিয়াসের মতে, অগাস্টাসের হাতের লেখা ছিল স্বকীয়। তিনি তার উত্তরসূরিদের প্রশিক্ষণ দিতেন যেন তারা হুবহু তার স্টাইলে লিখতে পারে। অধ্যাপক টম গেউ-এর মতে, এই ‘স্ক্রিপ্টরি মাইক্রোম্যানেজমেন্ট’ বা অক্ষরের ওপর এমন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অগাস্টাসের এক অদ্ভুত এবং একক বৈশিষ্ট্য ছিল।
২. সম্রাট ক্লডিয়াস: বর্ণমালা বদলানোর ব্যর্থ চেষ্টা
সম্রাট ক্লডিয়াস (৪১-৫৪ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন একটু গবেষক ধাঁচের মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রচলিত ল্যাটিন বর্ণমালা দিয়ে সব ধরনের ধ্বনি সঠিকভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। গ্রিক ভাষার ক্রমবিকাশ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ল্যাটিন বর্ণমালায় তিনটি নতুন অক্ষর যোগ করার প্রস্তাব দেন।
ক্লডিয়াস এই অক্ষরের ব্যবহার এবং এর পেছনের তত্ত্ব নিয়ে একটি আস্ত বই লিখেছিলেন। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে এই ‘ক্লডিয়ান অক্ষরের’ কিছু নমুনা পাওয়া গেলেও সম্রাট হিসেবে তার এই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। সম্রাট হওয়ার সুবাদে তিনি সরকারি নথিতে জোর করে এই অক্ষরগুলো চালু করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষ তা গ্রহণ করেনি। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই অক্ষরগুলো ইতিহাস থেকে মুছে যায়। ভাষা যে রাজকীয় ফরমান দিয়ে পরিবর্তন করা যায় না, ক্লডিয়াস ছিলেন তার বড় প্রমাণ।
৩. নিরো: সম্রাট নিজেই হতেন ‘মরণঘাতী’ গায়ক
রোমান সম্রাটদের মধ্যে নিরোর নাম সম্ভবত সবচেয়ে বেশি কুখ্যাত। তিনি নিজেকে রাজনীতিকের চেয়ে বড় শিল্পী মনে করতেন। কবিতা লেখা, রথ দৌড়ানো আর গানের আসর বসানোই ছিল তার আসল নেশা।
সমস্যা ছিল তার এই গানের আসর নিয়ে। নিরো যখন গান গাইতেন, তখন রাজকীয় ফরমান অনুযায়ী শ্রোতাদের মধ্যে থেকে কারো বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না।
ঐতিহাসিক সুয়েটোনিয়াস কিছু চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন। নিরোর দীর্ঘস্থায়ী গান চলার সময় অনেক গর্ভবতী নারী হলঘরের ভেতরেই সন্তান প্রসব করেছিলেন। আবার অনেকে নিরোর গান শুনতে শুনতে এতোটাই ক্লান্ত হয়ে পড়তেন যে, দেয়াল টপকে পালাতে গিয়ে আহত হতেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, অনেকে নিরোর গান থেকে বাঁচতে ‘মরার অভিনয়’ করতেন যেন তাদের মরা ভেবে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়!
নিরোর পারিবারিক জীবন ছিল রক্তে ভেজা। তিনি তার নিজের মা অ্যাগ্রিপিনাকে হত্যার জন্য একের পর এক ষড়যন্ত্র করেন। প্রথমে বিষপ্রয়োগ, পরে কৃত্রিম জাহাজডুবি- কিন্তু মা বেঁচে ফিরলে শেষ পর্যন্ত তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করার আদেশ দেন। নিজের দুই স্ত্রী অক্টাভিয়া এবং পপিয়াকেও তিনি নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন বলে কথিত আছে।
৬৪ খ্রিস্টাব্দে রোমের সেই বিখ্যাত অগ্নিকাণ্ডের সময় নিরো বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। এই গল্পটি ঐতিহাসিক সত্য না হলেও এটি নিরোর উদাসীন এবং শিল্প-পাগল চরিত্রের একটি স্থায়ী প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
৪. সম্রাট ভেসপাসিয়ান: প্রস্রাব থেকে আয়
