Published : 14 Jul 2026, 03:35 PM
মাঠে ফুটবলাররা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গোপনীয়তায় নিজেদের পরবর্তী রণকৌশল সাজাচ্ছেন, আধুনিক খেলাধুলায় এটি অত্যন্ত চেনা এক দৃশ্য। ক্রিকেটে উইকেট পাওয়ার পর কিংবা ফুটবলে পেনাল্টি শ্যুটআউটের আগে দল বেঁধে একে অপরের কাঁধে হাত দিয়ে গোল হয়ে দাঁড়ানোর এই প্রক্রিয়াকে আমরা ‘হাডল’ বলে থাকি।
কিন্তু আজ থেকে ১৩০ বছরেরও বেশি সময় আগে ফুটবল মাঠের এই চিরচেনা কৌশলের জন্ম হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কারণে। কোনো কৌশলী কোচ বা শারীরিক কসরতের অংশ হিসেবে নয়, বরং প্রতিপক্ষের হাত থেকে নিজেদের ‘ইশারা’ বা সাংকেতিক ভাষা আড়াল করতে এই প্রথার জন্ম দিয়েছিলেন এক বধির কোয়ার্টারব্যাক বা আক্রমণভাগের প্রধান খেলোয়াড়। গ্যালাউডেট ইউনিভার্সিটির সেই ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে শুরু করে ফুটবল বিশ্বকাপ পর্যন্ত কীভাবে এই হাডল পুরো ক্রীড়াবিশ্বকে আপন করে নিল, তার ইতিহাস বেশ রোমাঞ্চকর।
১৮৯৪ সালের এক শরতের দিন। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডি.সির গ্যালাউডেট ইউনিভার্সিটির মাঠ তখন টানটান উত্তেজনায় কাঁপছিল। গ্যালাউডেট হলো বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত এবং মর্যাদাপূর্ণ বধির বিশ্ববিদ্যালয়। সেদিনের ম্যাচে গ্যালাউডেট বাইসন দলের কোয়ার্টারব্যাক হিসেবে খেলছিলেন পল হাবার্ড। মাঠে তার ক্ষিপ্রতা আর চতুর চালের কারণে সবাই তাকে ডাকত ‘দ্য ইল’।
সে যুগে আজকের মতো খেলার মাঝে গোল হয়ে দাঁড়ানোর কোনো নিয়ম ছিল না। দুই দলের খেলোয়াড়রা সরাসরি লাইনে দাঁড়িয়ে যেতেন এবং কোয়ার্টারব্যাক চেঁচিয়ে পরবর্তী চাল বা ‘প্লে’ বলে দিতেন। কিন্তু গ্যালাউডেটের খেলোয়াড়রা যেহেতু কথা বলতে পারতেন না, তাই তারা মাঠের মাঝে ‘আমেরিকান সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ’ বা ইশারা ভাষা ব্যবহার করতেন।
সাধারণত অন্য কোনো স্বাভাবিক দলের বিপক্ষে খেলার সময় গ্যালাউডেটের এই ইশারা ভাষা বেশ বড় একটা সুবিধা দিত, কারণ প্রতিপক্ষ বুঝতেই পারত না হাবার্ড তার সতীর্থদের কী ইশারা করছেন। কিন্তু সেদিনের ম্যাচে প্রতিপক্ষ দলটিও ছিল আরেকটি বধির স্কুলের। ফলে হাবার্ড যখনই ইশারায় পরবর্তী চাল সতীর্থদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা তা সহজেই পড়ে ফেলছিল এবং গ্যালাউডেটের আক্রমণ রুখে দিচ্ছিল।
পল হাবার্ড বুঝতে পারলেন, নিজেদের কৌশল বাঁচাতে হলে এই ইশারাকে প্রতিপক্ষের চোখ থেকে আড়াল করতে হবে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তার দলের আক্রমণভাগের সব খেলোয়াড়কে ডেকে নিজের চারপাশে একটি গোল বৃত্ত তৈরি করতে বললেন। সেই বৃত্তের মাঝে লুকিয়ে তিনি সতীর্থদের পরবর্তী চালের ইশারা দিলেন। এভাবেই জন্ম হলো ক্রীড়া ইতিহাসের প্রথম হাডলের। ১৯৪১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপত্র ‘দ্য বাফ অ্যান্ড ব্লু’ হাবার্ডকে ‘হাডলের জনক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
যেকোনো যুগান্তকারী আবিষ্কারের মতোই হাডলের আবিষ্কার নিয়েও পরবর্তীতে বেশ কিছু ভিন্ন দাবি সামনে আসে। ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গের খেলোয়াড় ও কোচ হার্ব ম্যাকক্র্যাকেন দাবি করেছিলেন, তিনি ১৯২৪ সালে প্রথম হাডল প্রবর্তন করেন। অন্যদিকে, ইলিনয় ইউনিভার্সিটির কিংবদন্তি কোচ রবার্ট জুপকেও হাডল জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব দাবি করেন।
তবে ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ অনুযায়ী, গ্যালাউডেটের এই গল্প অন্য সব দাবির চেয়ে অন্তত তিন দশক পুরোনো। বধির খেলোয়াড়দের নিজেদের চাক্ষুষ যোগাযোগ গোপন করার যে বাস্তব তাগিদ ছিল, তা অন্য কোনো দলের ছিল না। তাই পল হাবার্ডেরই এই কৃতিত্ব পাওয়ার দাবি সবচেয়ে জোরালো।
