Published : 23 Jan 2026, 11:42 AM
অস্ট্রিয়ার এক নিভৃত জনপদ। প্রায় ১০ বছর আগের কথা, সেখানকার এক অর্গানিক খামারি ও পাউরুটি বিক্রেতা লক্ষ্য করলেন এক অদ্ভুত দৃশ্য। তার পোষা ‘ভেরোনিকা’ নামের গাভীটি অবলীলায় লাঠি ব্যবহার করে নিজের গা চুলকাচ্ছে!
শুধু তাই নয়, বছরের পর বছর ধরে সে এই কৌশলে আরও পারদর্শী হয়ে উঠছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় জানানো হয়েছে, গরুর সরঞ্জাম বা হাতিয়ার ব্যবহারের এটিই বিশ্বের প্রথম দালিলিক নজির।
স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ভিয়েনার ইউনিভার্সিটি অফ ভেটেরিনারি মেডিসিনের কগনিটিভ বায়োলজিস্ট অ্যালিস অয়ার্সপার্গ যখন ভেরোনিকার ওই দক্ষতার ভিডিও দেখেন, তিনি অবাক হয়ে নিজে তদন্তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
অয়ার্সপার্গ এবং তার সহকর্মী আন্তোনিও ওসুনা-মাসকারো পাড়ি জমান ‘নোশ ইম গেইল্টাল’ নামের এক ছবির মতো সুন্দর শহরে। ওসুনা-মাসকারো এই শহরটিকে বর্ণনা করেছেন কিংবদন্তি সিনেমা ‘দ্য সাউন্ড অফ মিউজিক’-এর দৃশ্যপটের মতো।
ওসুনা-মাসকারোর ভাষ্য, ভেরোনিকা ‘ভীষণ বন্ধুসুলভ’। তিনি দুই সপ্তাহ ধরে গাভীটিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
তিনি বলেন ভেরোনিকার সঙ্গে তার মালিক উইটগারের সম্পর্ক ‘অত্যন্ত গভীর’।
উইটগার কেবল পাউরুটি তৈরি করেন না, তিনি সেগুলো এলাকায় সরবরাহও করেন। ভেরোনিকা গভীর আগ্রহ নিয়ে প্রতিটি চলন্ত গাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকত এবং বোঝার চেষ্টা করত ড্রাইভারটি তার প্রিয় উইটগার কি না। যদি সে বুঝতে পারত ওই ব্যক্তি উইটগার, তবে সে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাম্বা রবে ডেকে উঠত।
গবেষক দল গত গ্রীষ্মে ৭০টি ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষায় পর্যবেক্ষণ করেছেন কীভাবে ভেরোনিকা মেঝে পরিষ্কার করার একটি ঝাঁটা ব্যবহার করে।
বিজ্ঞানের ভাষায় ‘টুল’ ব্যবহারের সংজ্ঞা বেশ কঠোর, একটি প্রাণীকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য সচেতনভাবে কোনো বস্তুকে কাজে লাগাতে হয়।
দেখা গেছে, ভেরোনিকা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে ঝাঁটাটিকে একটি ‘টুল’ হিসেবে ব্যবহার করে। সে নিজের জিভ দিয়ে ঝাঁটার হাতলটি শক্তভাবে ধরে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে চুলকানোর জন্য প্রয়োজনমতো সেটিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করে।
গত ১৯ জানুয়ারি বিশ্বখ্যাত জার্নাল ‘কারেন্ট বায়োলজি’-তে এই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়।
জার্মানির রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর ফার্ম অ্যানিম্যাল বায়োলজির গবেষক ক্রিশ্চিয়ান নাওরথ (যিনি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না) বলেন, “এই গবেষণা প্রাণীদের টুল ব্যবহারের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ তুলে ধরেছে। এটি অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য এবং শক্তিশালী প্রমাণ।”
গবেষকরা শুরুতে ভেবেছিলেন, ভেরোনিকা হয়তো কেবল ঝাঁটার শক্ত ব্রাশের দিকটিই চুলকানোর জন্য ব্যবহার করবে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে দেখা গেল, শরীরের নরম অংশে পৌঁছানোর জন্য সে মাঝেমধ্যে ঝাঁটাটি উল্টে হাতলের দিকটিও ব্যবহার করছে।
গবেষকরা প্রথমে এটাকে ‘ভুল’ মনে করলেও পরে দেখেন এটি একটি সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন। ওসুনা-মাসকারো জানান, ভেরোনিকার ব্রাশের দিকটি ব্যবহারের বিশেষ ঝোঁক থাকলেও হাতলের দিকটি সে অত্যন্ত অর্থবহভাবে ব্যবহার করছিল।
এখন পর্যন্ত একটি সরঞ্জাম বা টুলকে একাধিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের দক্ষতা কেবল শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেই দেখা গেছে।
অয়ার্সপার্গ বলেন, “গবাদি পশুর মধ্যে এমন আচরণ দেখা যাবে তা ছিল পুরোপুরি ধারণার বাইরে।”
গবেষকদের মতে, ভেরোনিকা কোনো জন্মগত অতি-বুদ্ধিমান গরু নয়; বরং তার পরিবেশই তাকে এই দক্ষতা অর্জন করতে সাহায্য করেছে।
ওসুনা-মাসকারো ব্যাখ্যা করেন, ভেরোনিকার পরিবার তাকে এমন একটি বিশেষ পরিবেশ দিয়েছে, যেখানে সে নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছে। তার মালিক তাকে খেলার জন্য লাঠি বা বিভিন্ন সরঞ্জাম দিতেন, যা সাধারণত অন্য গরুগুলো পায় না।
ছাগল বা মহিষের সরঞ্জাম বা টুল ব্যবহারের কিছু বিক্ষিপ্ত গল্প শোনা গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ আগে ছিল না।
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভোরোনিকার গবেষণা অন্যান্য অবহেলিত প্রাণীদের বুদ্ধিমত্তা পর্যবেক্ষণে বিজ্ঞানীদের অনুপ্রাণিত করবে।
অয়ার্সপার্গ আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা এতদিন এই প্রাণীদের দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দিইনি। হয়তো একটি গরুর সরঞ্জাম ব্যবহার করার বিষয়টি অতটা অস্বাভাবিক নয়, যতটা অস্বাভাবিক আমাদের এই ধারণা যে গরু বুদ্ধিমান হতে পারে না।”