সম্রাট ভেসপাসিয়ান (৬৯-৭৯ খ্রিস্টাব্দ) গৃহযুদ্ধের বিশৃঙ্খল সময় শেষে রোমকে স্থিতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তার আয়ের উৎস ছিল বেশ বিতর্কিত। সম্রাট হওয়ার আগে তিনি হয়তো ‘একাউস্টিক স্লেভ ট্রেড’ বা নপুংসক দাস কেনাবেচায় জড়িত ছিলেন। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, সম্রাট হওয়ার আগে তার অবস্থা এতোটাই খারাপ ছিল যে তিনি তার সম্পত্তি বন্ধক রেখেছিলেন এবং পরবর্তীতে এই বিতর্কিত ব্যবসার মাধ্যমেই ভাগ্য পরিবর্তন করেন।
সম্রাট হওয়ার পর রাজকোষ ভরতে তিনি এক অদ্ভুত পথ বেছে নেন, প্রস্রাবের ওপর কর। প্রাচীন রোমে প্রস্রাব ছিল মূল্যবান পণ্য। এতে থাকা অ্যামোনিয়া কাপড় কাচা এবং চামড়া ট্যানিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হতো। ভেসপাসিয়ান শহরের পাবলিক টয়লেটগুলো থেকে প্রস্রাব সংগ্রহের ওপর চড়া কর বসিয়ে দিলেন।
তার নিজের ছেলে টাইটাস যখন এমন নোংরা উৎস থেকে আয়ের সমালোচনা করলেন, তখন ভেসপাসিয়ান একটি স্বর্ণমুদ্রা ছেলের নাকের সামনে ধরে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এর থেকে কি কোনো দুর্গন্ধ পাচ্ছ?” টাইটাস ‘না’ জবাব দিলে সম্রাট বলেছিলেন, “টাকা যেখান থেকেই আসুক, টাকার কোনো গন্ধ নেই।”
৫. সম্রাট আন্তোনিনাস পিউস: পনিরে মৃত্যু এবং এক শান্তিপূর্ণ বিদায়
রোমান সম্রাটদের মধ্যে আন্তোনিনাস পিউস ছিলেন ব্যতিক্রম। তার শাসনকাল ছিল দীর্ঘ ২৩ বছরের এক শান্তিপূর্ণ সময়। তাকে ‘ফাইভ গুড এম্পেররস’-এর একজন ধরা হয়। কিন্তু তার মৃত্যুর কারণটি ছিল তার শাসনের মতোই অনেকটা ঘরোয়া আর অদ্ভুত।
তিনি পনির খেতে অসম্ভব ভালোবাসতেন। ‘হিস্টোরিয়া অগাস্টার’ মতে, তিনি এক রাতে লোভে পড়ে প্রচুর পরিমাণে ‘আল্পাইন পনির’ খেয়ে ফেলেন। এর ফলে তার শরীরে প্রচণ্ড জ্বর আসে এবং তিনদিন পর তিনি মারা যান। যদিও এই সূত্রের ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক আছে, তবুও রোমান সম্রাটদের মাঝে অতিরিক্ত পনির খেয়ে মৃত্যুর এই গল্পটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং মানুষের কাছে তাকে অনেকটা ‘মায়াময়’ করে তুলেছে।
৬. সম্রাট ভ্যালেরিয়ান: সম্রাট থেকে মানুষের পাদানি
রোমান সম্রাটদের মধ্যে ভ্যালেরিয়ানের শেষ পরিণতি ছিল সম্ভবত সবচেয়ে অপমানজনক। ২৫৯-২৬০ খ্রিস্টাব্দের দিকে পারস্যের রাজা প্রথম শাপুরের কাছে তিনি পরাজিত ও বন্দি হন। শাপুর ছিলেন নিষ্ঠুর এক বিজয়ী। তিনি ভ্যালেরিয়ানকে সসম্মানে বন্দি রাখার বদলে তাকে একটি জ্যান্ত ট্রফি হিসেবে ব্যবহার করতেন।
চতুর্থ শতাব্দীর লেখক ল্যাকটান্টিয়াসের মতে, শাপুর যখনই ঘোড়ায় বা রথে চড়তে যেতেন, ভ্যালেরিয়ানকে নিচে হাঁটু গেড়ে বসতে হতো। রোমান সম্রাট তখন রাজার পায়ের তলায় একটি ‘স্টেপ’ বা পাদানি হিসেবে ব্যবহৃত হতেন।
অপমান এখানেই শেষ হয়নি। ভ্যালেরিয়ানের মৃত্যুর পর তার চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়া হয় এবং তাতে খড় ভরে লাল রঙ করে পারস্যের একটি মন্দিরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। যদিও এই খড়ভর্তি চামড়ার গল্পটি নিয়ে বিতর্ক আছে, কিন্তু শাপুরের পায়ের তলায় সম্রাটের মাথা নিচু করে থাকার দৃশ্যটি আজও ইরানি পাহাড়ের খোদাই করা ভাস্কর্যে টিকে আছে।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক হিস্ট্রি ম্যাগাজিন।