১৮৯৬ সাল থেকেই গ্যালাউডেটের এই কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরে আসে। শিকাগোর বিখ্যাত কোচ অ্যামোস অ্যালোনজো স্ট্যাগ এই হাডলকে শুধু কৌশল হিসেবেই দেখেননি, বরং এর মাঝে আধ্যাত্মিক এবং খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতার ছোঁয়া খুঁজে পেয়েছিলেন। স্ট্যাগ মনে করতেন, হাডল হলো মাঠের মাঝে এক ধরনের ‘ধর্মীয় প্রার্থনা সভার’ মতো, যেখানে খেলোয়াড়রা একে অপরের খুব কাছে এসে নিজেদের পরিকল্পনা ভাগ করে নেয় এবং একে অপরের প্রতি বিশ্বাস রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়।
১৯২০-এর দশকের মধ্যে হাডল মার্কিন ফুটবলে এতটাই নিয়মিত হয়ে ওঠে যে, অনেক দর্শক অভিযোগ করতে শুরু করেন- এর ফলে খেলার গতি ধীর হয়ে যাচ্ছে। তবে জুপকের মতো চতুর কোচরা হাডলকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে যান। তারা লাইন থেকে ৫ গজ পেছনে হাডল করতেন এবং পরিকল্পনা সেরে হঠাৎ করেই ক্ষিপ্র গতিতে লাইনে এসে বল স্ন্যাপ বা খেলা শুরু করতেন, যার ফলে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স দল গুছিয়ে ওঠার আগেই ভড়কে যেত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাডল শুধু বৃত্তাকার রূপেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কোচদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা অনুযায়ী এর বিভিন্ন রূপ তৈরি হয়। এর আদি রূপ ছিল ‘ক্লোজড বা সার্কুলার হাডল’, যেখানে খেলোয়াড়রা কোয়ার্টারব্যাককে মাঝে রেখে চারপাশ থেকে শক্ত গোল বৃত্ত তৈরি করত। এর সুবিধা ছিল স্টেডিয়ামের হাজারো দর্শকের চিৎকারের মধ্যেও কোয়ার্টারব্যাকের কথা স্পষ্ট শোনা যেত এবং খেলোয়াড়রা কিছুটা জিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেত।
তারপর ১৯৩০ থেকে ১৯৫০-এর দশকে জনপ্রিয় হয় ‘ভি বা ট্রায়াঙ্গেল হাডল’, যেখানে কোয়ার্টারব্যাক এক কোনায় থাকতেন এবং বাকি খেলোয়াড়রা ইংরেজি ‘ভি’ অক্ষরের মতো করে দুই লাইনে দাঁড়িয়ে যেতেন। এতে প্রত্যেকে কোয়ার্টারব্যাককে দেখতে পেত এবং হাডল ভাঙার পর খুব কম পদক্ষেপে নিজের পজিশনে চলে যেতে পারত।
১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে জন্ম হয় ‘ওপেন বা ক্লাসরুম হাডল’-এর, যেখানে লাইনে থাকা খেলোয়াড়রা এক সারিতে সোজা হয়ে দাঁড়াতেন এবং পেছনের খেলোয়াড়রা তাদের পেছনে থাকতেন, ঠিক যেমনটা স্কুল বা পারিবারিক ছবিতে দেখা যায়। কোয়ার্টারব্যাক শিক্ষক বা দলনেতার মতো সামনে দাঁড়িয়ে সবাইকে নির্দেশনা দিতেন। আশির দশকে এই পদ্ধতিটি জনপ্রিয়তা পায়।
মজার ব্যাপার হলো, ইতিহাস সবসময়ই নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে। ১৯২০-এর দশকে হাডলের কারণে খেলা ধীর হয়ে যাওয়ার অভিযোগে ১৯২৭ সালে নিয়ম করা হয় যে, হাডল ভাঙার পর খেলোয়াড়দের অন্তত এক সেকেন্ড স্থির থাকতে হবে এবং ১৯৩৯ সালে হাডলের সর্বোচ্চ সময় বেঁধে দেওয়া হয় ৩০ সেকেন্ড। আধুনিক যুগে এসে খেলাধুলার গতি আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ শতকের শেষভাগে হাডল ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় খেলাগুলোতে। বাস্কেটবল, ভলিবল, বেসবল তো বটেই, এমনকি আমাদের চেনা ফুটবল এবং ক্রিকেটেও এটি মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ফুটবল মাঠে হাডলের মূল উদ্দেশ্য কিছুটা বদলে যায়। এখানে এটি মূলত ম্যাচ শুরুর ঠিক আগে বা অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি শ্যুটআউটের মতো কঠিন মুহূর্তে দলের একতা ও মনোবল বাড়াতে ব্যবহৃত হতে থাকে।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন